বরিশাল বিভাগের মধ্যে বৃহত্তম বরগুনার আমতলীর পশু বিক্রির হাটসহ এ বছর জেলায় মোট ৪৬টি হাটে চলছে কোরবানির পশু বিক্রি। স্থানীয় খামারিসহ আশপাশের জেলা ও দূর-দূরান্ত থেকে পশু বিক্রি করতে সপ্তাহের নির্ধারিত দিনে বিক্রেতারা এসব হাট আসছেন। তবে হাটে চাহিদার তুলনায় বিভিন্ন পশু, বিশেষ করে গরুর সরবরাহ বেশি থাকায় কাঙ্খিত দাম পাচ্ছেন না বলে দাবি বিক্রেতাদের। অপরদিকে দাম নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়াও রয়েছে ক্রেতাদের।
জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর বরগুনায় স্থায়ী ১৭টি এবং অস্থায়ী ২৯টি মিলিয়ে মোট ৪৬টি হাটে কোরবানির পশু বিক্রি করা হবে। এর মধ্যে বরগুনা সদর উপজেলায় ১২টি, পাথরঘাটা, আমতলী ও তলতলী উপজেলায় ৮টি করে ২৪টি, বামনায় ৪টি এবং বেতাগীতে ৬টি হাটে কোরবানি উপলক্ষ্যে পশু বিক্রি হবে। সপ্তাহের নির্ধারিত দিনে এ সব হাটে চলবে পশু ক্রয় বিক্রয়।
প্রাণিসম্পদ কার্যালয় আরও জানায়, বরগুনায় এ বছর কোরবানির জন্য উপযুক্ত পশুর চাহিদা রয়েছে ৪০ হাজার ৮০৯টি। আপরদিকে জেলায় কোরবানিযোগ্য উদ্বৃত্ত পশু রয়েছে আরও ১০ হাজার ৬২৭টি। তবে গত বছর জেলায় মোট পশু কোরবানি হয়েছিল ৩০ হাজার ১৮২টি। এছাড়াও কোরবানির পশু জবাইসহ মাংস প্রক্রিয়াজাতকারী ১৪০ জন কসাইকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ১১৫ জন ইমামকে প্রশিক্ষণসহ ১ হাজার ৭৬০টি পশু জবাই ও চামড়া ছাড়ানো বিষয়ক লিফলেট বিতরণ এবং বিভিন্ন স্থানে ৩৫টি উঠান বৈঠক করা হয়েছে।
সরেজমিনে আমতলীর বৃহত্তম পশু বিক্রির হাট ঘুরে দেখা যায়, হাটে বড় আকৃতির তেমন কোনো গরু নেই। তবে ছোট ও মাঝারি আকৃতির গরুর সংখ্যা বেশি। পাশাপাশি মহিষ এবং ছাগলও বিক্রি করতে এ হাটে নিয়ে এসেছেন বিক্রেতারা। শুধু স্থানীয় খামারিরাই নয়, আশপাশের জেলা থেকেও বিক্রেতারা পশু বিক্রি করতে আমতলীর এ হাটে এসেছেন। তবে হাটে পর্যাপ্ত ক্রেতা থাকলেও পশুর দাম নিয়ে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। আর চাহিদা অনুযায়ী ক্রেতারা পশুর দাম না বলায়, বিশেষ করে গরুর দাম কম বলায় গরু বিক্রি করতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন হাটে আসা অনেক বিক্রেতা। তবে হাটের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও পশু পরিবহনের সময় পথে তেমন কোনো ভোগান্তি, হয়রানি এবং চাঁদাবাজি নেই বলে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন ক্রেতা ও বিক্রেতারা।
বরগুনার গুলিশাখালী এলাকার বাসিন্দা মো. মহিবুল্লা গত এক বছর ধরে চারটি গরু লালন পালন করেছেন। কোরবানি উপলক্ষ্যে ভালো দামে বিক্রির আশায় আমতলীর হাটে গরুগুলো নিয়ে এসে তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, এক বছরে চারটি গরুর পেছনে যে টাকা খরচ হয়েছে বিক্রি করতে এসে এখন দেখছি সেই টাকাই উঠছে না। তারপরও দুইটি গরু বিক্রি করেছি। বাকি দুটি যদি বিক্রি করতে না পারি তাহলে আবার টাকা খরচ করে বাড়ি ফেরত নিয়ে যেতে হবে।
মো. জামাল উদ্দিন নামে আরেক গরু বিক্রেতা ঢাকা পোস্টকে বলেন, গত বছর কোরবানির পরে ৮টি গরু কিনেছি। এই এক বছরে লালনপালন করতে প্রায় ছয় থেকে সাত লাখ টাকা খরচ হয়েছে আমার। কিন্তু বাজারে আগ্রহী ক্রেতার সংখ্যা কম এবং গরুর দামও কম বলছে। আমার ৮টি গরু যদি ১ লাখ টাকা করে বা তার একটু বেশি দামে বিক্রি করতে পারি তাহলেও কিছুটা অন্তত লাভ হবে। কিন্তু হাটে আসা ক্রেতারা ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা দাম বলেন, ওই দাবে গরুগুলো বিক্রি করতে পারছি না।

বরগুনা সদর উপজেলার আয়লা নামক এলকার বাসিন্দা মো. হারুন গাজী চারটি গরু বিক্রি করতে নিয়ে এসেছেন আমতলীর হাটে। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, হাটে এসে ৭৭ হাজার ৫৪ হাজার এবং ৫৩ হাজার টাকায় তিনটি গরু বিক্রি করতে পেরেছি। মোটামুটি ভালোই লাভ হয়েছে। তবে আরেকটি গরু এখনো বিক্রি করতে পারিনি।
