বিজ্ঞাপন

রাজশাহীতে ৪০, ঢাকায় ৯০ টাকা—একই আমের দামে কেন এত ব্যবধান?

রাজশাহীতে ৪০, ঢাকায় ৯০ টাকা—একই আমের দামে কেন এত ব্যবধান?

রাজশাহীর বানেশ্বর আমহাটে যে আম্রপালি আম ৪০-৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে, একই আম রাজশাহী নগরীতে ৬০-৭০ টাকা এবং ঢাকায় গিয়ে ৮০-৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। উৎপাদন এলাকা থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত পৌঁছাতে একই আমের দামে দেখা দিচ্ছে বড় ব্যবধান।

ব্যবসায়ী ও খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছাতে পরিবহন, প্যাকেটজাতকরণ, বাজারভেদে মূল্য নির্ধারণ ও মধ্যস্বত্বভোগীদের মুনাফার প্রভাব পড়ছে আমের দামে।

রাজশাহীর সবচেয়ে বড় আমের মোকাম পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বর হাট। এই হাটে আম্রপালি আম বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার টাকা মণ দরে। সেই হিসাবে প্রতি কেজি দাম পড়ছে ৪০ থেকে ৫০ টাকা। লক্ষণভোগ আম বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ৭৫০ টাকা মণ দরে, যা কেজিতে ১৫ থেকে ১৮ দশমিক ৭৫ টাকা। এছাড়া হিমসাগর বা ক্ষিরশাপাতি আম ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রতি কেজিতে এর দাম ৩২ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ৪০ টাকা হয়। গোপালভোগ আম বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা মণ দরে, যা কেজিতে ২৫ থেকে ৩৫ টাকা।

অন্যদিকে, বানেশ্বর হাট থেকে মাত্র ১৭ কিলোমিটার দূরের রাজশাহী নগরীর সাহেববাজারে হিমসাগর আম বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৬০ টাকা এবং গোপালভোগ আম ৭০ টাকা কেজি দরে। নগরীর ভদ্রা মোড় এলাকায় ক্ষিরশাপাতি ৬০ টাকা ও গোপালভোগ আম ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। এছাড়া রাজশাহীর শিরোইল ঢাকা বাসস্ট্যান্ড এলাকার বাজারে গোপালভোগ আম ৪৫ টাকা, ক্ষিরশাপাতি ৫৫ টাকা এবং রাণীপছন্দ ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

সাহেব বাজারের রবি-ইয়াসিন ফল ভান্ডারের বিক্রেতা ইয়াসিন বলেন, বাজারে ক্ষিরশাপাতি আম বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৬০ টাকা এবং গোপালভোগ আম বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকা কেজি দরে। এই আমগুলো বিভিন্ন বাগান ও হাট থেকে সংগ্রহ করা।

সাহেব বাজারে আম ক্রেতা মেহেদী হাসান বলেন, রাজশাহী শহরের আশপাশের হাট-বাজারগুলোতে আমের দাম বাজারের তুলনায়। কিন্তু সেগুলো শহরের বাইরে হওয়ায় যাওয়া-আসায় সময় ও অর্থ নষ্ট হয়। তাই হাতের কাছে পেয়ে এখানেই কিনে নিচ্ছি। তবে কয়েক মণ আম কিনলে হাটে যাওয়া ভালো। 

ব্যবসায়ীরা জানান, স্থানীয় বাজার ছাড়িয়ে ঢাকায় পৌঁছালে একই আমের দাম আরও বেড়ে যায়। বর্তমানে ঢাকার বিভিন্ন বাজারে এসব আম ৮০ থেকে ৯০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। 

শিরোইলের আম ক্রেতা সাপলা খাতুন বলেন, এসি বাসে ১০ কেজির বেশি আম তুলতে দিচ্ছে না। এছাড়া ঢাকায় যে আমগুলো বিক্রি হয়, সেগুলো অন্য জেলার আম ব্যবসায়ীরা রাজশাহীর বলে বিক্রি করে। সেখানে দামও বেশি। রাজশাহীতে যে গোপালভোগ আম ৪৫ টাকা, ক্ষিরশাপাতি ৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সেই আম ঢাকায় ৯০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তাই রাজশাহী থেকে আম কিনছি। 

শিরোইলের আরিফুল ফল ভান্ডারের বিক্রেতা গোলাম মোস্তফা বলেন, এখানে বেশিরভাগ মানুষ ঢাকাসহ বিভিন্নস্থানে আম নিয়ে যায়। 

ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, রাজশাহী থেকে ঢাকায় আম পাঠাতে প্যাকেটজাতকরণে প্রতি মণ আমে প্রায় ৩০০ টাকা খরচ হয়। এছাড়া কুরিয়ার ও পরিবহন ব্যয় মিলে প্রতি কেজিতে আরও ১২ থেকে ১৩ টাকা পর্যন্ত খরচ যোগ হয়। এসব খরচের সঙ্গে মধ্যস্বত্বভোগী ও খুচরা বিক্রেতাদের মুনাফা যুক্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে দাম অনেক বেড়ে যায়।

ফলে দেখা যাচ্ছে, বানেশ্বর হাটে যে ক্ষিরশাপাতি আমের কেজি ৩২ থেকে ৪০ টাকায় কেনা যাচ্ছে, সেই আমই রাজশাহী শহরের বাজারে ৬০ টাকা এবং ঢাকায় ৮০ থেকে ৯০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। একই চিত্র দেখা যাচ্ছে গোপালভোগসহ অন্যান্য জাতের আমের ক্ষেত্রেও।

বানেশ্বর থেকে ঢাকার কল্যাণপুরে আত্মীয়ের বাড়িতে আম পাঠাবেন শামসুজ্জামান খান। তিনি বলেন, রাজশাহীর বানেশ্বরে আমের দাম কম। এখানে পাইকার ও খুচরা আম কেনাবেচা হয়। কিন্তু এখান থেকে রাজশাহীর অনেক ব্যবসায়ী আম কিনে বিক্রি করে। পাইকারের তুলনায় খুচরা তো দাম বেশি হবেই। ঢাকায় রাজশাহীর আম বলে নামে-বেনামে অনেক আম বিক্রি হয়। একই আম রাজশাহী শহরে কিনলে কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা কম পড়বে।

বানেশ্বরের আম ব্যবসায়ী গোলাম মোস্তফার মতে, উৎপাদন এলাকা থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত পৌঁছানোর পথে পরিবহন, প্যাকেজিং ও বাজারভেদে মূল্য সংযোজনের কারণেই একই আমের দামে এত বড় ব্যবধান তৈরি হচ্ছে।

দামের পার্থক্য নিয়ে জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তরের রাজশাহী জেলার সহকারী পরিচালক বিপুল বিশ্বাস বলেন, আসলে আমের দাম নির্ধারণ করা নেই। তারপরও কেউ বাজার দরে থেকে অতিরিক্ত দামে বিক্রি করলে বিষয়টা আমরা দেখব। 

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, এ বছর আম চাষ হয়েছে ১৯ হাজার ৬২ হেক্টর জমিতে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৭৯৩ মেট্রিক টন। এ বছর সামগ্রিকভাবে আবহাওয়া অনুকূলে ছিল, যা আমের বাম্পার ফলনে সহায়ক হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া এবং মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাদের নিয়মিত পরামর্শ ও তদারকির ফলে এ বছর আমের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে। এমনকি গত বছরের তুলনায় এ বছর আমের ফলনও বেশি হয়েছে। ঈদের পর আমের বাজারমূল্য তুলনামূলকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সামনের দিনগুলোতে দাম আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

শাহিনুল আশিক/আরকে