বিজ্ঞাপন

গাইবান্ধায় কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে কোরবানির গরু, কেনাবেচায় স্বস্তি

গাইবান্ধায় কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে কোরবানির গরু, কেনাবেচায় স্বস্তি

মুসলমানদের সব চেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা। ঈদকে ঘিরে গাইবান্ধা জেলার সাত উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ছোট-বড় খামারগুলোতে দেশীয় পদ্ধতিতে গরু, মহিষ ছাগলসহ অন্যান্য কোরবানির পশু মোটাতাজাকরণের কাজ একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে। প্রাকৃতিক খাবারে লালন-পালন করা পশুগুলোকে বাজারজাত করতে প্রচণ্ড ব্যস্ত সময় পার করছেন খামারি কৃষকরা।

হাটে এখনো জমজমাট বেচাকেনা শুরু না হলেও ক্রেতাদের একটি বড় অংশ এবার সরাসরি খামারমুখী হচ্ছেন। হাটের ভিড়, দালালদের উৎপাত, অতিরিক্ত হাসিল, সময় ব্যায়সহ নানা ভোগান্তি এড়াতে অনেকেই খামার বা কৃষক থেকে সরাসরি ক্রয় করছেন কোরবানির গরু। এরমধ্যে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে `মেসার্স ফ্রেন্ডস ক্যাটল‘ নামের জেলার সব চেয়ে বড় খামারে। এখানে ৫০০ টাকা কেজি দরে ওজনে বিক্রি হচ্ছে কোরবানির গরু।

খামারে পশু ক্রেতাদের মতে, খামারে গিয়ে গরু কেনার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো সময় নিয়ে পছন্দমতো পশু দেখে যাচাই-বাছাই করা যায়, হাটের মতো ভিড় বা চাপ নেই। খামারে প্রকাশ্যে দাম কিছুটা বেশি হলেও দরদাম নিয়ে বিভ্রান্তি কম এবং পশু কিনে ঠকার আশঙ্কা একেবারেই নেই। ঝামেলামুক্ত কেনাকাটার জন্য তারা এই পদ্ধতিকে প্রাধান্য দিচ্ছেন।

খামারিরা জানান, এ বছর পশুখাদ্য, ওষুধ, শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে, ঝামেলাহীন ও স্বচ্ছতা থাকায় হাটের তুলনায় খামারভিত্তিক পছন্দের কোরবানির পশু ক্রয়ের প্রবণতা বেড়েছে। ক্রেতারা বড় গরুর তুলনায় মাঝারি আকারের গরুর চাহিদা বেশি বলেও জানান তারা। জেলার খামারগুলোতে দেশি, শাহীওয়াল, ফ্রিজিয়ানসহ বিভিন্ন সংকর জাতের গরু লালন-পালন করা হয়েছে।

প্রচলিত পশুর হাটগুলোতে সংখ্যায় পশুর আধিক্য থাকলেও এখনো ক্রেতা উপস্থিতি কম এবং কাঙ্ক্ষিত বেচা-কেনা শুরু হয়নি। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদের দিন যত ঘনিয়ে আসবে, হাটের বেচাকেনা তত বাড়বে।

সরেজমিনে শনিবার (২৩ মে) দুপুরে সদর উপজেলার বোয়ালী ইউনিয়নের গাইবান্ধা-সাঘাটা রোডের ইন্দ্রারপাড় এলাকায় জেলার সব চেয়ে বড় খামার ফ্রেন্ডস ক্যাটলে গিয়ে দেখা যায়, শেষ মুহূর্তে পশু পরিচর্যায় ব্যস্ত খামারের মালিক-কর্মচারিরা। বড় বড় চুলায় রান্না হচ্ছে গরুকে খাওয়ানোর জন্য আলু। কেউ পশুর খাবার রান্না করছেন, কেউ মেশিনে ঘাস ও খর কাটছেন। কেউ খামার ও পশুর পরিচ্ছন্নতায় বৈদ্যুতিক মটরের পানিতে গরুগুলোকে গোসল করাচ্ছেন। এসবের পরে খাওয়ানো হয় ভুসি, ভুট্টা ভাঙা, সিদ্ধআলু, খর ও কাঁচাঘাসসহ প্রাকৃতিক খাবার।

দেখা যায়, খামার ঘুরে ঘুরে পছন্দের পশু খুঁজছেন ক্রেতারা। পাইকারি ব্যবসায়ীও আসছেন গরু ক্রয় করতে। গরু কিনে তারা গরুবাহী গাড়িতে করে নিয়ে যাচ্ছেন। বিক্রির জন্য ওজনে মাপা হচ্ছে গরু। এ সময় ২৮৪ কেজি ওজনের একটি দেশি জাতের ষাঁড় গরু মাপা হয় বিশাল ডিজিটাল বাটখারায়।

খামরের মালিক জুয়েল ঢাকা পোস্টকে জানান, ২০১৭ সালে কয়েকটি গরু দিয়ে শুরু করেছিলেন খামার। এ বছর তার খামারে ১৩০টি ষাঁড় সম্পূর্ণ দেশীয় খাবারে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে বেশ কিছু গরু বিক্রি হয়ে গেছে।

তিনি জানান, কয়েকদিন আগে ৫৩০ টাকা কেজি দরে গরু বিক্রি হলেও বর্তমানে ৫০০ টাকা কেজি দরে লাইফ ওজনে গরু বিক্রি হচ্ছে। মাত্রই একটি ২৮৪ কেজি ওজনের দেশি গরু বিক্রি হলো, মূল্য হয়েছে ১ লাখ ৪২ হাজার টাকা। প্রতি ১০০ কেজিতে ৫৫ কেজি মাংস পাওয়া যায় বলেও জানান খামারি জুয়েল।

