তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণ করা না হলে ঈদুল আজহার পর বৃহত্তর আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছে তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ। এই সময়ের মধ্যে নিজস্ব অর্থায়নে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারের কাছে রোডম্যাপ প্রকাশ ও একনেকে অর্থ বরাদ্দের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ।
বুধবার (২০ মে) দুপুরে নগরীর একটি বেসরকারি কমিউনিটি সেন্টার মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সভাপতি অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম হক্কানী এই দাবি জানান।
তিনি আরও জানান, নির্বাচনের আগে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে তিস্তাপাড়ের মানুষের গণজারগণ প্রমাণ করেছিল এটি এ অঞ্চলের মানুষের অস্তিত্বের লড়াই। গণজাগরণের মুখে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল নির্বাচনের আগে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, ক্ষমতায় যাওয়ার পর সেই প্রতিশ্রুতি নিয়ে নতুন করে টালবাহানা শুরু হয়েছে।
নজরুল ইসলাম বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে শেখ হাসিনা জনগণের সঙ্গে অঙ্গীকার করে বাস্তবায়ন করেনি, বরং প্রতিশ্রুতির ফাঁদে ফেলে প্রতারণা করেছেন। চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রেজওয়ানা হাসান ২০২৬ সালের পহেলা জানুয়ারি তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু হবে বলে দেশি ও বিদেশি গণমাধ্যমে বলেছিলেন। কিন্তু অদৃশ্য কারণে সেটা তারা শুরু করেননি।
তিনি আরও বলেন, অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা রেজওয়ানা হাসান আমাদের জানিয়েছিল, তিস্তাপাড়ের ৫ জেলার মানুষের মতামত নেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে চীনের কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতার বিষয়টি চূড়ান্ত করতে চীন সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। অথচ এখন পর্যন্ত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়নি।
নজরুল ইসলাম বলেন, বর্তমান সরকারের অভ্যন্তরে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য দেখা যাচ্ছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রী ও ত্রাণমন্ত্রী তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে ইতিবাচক কথা বললেও পানিসম্পদ মন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্যে জনগণের মধ্যে অনিশ্চিয়তা-উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। তিস্তা কোনো ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বিষয় না। এটি উত্তরের মানুষের বাঁচা-মরার লড়াই। আমরা নতুন করে আর তিস্তা নিয়ে সময়ক্ষেপণের রাজনৈতিক গালগল্প শুনতে চাই না। তিস্তাপাড়ের মানুষ সরকারের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা চায়, যেমনটা পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পে হয়েছে।
এ সময় তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে ৬ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে, ১. একনেক সভায় তিস্তা মহাপরিকল্পনার অনুমোদন করে প্রথম পর্যায়ের কাজ অবিলম্বে শুরু করা ও প্রকল্প বাস্তবায়নে রোডম্যাপ ঘোষণা, ২. জাতীয় বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ নিশ্চিত করাসহ পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে নিজস্ব অর্থায়নের ভিত্তি গড়ে তোলা, ৩. নদী প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, পরিবেশবিদ, জলবায়ু গবেষক, নদী আন্দোলন প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি স্বশাসিত কর্তৃপক্ষ গঠন, ৪. তিস্তা নদীর অববাহিকায় হিমাগার, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, কৃষি ভিত্তিক শিল্প-কারখানা, রপ্তানিমূখী শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলে কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা ও স্থায়ী কর্মসংস্থান তৈরি, ৫. তিস্তা নদী খননে পাথর, বালু উত্তোলনে সরকারি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং সেই আয়ে প্রকল্প, নদী সংরক্ষণে বিনিয়োগ করা, ৬. জনগণের অংশগ্রহণমূলক অর্থায়নের জন্য তিস্তা বন্ড চালু, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে তিস্তার তীর সংরক্ষণ, সেচ কাজ সম্প্রসারণ, শাখা, উপ-নদী পুনঃখনন, জলাধার নির্মাণ এবং কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সমন্বিত মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
এসব দাবি বাস্তবায়নে জুন মাস পর্যন্ত বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে ২১ থেকে ২৬ মে পর্যন্ত তিস্তা পাড়ের জনপদে ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় ও গণসংযোগ, ঈদুল আজহায় ঈদগাহ মাঠে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য বিশেষ মোনাজাত, ৫ জুন আসন্ন বাজেটে তিস্তা মহাপরিকল্পনার অর্থ বরাদ্দ, একনেক সভায় প্রকল্প অনুমোদন এবং সময়বদ্ধ রোডম্যাপ ঘোষণার দাবিতে রংপুর নগরে জনপ্রতিনিধি রাজনৈতিক দল সামাজিক সাংস্কৃতিক পেশাজীবী সংগঠন ও নাগরিক সমাজকে নিয়ে সংহতি সমাবেশ এবং জুন মাসব্যাপী তিস্তাপাড়ের পাঁচ জেলার ১২ উপজেলায় কর্মশালা, লিফলেট বিতরণ, হাটসভা পথসভা, গণসমাবেশ ও মশাল প্রজ্জ্বলন কর্মসূচি পালন করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে তিস্তা বাঁচাও নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শফিয়ার রহমান, সদস্য মোহাম্মদ আলী, বখতিয়ার হোসেন শিশিরসহ অন্যরা নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
ফরহাদুজ্জামান ফারুক/এএমকে
