গত বছর কোরবানির পশুর চামড়া কিনে ৮৫ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে রংপুরের তরুণ উদ্যোক্তা রাশেদুজ্জামান রাশেদের। এ কারণে এ বছর চামড়া কেনেননি তিনি। একইভাবে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন আরও অনেকে। এ পরিস্থিতিতে রংপুর শহরে এবার গুটিকয়েক ব্যবসায়ীর মধ্যে চামড়া কেনাবেচা সীমাবদ্ধ ছিল। তারা সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে চামড়া কেনেননি। তাদের সিন্ডিকেটের কারণে এবারও পানির দরে বিক্রি হয়েছে চামড়া।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রংপুরে চামড়া বেচাকেনার জন্য বিখ্যাত চামড়াপট্টিতে এবার কোরবানির পশুর চামড়ার আমদানি হয়েছে তুলনামূলক অনেক কম। ঈদের দিন ছাড়া গত দুই দিনে সেখানে তেমন বেচাকেনা হয়নি। আর আমদানি কম থাকায় সক্রিয় ছিল পুরোনো সিন্ডিকেট। সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে চামড়া কেনেননি আড়তদারসহ বড় ব্যবসায়ীরা। ফলে কাঙ্ক্ষিত দাম পাননি মৌসুমি ব্যবসায়ীরা।
গত ১৩ মে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয় সরকার। ঢাকায় গরুর লবণযুক্ত চামড়া প্রতি বর্গফুটের দাম নির্ধারণ করা হয় ৬২-৬৭ টাকা। আর ঢাকার বাইরে এ দাম নির্ধারণ করা হয় ৫৭-৬২ টাকা। একই সাথে সারা দেশে খাসির লবণযুক্ত চামড়া প্রতি বর্গফুটের দাম ২৫-৩০ টাকা ও বকরির ক্ষেত্রে ২২-২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
কাঁচা চামড়ার ব্যবসায়ী, ট্যানারি মালিক ও চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে এ দাম নির্ধারণ করা হলেও বাস্তব চিত্র একেবারেই উল্টো। অভিযোগ রয়েছে, কৌশলে দরপতন ঘটিয়ে গতবারের মতো এবারও কোরবানির পশুর চামড়ার বাজার নষ্ট করেছে সিন্ডিকেট চক্র। এতে করে গরিব-অসহায় মানুষ তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
গরুর চামড়ার দাম কম, খাসির চামড়া ফ্রি
ঈদের দিন রাত ৮টার দিকে দুটি গরুর চামড়া ব্যাগে করে নিয়ে রংপুর শহরের শাপলা চত্বরে আসেন রায়হান ও রাফসান। দুই ভাই মিলে অন্তত ছয়জন ব্যবসায়ীর কাছে ঘুরে শেষ পর্যন্ত চামড়াপট্টিতে ইমরান ট্রেডার্স নামে এক গুদামে মাত্র সাড়ে ৪০০ টাকায় চামড়া দুটি বিক্রি করেন।
তাদের সাথে কথা হয় ঢাকা পোস্টের এই প্রতিবেদকের। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া খন্দকার ইন্তেহাজ ইবনে রায়হান বলেন, চামড়া যে এত সস্তা, আগে জানলে গর্ত করে মাটিতে পুঁতে ফেলতাম। গুদামে গুদামে ঘুরে মনে হয়েছে ব্যবসায়ীদের চামড়া কেনার আগ্রহ নেই। সাড়ে তিন লাখ টাকার দুটি গরুর চামড়ার দাম দিয়েছে সাড়ে ৪০০ টাকা। অথচ বাসায় ফড়িয়ারা গিয়ে চামড়া দুটো ৯০০ টাকা দাম বলেছিল। ভেবেছিলাম বেশি দামে বিক্রি হলে গরিব মানুষ একটু বেশি সহযোগিতা পাবে, কিন্তু এখানে এসে দেখলাম দাম তো নেই-ই, চামড়ার দামও কেউ বলতে চায় না।