এদিকে হাটে পর্যাপ্ত গরু থাকলেও ক্রেতাদের মধ্যে দাম নিয়ে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউ বলছেন গত বছরের তুলনায় দাম বেশি, আবার কেউ বলছেন তুলনামূলকভাবে এবার দাম কিছুটা কম।
আমতলীর হাটে গরু কিনতে এসে মো. ইব্রাহীম নামে এক ক্রেতা ঢাকা পোস্টকে বলেন, কোরবানি উপলক্ষ্যে গরু কিনতে এসেছি। হাট ঘুরে দেখলাম গত বছরের তুলনায় এ বছর দাম একটু বেশি। এখন যদি কিনতে না পারি, তাহলে শেষ দিকে কিনবো।
মো. হান্নান হাওলাদার নামে আরেক ক্রেতা ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমি গরু কিনতে এসেছি। গতবছরের তুলনায় এ বছর গরুর দাম কিছুটা কম। মাঝারি সাইজের গরু ৮০ হাজার ৯০ হাজার বা ১ লাখ ১০ হাজারের মধ্যেই পাওয়া যাচ্ছে। এতে আমার কাছে মনে হচ্ছে এবার গরুর দাম আমাদের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যেই আছে।
পটুয়াখালী থেকে আমতলীর হাটে গরু কিনতে এসে মো. ওমর ফারুক নামে এক ক্রেতা ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমার কাছে মনে হচ্ছে গতবারের থেকে এ বছর গরুর দাম একটু বেশি। তবে তা আহামরি বেশি না। গতবার যে গরু ১ লাখ ১০ হাজর ছিল তা এ বছর ১ লাখ ২০ হাজার এ রকম। যদি দরদামে মিলে তাহলে এ বছর দুটি গরু কেনার ইচ্ছা আছে। তবে মনে হচ্ছে সামনে আরও হাট থাকায় বিক্রেতারা দাম কমাচ্ছে না।
বরিশাল বিভাগের মধ্যে সব থেকে বড় আমতলীর পশুর বিক্রির হাটে ক্রেতা এবং বিক্রেতাদের সার্বিক সহযোগিতার কথা জানিয়ে ইজারাদারের পক্ষে হাট পরিচালনার দায়িত্বে থাকা নিয়াজ মোর্শেদ ইমন ঢাকা পোস্টকে বলন, বরিশালের মধ্যে আমতলীতে বৃহত্তর বাজার হওয়ায় আমাদের এখানে সব সময় একটু বেশি ভিড় থাকে। স্থানীয় খামারি এবং দূর-দূরান্ত থেকে পাইকাররা এখানে পশু বিক্রি করতে নিয়ে আসেন। তবে এখন পর্যন্ত কোরবানি উপলক্ষ্যে বিক্রি কিছুটা কম। কিন্তু বাজারের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে, পুলিশ প্রশাসন এবং প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে আমাদের সহযোগিতা করছেন। ঐতিহ্যবাহী এ বাজারের সুনাম ধরে রাখতে হাটের ইজারাদারদের পক্ষ থেকে আমরা ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়কেই সহযোগিতা করছি।
কোরবানি উপলক্ষ্যে জেলায় পশু প্রস্তুত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে বরগুনা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো.আসাদুজ্জামান ঢাকা পোস্টকে বলেন, আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষ্যে সারা দেশের ন্যায় বরগুনায়ও আমরা ব্যাপক কার্যক্রম হাতে নিয়েছি। জেলায় আমাদের পশুর ঘাটতি নেই। যারা মাংস প্রক্রিয়া করবেন এমন ১৪০ জন কসাই এবং ১১৫ জন ইমামকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও ৪৬টি হাট মনিটরিং করতে ১৪টি ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি সকল হাটের দৃশ্যমান জায়গায় ওই টিমের নম্বর দেওয়া থাকবে, কোথাও যদি কোনো পশুর অসংগতি অথবা অসুস্থ হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এছাড়াও ভেটেরিনারি ক্লিনিক নামে একটি গাড়িও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
বরগুনায় পশুর হাটসহ সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের তৎপরতা রয়েছে জানিয়ে জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) মোহাম্মদ ইব্রাহিম ঢাকা পোস্টকে বলেন, বরগুনায় এ বছর ১৭টি স্থায়ী ও ২৯টি অস্থায়ী হাটে কোরবানির পশু বিক্রি হবে। জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন পর্যায়ে আমাদের বেশ কয়েকটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রত্যেকটি হাটে আমাদের একটি করে বুথে পুলিশসহ জাল টাকা শনাক্তকরণের মেশিন থাকবে। পাশাপাশি সিভিল ড্রেস এবং ডিবি পুলিশের সদস্যরাও থাকবে। এছাড়াও মলম পার্টি, অজ্ঞান পার্টিসহ বিভিন্ন ধরনের দুষ্কৃতিকারীদের ধরতে পুলিশ তৎপর থাকবে। ক্রেতা বিক্রেতাদের পশু পরিবহনের সময় যাতে কোনো প্রকার হয়রানির শিকার না হতে হয় সে বিষয়ে পুলিশের নজরদারি জোরদার থাকবে।
আব্দুল আলীম/আরএআর
