বিজ্ঞাপন

নরসিংদী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস

নিজে গেলে ভোগান্তি, দালাল ধরলে শান্তি

নিজে গেলে ভোগান্তি, দালাল ধরলে শান্তি

নরসিংদী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি সক্রিয় দালাল সিন্ডিকেট। অফিসের আশপাশের কম্পিউটার দোকান, ট্রাভেল এজেন্সি এবং কিছু অসাধু ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে চলছে রমরমা বাণিজ্য। অভিযোগ উঠেছে, সরকার-নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দিলে দ্রুত পাসপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে, অথচ সরাসরি আবেদন করতে গেলে পোহাতে হচ্ছে নানা হয়রানি ও ভোগান্তি।

সরেজমিনে নরসিংদী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, অফিসের মূল ফটক ও আশপাশে দালালদের অবাধ বিচরণ। বিভিন্ন বয়সের লোকজন আবেদনকারীদের ঘিরে ধরে দ্রুত পাসপোর্ট করে দেওয়ার আশ্বাস দিচ্ছেন। কেউ ১০ হাজার, কেউ ১৩ হাজার, আবার কেউ ১৬ হাজার টাকার বিনিময়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পাসপোর্ট হাতে তুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।

অভিযোগ রয়েছে, সাধারণ মানুষের সরকারি নিয়ম-কানুন সম্পর্কে অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে এই দালাল চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। অনেকে মনে করেন- দিনের পর দিন লাইনে দাঁড়িয়ে ঘোরার চেয়ে বাড়তি টাকা দিয়ে কাজ করানোই সহজ ও নিরাপদ। তাই তারা দালালদের শরণাপন্ন হচ্ছেন। 

পাসপোর্ট করতে আসা বেলাব উপজেলার নারায়ণপুর এলাকার বাসিন্দা আপেল বেগম জানান, তার ছেলের ১০ বছর মেয়াদি পাসপোর্ট করাতে প্রায় ১৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। 

তিনি বলেন, এলাকার এক ব্যক্তির মাধ্যমে সব কাগজপত্র জমা ও আবেদন করেছি। সে বলেছিল নিজে করতে গেলে অনেক ঝামেলা হবে, তাই তার মাধ্যমেই কাজ করিয়েছি।

রায়পুরার হাসনাবাদ এলাকা থেকে আসা আবেদনকারী সিহাব অভিযোগ করে বলেন, আমি কোনো দালালের মাধ্যমে আসিনি। এ কারণে বারবার বিভিন্ন কাগজের কথা বলে ঘোরানো হচ্ছে, নিচের কম্পিউটার দোকানে পাঠানো হচ্ছে। অথচ দালালের মাধ্যমে এলে এত ঝামেলা হতো না। অফিসের লোকজন ১২০০ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেয়, আর কম্পিউটার দোকানগুলো আলাদা টাকা কাটে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অফিসের পাশের কয়েকটি কম্পিউটার দোকানে প্রকাশ্যেই এসব কার্যক্রম চলছে। বাড়তি অর্থের বিনিময়ে দ্রুত পাসপোর্ট পাইয়ে দেওয়ার নানা প্রলোভন দেখানো হচ্ছে গ্রাহকদের।

সাংবাদিক পরিচয় গোপন রেখে অফিসের পাশের একটি কম্পিউটার দোকানে গিয়ে পাসপোর্ট করতে চাইলে মালিক মশিউর রহমান বলেন, নিজে নিজে করলে প্রায় ৬ হাজার টাকা লাগবে, সঙ্গে অনেক ঝামেলাও আছে। আমার মাধ্যমে করলে ৮ হাজার টাকা লাগবে। জরুরি হলে সাড়ে ১১ হাজার। আজ আবেদন করলে আগামী সোমবার পাসপোর্ট পাওয়া যাবে।

একইভাবে পরিচয় গোপন করে পাসপোর্ট করানোর বিষয়ে জানতে চাইলে অফিসে দায়িত্বরত আনসার সদস্য রায়হান ১০ বছর মেয়াদি পাসপোর্ট ১৫ দিনের মধ্যে করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে সাড়ে ৮ হাজার টাকা দাবি করেন। পরে দরকষাকষিতে তিনি ৮ হাজার টাকায় রাজি হন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নরসিংদী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে প্রতিদিন গড়ে দুই থেকে তিন শতাধিক আবেদন জমা পড়ে। এর মধ্যে অধিকাংশ আবেদনই বিভিন্ন ‘চ্যানেল ফি’ এর মাধ্যমে সম্পন্ন হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। একাধিক 
ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রতিটি আবেদনে অতিরিক্ত ২ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে।

ভুক্তভোগীরা জানান, যারা সরাসরি আবেদন করেন তাদের ফাইলে নানা ধরনের ভুল ধরা হয়। ছবি, তথ্য কিংবা কাগজপত্রের অজুহাতে দিনের পর দিন ঘোরানো হয়। অথচ দালালের মাধ্যমে আবেদন করলে ছবি তোলা, ফিঙ্গার প্রিন্টসহ অন্যান্য কাজ অনায়াসে দ্রুত সম্পন্ন হয়ে যায়।

বর্তমানে সরকার-নির্ধারিত ফি অনুযায়ী, ৫ বছর মেয়াদি ৪৮ পাতার সাধারণ ই-পাসপোর্টের ফি ৪ হাজার ২৫ টাকা এবং জরুরি ফি ৬ হাজার ৩২৫ টাকা। ১০ বছর মেয়াদি ৪৮ পাতার সাধারণ ই-পাসপোর্টের ফি ৫ হাজার ৭৫০ টাকা এবং জরুরি ফি ৮ হাজার ৫০ টাকা। কিন্তু এই সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে নরসিংদী আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক রাসেল আহমেদ শাহীন বলেন, আমাদের মূল সমস্যা বাইরের একটি চক্র। গ্রামপর্যায় থেকেই কিছু লোক নানা অজুহাতে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে, যার দায় এসে পড়ে অফিসের ঘাড়ে। অফিসের আশপাশেও তাদের একটি অংশ সক্রিয় রয়েছে। আমরা বিভিন্নভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছি। এসব বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে গিয়ে মাঝে মাঝে হুমকিও পেতে হয়। অতীতে কতিপয় সাংবাদিকও মাসোহারা নিতেন, বর্তমানে তা বন্ধ রয়েছে।

আরএআর