ঈদের দিন সকাল থেকে পাড়া-মহল্লায় ঘুরে ঘুরে ১০টি গরুর ও ১৫টি খাসির চামড়া কেনেন নুর হোসেন। পীরগাছার সাতদরগা এলাকার মৌসুমি এই ব্যবসায়ী জানান, এবার তিনি বাড়ি বাড়ি ঘুরে ১০টি গরুর চামড়া ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা মূল্যে কিনেছেন। আর ছাগলের চামড়া নেন ১৫-৪০ টাকা করে। সবমিলিয়ে তার সাড়ে ৬ হাজার টাকা খরচ হয়। সেগুলো স্থানীয় চামড়াপট্টিতে বিক্রি করতে গিয়ে বিপাকে পড়েন তিনি। আড়তদারকে ছাগলের চামড়া ফ্রি-তে দিয়েও গরুর চামড়ায় লোকসান ঠেকাতে পারেননি। তার মোটে লস হয়েছে ৮০০ টাকা। সিন্ডিকেটের কারণে তিনি ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন।
সরকার-নির্ধারিত দামে হয়নি চামড়া কেনাবেচা
ঈদের আগে সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হলেও রংপুরে চামড়া কেনাবেচা হয়েছে ১০০ থেকে ৯০০ টাকার মধ্যে। বর্গফুটের হিসাব কষে কাঁচা চামড়ার দাম পায়নি কেউ। লবণযুক্ত চামড়ার দামের অর্ধেক দামেও চামড়া বিক্রি করতে না পেরে হতাশ মৌসুমি ব্যবসায়ীরা।
ঈদের দ্বিতীয় দিনে কোরবানির পশু জবাই করেন শহিদুল ইসলাম। তার বাড়ির পাশেই চামড়াপট্টি। সেখানে চামড়া বিক্রি করতে গিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েন। ঢাকা পোস্টকে তিনি বলেন, ‘সরকার এবার ঢাকার বাইরে গরুর লবণযুক্ত কাঁচা চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করেছে। যা গত বছরের তুলনায় বেশি। সেই হিসাবে একটি মাঝারি আকারের গরুর চামড়ার দাম অন্তত ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা হওয়ার কথা। কিন্তু সেই চামড়া বিক্রি করতে হলো মাত্র ৩০০ টাকায়।

সাধারণ মানুষ এবং মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, চামড়ার জন্য প্রসিদ্ধ রংপুর নগরীর শাপলা চত্বর টার্মিনাল রোডের চামড়াপট্টি এলাকার ব্যবসায়ীরাসহ জেলার বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণে এবারও সস্তায় চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন তারা।
সরাসরি বিক্রি কম, মাদরাসা ও এতিমখানায় দান
গত বছরের মতো এবারও চামড়ার করুণ দশায় সরাসরি আড়তদারদের কাছে কিংবা গুদামে চামড়া বিক্রি করতে আসা মানুষদের কম দেখা গেছে। সওয়াবের আশাসহ ঝামেলা এড়ানো ও দাম না পাওয়ার ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসতে একটি বড় অংশই মাদরাসা ও এতিমখানায় কোরবানির পশুর চামড়া দান করেছেন। মাদরাসাগুলোরও আয়ের অন্যতম বড় একটি উৎস এই চামড়া। কিন্তু এবারও দাম না থাকায় বিপাকে পড়েছেন তারা।
বদরগঞ্জ রোডের একটি হাফিজিয়া মাদরাসার শিক্ষক নাম প্রকাশে অনীহা জানিয়ে বলেন, মানুষ অনেক চামড়া দান করেছে। কিছু চামড়া আমরা নিজেরাও কিনেছি। কিন্তু ঈদের দিন রাত পর্যন্ত বিভিন্ন আড়তদারের সাথে দর কষাকষিতে লোকসানের সম্ভাবনা বেশি হওয়ায় বিক্রি করা হয়নি। বাধ্য হয়ে মাদরাসার মাঠে লবণ দিয়ে চামড়া সংরক্ষণ করা হয়েছে।
