দীর্ঘ ১১ বছর পর প্রবাস থেকে বাড়ি ফিরছিলেন। কত আশা, কত স্বপ্ন। কথা ছিল বাড়ি ফিরে বিয়ে করবেন। সে অনুযায়ী বুধবার (৩ মে) মেয়ে দেখতে যাওয়ার কথা ছিল। যে কারণে ঈদুল আজহাকে লক্ষ্য করে বাড়িতে ফেরা। তবে সেসব স্বপ্ন-আনন্দ নিমিষেই বিষাদে পরিণত হয়েছে। মঙ্গলবার (২ জুন) ভোররাতে ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে সড়ক দুর্ঘটনায় পরিবারের আরও তিন সদস্যকে নিয়ে পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন প্রবাসফেরত আরিফুল ইসলাম (৩০)। তিনি যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার বাঁকড়া বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের শহিদুল ইসলামের ছেলে।
জানা গেছে, ভূমিহীন পরিবারের সন্তান আরিফুল ১১ বছর আগে সংসারের হাল ধরতে পাড়ি জমিয়েছিলেন মালয়েশিয়ায়। সেখানে উপার্জনের টাকায় ৫ শতক জমি কিনে মাথা গোঁজার ঠাঁই করেছিলেন। সোমবার (১ জুন) রাতে ছুটিতে দেশে ফেরেন। এক বুক আশা ও আনন্দ নিয়ে তাকে স্বাগত জানাতে ঢাকায় বিমানবন্দরে গিয়েছিলেন মা নুরজাহানসহ পুরো পরিবার। কিন্তু বাড়িতে পৌঁছানোর আগেই ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় মা, ভাই ও বোনকে নিয়ে চিরবিদায় নিলেন তিনি। এখন সেই বাড়িতে চলছে শোকের মাতম।
আরিফুলের পাশাপাশি এ ঘটনায় নিহতরা হলেন- আরিফুলের মা নুরজাহান বেগম, বোন আয়েশা আক্তার (৩২) ও ছোট ভাই রাকিবুল ইসলাম (১৮)। একই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান প্রাইভেট কারের চালক জাহিদ হোসেন। তিনি পার্শ্ববর্তী মনিরামপুর উপজেলার গৌরপুর গ্রামের বাসিন্দা। এ ঘটনায় অলৌকিকভাবে বেঁচে গেছেন আরিফুলের বোনের মেয়ে মোছা. তাসফিয়া (৩) ও ছেলে মো. হুসাইন (৬)।
ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েতে সংঘটিত ওই দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই বালিয়াডাঙ্গা গ্রামে নেমে আসে শোকের ছায়া। স্বজনদের কান্না আর প্রতিবেশীদের আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
নিহত আরিফুলের মামা নজরুল ইসলাম বলেন, আরিফ ১১ বছর বিদেশ ছিল। সোমবার দিবাগত রাতে বিমানবন্দরে নেমেছিল। তাকে আনতে গিয়েছিল মা, ভাই, বোন ও ভাগনে-ভাগনি । ফেরার পথে একই পরিবারের চারজন মারা গেছে। বাবা ছাড়া পরিবারে কেউ নেই।
প্রতিবেশী জাহাঙ্গীর আলম জানান, ১৮ বছর বয়সে বিদেশ গিয়েছিল আরিফুল ইসলাম। অভাবের সংসার ছিল। এখন তাদের সুখের সংসার। যখন সুখ ভোগ করবে, তখন পরিবারের চারজন চলে গেল।
আরিফুলের দুলাভাই ইলিয়াস হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন পর গতকাল রাতে মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফেরেন আমার বড় শ্যালক। তাকে আনতে আমার স্ত্রী, ছোট শ্যালক ও শাশুড়িসহ ছেলে-মেয়েরা বিমানবন্দরে গিয়েছিলো। বাড়িতে আসার পথে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এই মর্মান্তিক মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না আমরা। আজকে যেখানে দীর্ঘদিন পর বাড়িতে সে আসবে, বাড়ি আনন্দময় থাকার কথা, কিন্তু সেখানে শোকের মাতম চলছে।
মামাতো ভাই মিন্টু রহমান বলেন, এই পরিবারটি খুবই দরিদ্র ছিল। ভূমিহীন ছিল। সংসারের সুখ ফেরাতে বিদেশ গিয়েছিল। বাড়ির জন্য জমি কিনেছিল, বাড়ি করেছে। এখন সেই বাড়িতেই শোকের মাতম চলছে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মোসলেম উদ্দিন জানান, আরিফুলের দেশে ফিরে বিয়ে করার কথা ছিলো। আগামীকাল মেয়ে দেখতে যাওয়ার কথা। যে পরিবারের আনন্দ উৎসব হবে সেখানে আমাদের চোখ জলে ভাসছে। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে পরিবারের ৫ সদস্যের মধ্যে শুধু বাড়িতে থাকার কারণে বেঁচে গেছেন হতভাগা বাবা শহিদুল ইসলাম। তিনি বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। তার পুরো পৃথিবীটাই এখন শূন্য।
বাঁকড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনিস-উর রহমান বলেন, আরিফুলের মা নুরজাহান বেগম সংরক্ষিত ইউপি সদস্য পদে নির্বাচন করায় এলাকায় বেশ পরিচিত ছিলেন। সড়ক দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে খোশালনগর-বালিয়াডাঙ্গা গ্রাম শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, আরিফুলের বাড়িতে আরিফুল, তার ভাই রাকিবুল ও মা নুরজাহান বেগমের দাফনের জন্য তিনটি কবর খোড়া হচ্ছে। তার বোন আয়েশা আক্তারের কবর হবে উজ্জ্বলপুর গ্রামে স্বামীর বাড়িতে।
রেজওয়ান বাপ্পী/আরএআর