তিনি বলেন, খামারে সরাসরি ওজনে বিক্রির গরু কিনতে ক্রেতাদের দিন দিন আগ্রহ বাড়ছে। কারণ এখানে হাটের ভিড়, দালালদের দৌরাত্ম, অতিরিক্ত হাসিল এবং কোনো ভোগান্তি নাই। এ ছাড়া, একটি গরু পছন্দ হলে তারা বারবার দেখছেন এবং কিনতে পারছেন।

কোরবানির জন্য গরু ক্রয় করা মুরাদ হাসান বলেন, খামারে গরু কেনার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো সময় নিয়ে পছন্দমতো পশু দেখে যাচাই-বাছাই করা যায়, হাটের মতো ভিড় বা চাপ নেই। আর ওজনে প্রকাশ্যে দাম কিছুটা বেশি হলেও দরদাম নিয়ে বিভ্রান্তি নেই এবং ঠকার আশঙ্কা নেই। আমি ওজন দরে পছন্দের গরু করতে পেরে ভালো লাগছে।

এ সময় গরু কিনতে আসা মাহবুবুর রহমান সরকার বলেন, হাটের ঝামেলা এড়াতে খামারে গরু দেখতে আসছি। নিজের মতো করে গরু দেখছি, কথা বলছি। পছন্দ হলে কেজি দরে ওজন করে কিনবো। এর চেয়ে সুবিধা আর মনে হয় অন্যভাবে পাওয়া যাবে না।

খামারে গরু দেখতে আসা রায়হান সরকার বলেন, গরু দেখতে আসছি। অনেক গরু আছে, গরুগুলো অনেক পছন্দের। এখানে ওজনে গরু বিক্রি হয়। আমরা দেখলাম, আর একটু যাচাই-বাছাই করে কোরবানির গরু কিনবো, ইনশাআল্লাহ।

গরু কিনতে আসা স্থানীয় ব্যবসায়ী ছাইদার রহমান বলেন, আমরা নিয়মিত এখানে গরু কেনা-বেচা করে থাকি। এখান থেকে গরু ক্রয় করে জেলার বিভিন্ন হাটে বিক্রি করে থাকি। আজ ছয়টি দেশি জাতের গরু ক্রয় করেছি। ভরতখালিরদ হাটে বিক্রি করবো।

খামারটিতে নারী-পুরুষসহ সাতজন কর্মচারী কাজ করেন। আব্দুল আজিজ নামে এক কর্মচারী বলেন, দুই বছর থেকে এখানে গরুকে খাওয়ানো, গোসল করানো, খরকাটা, ঘাসকাটা ও খামারে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করছি। আমাদের এখানে গরুকে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক খাবার খাওয়ানো হয়। দুই বেলা গমের ভুসি, ভুট্টা ভাঙ্গা ও আলু সিদ্ধ, খর ও কাঁচাঘাসসহ প্রাকৃতিক খাবার খাওয়ানো হয়। আমরা অনেক যত্ন করে থাকি।

শাবানা বেগম নামে আরেক কর্মচারী বলেন, আমিও দুই বছর যাবত এখানে কাজ করি। গরুর আলু সিদ্ধসহ গরুর খাবার রান্না, খাবার দেওয়ার কাজে সহযোগিতা ও কর্মচারীদের রান্নার কাজ করি থাকি।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক ঢাকা পোস্টকে বলেন, হাটের পাশাপাশি অনেক গরুর খামার ও গৃহস্থ কৃষকের বাড়ি থেকে বিক্রি হচ্ছে। ওইসব খামারে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বিভিন্ন সময়ে খোঁজ খবরসহ পরামর্শ ও চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছে। প্রত্যেক খামারিকে প্রাকৃতিক খাদ্যে গরু মোটাতাজা করণে উৎসাহিত করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, জেলার সাত উপজেলার স্থায়ী ও কোরবানির জন্য অস্থায়ী হাটগুলোতে অসুস্থ পশু ও কৃত্তিম উপায়ে বড় করা পশু শনাক্তে প্রাণিসম্পদের লোকজন কাজ করছেন।

শনিবার দুপুরে র‍্যাব-১৩, গাইবান্ধা ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার ও সহকারী পুলিশ সুপার তরিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ঈদকে কেন্দ্র করে পশুর হাটগুলোতে মানুষের ব্যাপক সমাগম হওয়ায় যে কোনো ধরনের চুরি, ছিনতাই, জাল টাকা লেনদেন, মলম পার্টি, অজ্ঞান পার্টি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি রোধে র‍্যাব সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

এ ছাড়া, জেলার পশুর হাটগুলোতে র‍্যাবের নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি ও সাদা পোশাকের সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। টহল টিম সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবে যাতে ক্রেতা-বিক্রেতারা নির্বিঘ্নে ও নিরাপদ পরিবেশে পশু ক্রয়-বিক্রয় করতে পারেন বলেও ওই বিজপ্তিতে বলা হয়।

প্রত্যেকটি হাটে পুলিশের আলাদা টিম কাজ করছে বলে পুলিশ সুপারের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে।

প্রসঙ্গত, জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্য মতে, জেলায় এ বছর স্থায়ী ১৯টি এবং অস্থায়ী ১৩টিসহ মোট ৩২টি স্থানে বসছে হাট। জেলায় খামার ও ব্যক্তি উদ্যোগে প্রস্তত করা হয়েছে গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও অন্যান্যসহ প্রায় ১ লাখ ৭৬ হাজার ৯৩৩টি প্রাণী। এর বিপরীতে চাহিদা ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ এবং উদ্বৃত্ত ৩৯ হাজার ৮২৬টি প্রাণী।

এএমকে