হাজীপাড়া চামড়াপট্টি এলাকার ব্যবসায়ী মোখলেছুর রহমান ঢাকা পোস্টকে জানান, ঈদের দিন বিভিন্ন মাদরাসা ও এতিমখানা থেকে ১২০০ পিসের মতো চামড়া কিনেছি। যার মধ্যে সর্বোচ্চ ১২০০ টাকার চামড়াও রয়েছে। মাঝারি ও ছোট সাইজের গরুর চামড়ার দাম ২০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত দাম দেওয়া হয়েছে। আমরা চেষ্টা করেছি যাতে গরিব-দুঃখীর হক নষ্ট না হয়। কিন্তু মাদরাসার চামড়ার কোয়ালিটি পাওয়া খুবই কষ্টকর। তারপরও ঝুঁকি নিয়েই চামড়া কিনেছি। লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করেছি। আর কিছুদিন পর আরেকবার লবণজাত করে তারপর হাটে তোলার কথা জানান তিনি।
দর পতনের কারণ সিন্ডিকেট নয়, দাবি ব্যবসায়ীদের
স্থানীয় চামড়া ব্যবসায়ীদের দাবি- সিন্ডিকেট মফস্বল পর্যায়ে হয়নি, এটি ঢাকায় হয়ে থাকে। মূলত পুঁজি সংকটসহ লবণের দাম বৃদ্ধি ও বিভিন্ন কারণে সরকার-নির্ধারিত দামে তারা চামড়া কিনতে পারেননি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে বকেয়া টাকা তুলতে ব্যর্থ হয়ে অনেকেই চামড়ার ব্যবসা ধরে রাখতে পারেননি। আবার অনেকে চামড়া ব্যবসায় ঋণ না পেয়ে পুঁজির অভাবে পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন।
চামড়াবিমুখ হয়ে থাকা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, তাদের পথে বসিয়ে দিয়েছেন ঢাকার ট্যানারি মালিকরা। চামড়া কিনে ঠিকমতো টাকা পরিশোধ করেননি তারা। ফলে বিভিন্নভাবে ঋণ করেও অনেকেই ব্যবসার পুঁজি ধরে রাখতে পারেননি। বছরের পর বছর বকেয়া টাকা তুলতে না পেরে অনেকে আবার বাপ-দাদার আদি ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। এখন চামড়া ব্যবসার সঙ্গে হাতেগোনা ১০-১২ জন ব্যবসায়ী জড়িত রয়েছেন।
সিন্ডিকেট প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে চামড়াপট্টি এলাকার প্রবীণ এক ব্যবসায়ী জানান, এবার হাতেগোনা কয়েকজন চামড়া কিনেছেন। তাদের মধ্যে প্রকাশ্যে সিন্ডিকেট না হলেও অন্তরের চাওয়া-পাওয়ায় মিল ছিল। এ কারণে চামড়ার দাম খুব বেশি ওঠেনি। এখানকার কয়েকজন ব্যবসায়ীর সিন্ডিকেট এবং খারাপ আচরণের কারণে বাইরের বড় বড় ব্যবসায়ী এবং ট্যানারির প্রতিনিধিরা এই এলাকায় আসতে পারেন না। এটার প্রভাব পড়েছে চামড়ার দামে।
এ বছর চামড়া কেনার প্রস্তুতি থাকলেও শেষ পর্যন্ত অর্থের যোগান না হওয়ায় গুদাম খোলেননি মাহবুবার রহমান বেলাল। পেশা বদল করে চামড়ার ব্যবসা ছেড়ে অটোরিকশার ব্যবসা করলেও ঈদ মৌসুমে চামড়া কেনাবেচা করেন তিনি।
এই ব্যবসায়ী বলেন, সিন্ডিকেট করে কী লাভ? এমনিতেই চামড়ার বাজারে ধস নেমেছে। ট্যানারি ছাড়া স্থানীয়ভাবে চামড়া সংরক্ষণের বিকল্প কোনো উপায় নেই। এখন আমদানিও কম। লবণের দাম তো বেড়েই চলেছে। এত কিছুর মাঝেও ট্যানারি মালিকরা সরকারের কাছ থেকে ঋণ পাচ্ছে। কিন্তু আমাদের মতো ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীরা বছরের পর বছর ধরে ঋণ সুবিধার বাইরে। আমাদের ঋণ দেওয়া হয় না। অথচ ট্যানারি মালিকেরা চামড়া ব্যবসার নামে ঋণ নিয়ে তা অন্যখাতে বিনিয়োগ করছে। যদি আমরা না বাঁচি তাহলে চামড়াশিল্প বাঁচবে কী করে?
