বিজ্ঞাপন

এক সময়ের জমজমাট রাজারহাটে এখন লোকসান আর অনিশ্চয়তার দীর্ঘশ্বাস

এক সময়ের জমজমাট রাজারহাটে এখন লোকসান আর অনিশ্চয়তার দীর্ঘশ্বাস

যশোরের ঐতিহ্যবাহী রাজারহাট চামড়ার হাট ঘিরে চলছে ঈদুল আজহার প্রস্তুতি। তবে আগের সেই উৎসবমুখর ব্যবসায়িক প্রাণচাঞ্চল্যের বদলে এবার হাটজুড়ে ভাসছে অনিশ্চয়তার দীর্ঘশ্বাস। একদিকে ট্যানারি মালিকদের বকেয়া পরিশোধ না করা, অন্যদিকে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, চামড়ার দাম কমে যাওয়া ও বাড়তি সংরক্ষণ খরচ সব মিলিয়ে টিকে থাকাই এখন ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বৃহত্তম পশুর চামড়ার হাট হিসেবে পরিচিত রাজারহাট একসময় কোটি কোটি টাকার বাণিজ্যে সরব থাকতো। কিন্তু গত এক দশকের বেশি সময় ধরে সেই জৌলুস হারিয়েছে হাটটি।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, পরিকল্পিত বাজার ধস, ট্যানারি মালিকদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং পেমেন্ট জটিলতায় ধ্বংসের মুখে পড়েছে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় এই শিল্প।

হাটের এক পাশে দাঁড়িয়ে নিজের হতাশার গল্প বলছিলেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আব্দুল হামিদ। বংশপরম্পরায় চামড়ার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকলেও এখন তিনি প্রায় নিঃস্ব। গত বছর লোকসান সামলাতে ১ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে চামড়া কিনেছিলেন। কিন্তু সেই টাকার পুরোটা এখনও ফেরত পাননি। এবারও নতুন করে সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসায় নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

কণ্ঠে হতাশা নিয়ে হামিদ বলেন, ‘চামড়ার জগৎ থেকেই তো আমরা হারিয়ে গেলাম। ৩০-৩৫ টাকা ফুট চামড়া বিক্রি হচ্ছে, তাও আমরা ক্ষুদ্র পার্টিরা কিনব কী করে? আমরা তো শেষ হয়ে গেলাম।’

শুধু হামিদ নন, মাঠপর্যায়ের অধিকাংশ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর গল্প একই। তাদের অভিযোগ, প্রতি বছর কোরবানির ঈদ এলেই একটি অদৃশ্য সিন্ডিকেট চামড়ার দাম কমিয়ে দেয়। বর্তমানে চামড়ার মানভেদে প্রতি ফুট ১৫ থেকে ৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা মাত্র দুই মাস আগের তুলনায় অন্তত ১০ টাকা কম।

অন্যদিকে বাড়ছে ব্যবসার খরচ। চামড়া সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত লবণের দাম বস্তাপ্রতি ৮৫০ টাকা থেকে বেড়ে এখন ৯০০ থেকে ৯৫০ টাকায় পৌঁছেছে। একই সঙ্গে বেড়েছে পরিবহন ব্যয়ও।

এক ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে আমরা কোনো পেমেন্ট পাচ্ছি না। আন্তর্জাতিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে যদি বিদেশে রপ্তানি ব্যাহত হয়, তাহলে আমরা আরও বড় বিপদে পড়বো। কোরবানির আগে ট্যানারি মালিকরা টাকা পরিশোধ করলে তবেই বড় পরিসরে চামড়া কেনা সম্ভব হবে।

রাজারহাট চামড়ার হাটের নতুন ইজারাদার রাজু আহমেদ জানান, প্রায় অর্ধ কোটি টাকা দিয়ে তিনি এবার হাট ইজারা নিয়েছেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার ভাষায়, এক সময়ের কোটি টাকার এই হাটের বড় বড় ব্যবসায়ীরা আজ নিঃস্ব। কেউ চা বিক্রি করছেন, কেউবা ইজিবাইক চালাচ্ছেন। তারপরও আমরা আশা করছি নতুন সরকার এই শিল্পকে বাঁচাতে কার্যকর উদ্যোগ নেবে।

তিনি আরও জানান, ইরান-আমেরিকা-ইসরাইল যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে কেমিক্যালের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। আগে যে কেমিক্যাল ৩০ হাজার টাকায় পাওয়া যেত, এখন তার দাম দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা। এতে ট্যানারি মালিক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

যশোর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সহ-সভাপতি গিয়াসউদ্দিন বলেন, চামড়া ব্যবসার মূল সমস্যা হলো পেমেন্ট। ব্যবসায়ীদের হাতে টাকা থাকলে চামড়ার দাম এমনিতেই বাড়ে। কিন্তু এখন সবাই টাকার সংকটে। তিনি দাবি করেন, কোরবানির সময় চামড়ার দাম কমিয়ে দেওয়ার পেছনে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকে।

দক্ষিণবঙ্গের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই চামড়া শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে ব্যবসায়ীরা এখন সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ চাইছেন। সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ, ট্যানারি মালিকদের বকেয়া পরিশোধ নিশ্চিত করা এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনাই এখন রাজারহাটের হাজারো মানুষের প্রধান দাবি।

এ বিষয়ে যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণে লবণের কোনো সংকট যেন না হয় সে বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাজার মনিটরিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চামড়া পাচার রোধেও প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

রেজওয়ান বাপ্পী/আরকে