সরকার-নির্ধারিত মূল্য মিলবে যেভাবে
চামড়াতে লবণ দিয়ে নিয়ে এলে সরকার-নির্ধারিত মূল্য পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
তিনি বলেন, চামড়ার যে মূল্যটা আমরা নির্ধারণ করেছি। সেই মূল্যটা নির্ধারণের প্রক্রিয়ার সময় স্টেক-হোল্ডারদের সাথে যুক্ত করেছি। আমরা যেদিন চামড়ার মূল্য নির্ধারণ করি সেদিন চামড়ার সংশ্লিষ্ট সমস্ত ব্যবসায়িক প্রতিনিধি ও নেতারা উপস্থিত ছিলেন। চামড়ার যে মূল্য ঘোষণা করা হয়েছে, সেটি লবণ মাখানো চামড়ার মূল্য।
ঈদের দিন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সাভারের আমিন বাজার এলাকায় চামড়ার আড়তে পরিদর্শনে গিয়ে সাংবাদিকদের কাছে শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
এর পরদিন শুক্রবার সাভারের তেঁতুলঝড়া ইউনিয়নের হরিনধরা এলাকায় বিসিক শিল্পনগরী ট্যানারি পল্লীতে বর্জ্য শোধনাগার পরিদর্শন শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, চামড়া নয়, চামড়ার পণ্য রপ্তানি করাই আমাদের উদ্দেশ্য। যাতে আমরা কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করতে পারি এবং উচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারি।
তিনি আরও বলেন, কাঁচা চামড়ার মূল্য তো অল্প। ওয়েট ব্লু, কাস্ট লেদার এবং ফিনিশিং লেদার একটি প্রসেস পর্যন্ত এটি চামড়া থাকে। এরপরে ওই চামড়া দিয়ে জুতা-স্যান্ডেল, ব্যাগ, বেল্ট, সুটকেস যাই বানানো হয়; সেটা চামড়াজাত পণ্য। এখন যদি ওয়েট ব্লু কাস্ট বা ফিনিস লেদার রপ্তানি না করে ব্যাগ, জুতা, বেল্ট তৈরি করা হয়; তাহলে মাঝখানে যে ভ্যালু এডিশন হচ্ছে- এটার পরিমাণ অনেক।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, কাঁচা চামড়া আর চামড়াজাত পণ্যের মাঝখানে অনেকগুলো প্রক্রিয়া রয়েছে। এর কারণে অনেকগুলো শিল্প কলকারখানা তৈরি হচ্ছে। এর মানে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হচ্ছে।
লোকসান আর পেশা বদলে বাড়ছে চামড়াবিমুখ ব্যবসায়ী
সরেজিমনে দেখা যায়, শাপলা চত্বর হাজীপাড়া চামড়াপট্টি সড়কের দু’পাশে ব্যাটারিচালিত অটো, অটোরিকশা ও ভ্যানের দোকানসহ অন্যান্য দোকান রয়েছে অন্তত ৩০টি। এর মধ্যে মাত্র তিনটি গুদামে নিয়মিত চামড়া কেনাবেচা করা হয়। তবে এবার ঈদে এখানকার মাত্র ছয়টি গুদামে চামড়া কেনা হয়েছে। বাকি যারা কিনেছেন তাদের বেশিরভাগই মৌসুমি ব্যবসায়ী ও ফড়িয়া।
এক সময়ের এই চামড়াপট্টিতে এখন চামড়ার গুদামের অস্তিত্ব সংকট। যার নমুনা দোকানগুলোর সাইনবোর্ডে তাকালে চোখে পড়ে। চামড়াপট্টির নাম পরিবর্তন করে এখন হয়েছে অটোপট্টি। এখানে শুধু অটোরিকশা বা ভ্যান বিক্রি করাই হয় না। এই এলাকায় কয়েকটি কারখানাও গড়ে উঠেছে, যেখানে এসব অটোরিকশা তৈরি করা হয়ে থাকে। রয়েছে অটোর যন্ত্রাংশ কেনাবেচার দোকানপাটও।
এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকরাই এক সময় চামড়ার ব্যবসায় জড়িত ছিলেন। কিন্তু একের পর এক লোকসান আর ঋণের ধকল টানতে না পেরে পেশা বদল করে এখন তারা অটোরিকশার বিক্রেতা। কেউবা জড়িয়ে গেছেন অন্য পেশায়। চামড়া ব্যবসায়ীদের পেশা বদলের সাথে সাথে বদলে গেছে এলাকার নামও।
চামড়াশিল্প বাঁচাতে সরকারের উদারতা ও নীতিমালা প্রয়োজন
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে বকেয়া টাকা তুলতে ব্যর্থ হয়ে অনেকেই চামড়ার ব্যবসা ধরে রাখতে পারেননি। আবার অনেকে চামড়া ব্যবসায় ঋণ না পেয়ে পুঁজির অভাবে পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন। তাদের দাবি, এ শিল্পকে বাঁচাতে হলে সরকারিভাবে চামড়া কেনাবেচায় নীতিমালা তৈরি, চামড়াশিল্পে ঋণের ব্যবস্থা করাসহ কাঁচা চামড়া সংরক্ষণে সরকারকে যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।

স্থানীয় চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সভাপতি হারুন অর রশিদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, দেশ স্বাধীনের আগে এই চামড়াপট্টি গড়ে উঠেছে। তখন এখান থেকেই নিয়মিত কলকাতায় যেত চামড়া। শুরুতে দেড় শতাধিক ব্যবসায়ী চামড়া কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ওই সময় চামড়ার ব্যবসার এতই প্রসার ঘটে, লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করে রাখা চামড়ার দুর্গন্ধে আশপাশের মানুষ রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে পারত না। অথচ এখন সেই চামড়াপট্টিতে চামড়া নেই। ব্যবসায়ী সমিতির কার্যক্রম নেই, ঢাকার বড় বড় আড়তদারও নেই। পুরো এলাকার চিত্র বদলে গেছে। শুধু ঈদের সময় মনে হয় এটি সেই পুরনো চামড়াপট্টি।
প্রণোদনা ও ঋণ সুবিধার আওতায় আনার দাবি
সচেতন মহল বলছে, সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য থামাতে না পারলে গরিবরা তাদের হক থেকে বঞ্চিত হবেন এবং কোরবানির পশুর চামড়া মাটিচাপা দেওয়া একটা রীতিতে পরিণত হবে। সিন্ডিকেট বন্ধ করে চামড়াশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারকেই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সঙ্গে চামড়া ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা ও ঋণ সুবিধার আওতায় আনতে হবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) রংপুর জেলা সভাপতি অধ্যক্ষ ফখরুল আনাম বেঞ্জু ঢাকা পোস্টকে বলেন, ঈদে চামড়া সংরক্ষণে যুক্ত ছোট ব্যবসায়ীদের ঋণ দেওয়া এবং রাসায়নিক আমদানি সহজ করতে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে। কাঁচা চামড়া সংরক্ষণে হিমাগার নির্মাণ ও কিছু ক্ষেত্রে চামড়া বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সনদের বাধা দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে। নয়তো চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিও চামড়াশিল্পের মতো হুমকিতে পড়বে।
রংপুর মহানগর দোকান মালিক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক তানবীর হোসেন আশরাফি ঢাকা পোস্টকে বলেন, চা-শিল্পের জন্য চা বোর্ড আছে, রেশম বোর্ড রয়েছে। বস্ত্র মন্ত্রলাণয় আছে। কিন্তু চামড়া নিয়ে কোনো অভিভাবক সংস্থা নেই। এ শিল্পের মানুষের কথা সরকারের কানে পৌঁছাতে হবে। এ শিল্পকে বাঁচানোর জন্য জাতীয় চামড়া বোর্ড গঠন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি কাঁচা চামড়া সংরক্ষণে ঋণ সুবিধা, রাসায়নিক দ্রব্য আমদানি সহজ করা ও সনদের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে।
রংপুর জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আফজাল হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, চামড়া কিনে কোথায় বিক্রি করা হবে, এ নিয়ে ব্যবসায়ীরা সব সময় চিন্তিত থাকেন। এখন চামড়ার দাম নেই। আর্থিকভাবে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত। দেশের প্রায় দুই শতাধিক ট্যানারির মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটি ছাড়া বাকিগুলোর অবস্থা নাজুক। এই পরিস্থিতিতে চামড়া কেনা ঝুঁকিপূর্ণ। তারপরও বাপ-দাদার ব্যবসায়িক ঐতিহ্য ধরে রাখতে অনেকেই এ শিল্পকে টিকিয়ে রেখেছেন।
ভালো দাম না পাওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, চামড়ার সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় বর্তমানে সাধারণ লোকজন থেকে শুরু করে চামড়া ব্যবসায়ীদের কেউই ভালো দাম পাচ্ছেন না। এমনিতে দীর্ঘদিন ধরে ট্যানারি মালিকদের কাছে এখানকার ব্যবসায়ীদের লাখ লাখ টাকা বকেয়া পড়ে আছে। ব্যবসায়ীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ পেশা পরিবর্তন করেছে অথবা পুঁজি হারিয়ে পথে বসেছে। তাই চামড়া শিল্পে ব্যাংক ঋণ চালু করাসহ সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানাচ্ছি।
২ লাখের বেশি পশু কোরবানি, লবণ বিতরণ ১৯৫ মেট্রিক টন
রংপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মুহ. নাজমুল হুদা ঢাকা পোস্টকে জানান, জেলায় এ বছর ২ লাখ ৫ হাজারের বেশি গরু, ছাগল, মহিষ, ভেড়া ও দুম্বা কোরবানি হয়েছে। এসব পশুর চামড়া স্থানীয় মৌসুমি ব্যবসায়ী ও ফড়িয়ারা কিনে বড় বড় ব্যবসায়ীদের কাছে বা আড়তে পৌঁছে দিয়েছেন। আড়তগুলো এসব চামড়া লবণজাত করে সংরক্ষণের ১৫ দিন থেকে এক মাসের মধ্যে ট্যানারি মালিকদের কাছে বা বিভিন্ন চামড়ার হাটে বিক্রি করে দেবেন।
বিসিক রংপুর জেলা কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক মো. এহেছানুল হক ঢাকা পোস্টকে বলেন, জেলায় ২ লাখের বেশি গবাদিপশু কোরবানি করা হয়েছে। এর মধ্যে গরু-মহিষ রয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজারের মতো, আর বাকি সব ছাগল-ভেড়া ও দুম্বা। জেলা শহরের আড়ত, মাদরাসা ও এতিমখানাগুলোতে ৫৩ হাজার ৬০০ গরু ও মহিষের এবং ২৯ হাজার ১০০ ছাগল-ভেড়া ও দুম্বার চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছে। এছাড়া আট উপজেলায় ব্যবসায়ী, মাদরাসা ও আড়ত পর্যায়ে সংগ্রহ হয়েছে এক লাখেরও বেশি চামড়া, সবমিলিয়ে এবার ২ লাখের বেশি চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, এ বছর সরকারের পক্ষ থেকে জেলার ছয় শতাধিক মাদরাসা ও এতিমখানায় চামড়া লবণজাত করার জন্য ১৯৫ মেট্রিক টন লবণ বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবসায়ীসহ আড়তদার ও মাদরাসাগুলো লবণজাতের মাধ্যমে চামড়া সংরক্ষণ করছেন। আগামী দু-একদিনের মধ্যে মাদরাসা ও এতিমখানায় সংরক্ষণ করা চামড়াগুলো স্থানীয় আড়তে পৌঁছে যাবে। এবার কোথাও চামড়া অবিক্রিত থাকায় নষ্ট হয়েছে এমন খবর পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেন তিনি।
আরএআর
