কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে সরকার এ বছর লবণযুক্ত চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট দুই টাকা বাড়ালেও গাইবান্ধার হাট-বাজারে মিলছে না সেই মূল্য। সরকারি দরের চেয়ে অনেক কম দামে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন মৌসুমি ব্যবসায়ী, মাদরাসা ও এতিমখানা কর্তৃপক্ষ। এতে একদিকে যেমন লোকসানের মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা, অন্যদিকে বঞ্চিত হচ্ছে এতিম ও অসহায়দের প্রাপ্য অর্থ। বাজারে সিন্ডিকেটের প্রভাব ও ট্যানারিগুলোর ভূমিকা নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন।
এদিকে একই সময়ে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি বাড়ছে, ট্যানারিগুলো লাখের পর লাখ চামড়া সংগ্রহ করছে। এরপরও কাঁচা চামড়ার বাজারে ধসের পেছনে বড় বড় ব্যবসায়ী এবং ট্যানারি সংশ্লিষ্টদের সিন্ডিকেটকেই দুষছেন ক্ষুদ্র ও মৌসুমি ব্যবসায়ী এবং মাদরাসা-এতিমখানা কর্তৃপক্ষ।
এ বছর ঢাকায় গরুর লবণযুক্ত চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করে দেয় সরকার। আর ঢাকার বাইরে এ দাম নির্ধারণ করা হয় ৫৭-৬২ টাকা। যা গত বছরের তুলনায় ২ টাকা বেশি।
এই হিসাবে ঢাকার বাইরে একটি মাঝারি আকারের গরুর চামড়ার দাম হওয়ার কথা ছিল ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৭৫০ টাকা। কিন্তু বাস্তবে কোরবানির দিন থেকে এখন পর্যন্ত গাইবান্ধার বিভিন্ন এলাকা ও হাটে সেই চামড়া বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকায়। ছোট আকারের চামড়া বিক্রি হয়েছে ২৫০ থেকে ৪০০ টাকায় এবং বড় আকারের চামড়া ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

মাঠ পর্যায় থেকে চামড়া সংগ্রহকারী সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি দামের ন্যায্যতা বাস্তবায়নে মাঠ পর্যায়ে কোনো তদারকি নেই। বিভিন্ন সুযোগ নিয়ে কম দামে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য করছেন সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা। নানা অজুহাতে তারা সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কম দামে ক্রয় করছেন চামড়া। আর এতে বাধ্য হয়ে ক্ষতিতে বিক্রি করতে হচ্ছে পচনশীল এ পণ্য।
তবে, এমন অভিযোগের প্রশ্নে আড়তদার-ব্যবসায়ীরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের দাবি, সিন্ডিকেট এখানে নয়; কারসাজি চলে ঢাকায়। মূল ব্যবসায়ীদের (ট্যানারি মালিক) ওপর নির্ভর করে চামড়া কিনতে হয় স্থানীয় আড়তদারদের। অনেক ক্ষেত্রে তারাও জিম্মি রয়েছেন ট্যানারি মালিকদের কাছে। মূলত ট্যানারি মালিকরা সরকারি মূল্যে চামড়া কিনছেন না।
এছাড়া চামড়ায় স্পট, কাটা-ছেঁড়া ও করোনা (লাম্পি রোগের ক্ষত চিহ্ন) থাকায় সঠিক দামে কেনা যাচ্ছে না বলেও জানান স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। এছাড়া মৌসুমি ব্যাপারী ও মাদরাসা বা এতিমখানার সংশ্লিষ্টরা লবণ ব্যবহারে সঠিক পদ্ধতিতে চামড়া সংরক্ষণ করতে না পারায় কমে যায় চামড়ার গুণগতমান। ফলে সে ক্ষেত্রেও চামড়ার দাম কমে আসে বলেও জানান তারা।
গাইবান্ধার সবচেয়ে বড় পাইকারি চামড়ার বাজার পলাশবাড়ি উপজেলা সদরের মহাসড়কের পাশে কালিবাড়িতে। সপ্তাহের শনিবার ও বুধবার বসে এই হাট। বিশেষ করে কোরবানির ঈদের প্রথম বুধবারে জমে ওঠে এই হাট। এছাড়া ওই হাটবার থেকে (ঈদের পর) পরবর্তী আরও দুই হাটে চলে বেচাকেনা। রংপুর বিভাগের উত্তরাঞ্চলের ৮ জেলা ছাড়াও ঢাকা ও গাইবান্ধার আশপাশের অন্যান্য জেলা থেকেও ক্রেতা-বিক্রেতা আসেন এই হাটে।
কোরবানি ঈদ পরবর্তী প্রথম বুধবার (৩ জুন) পলাশবাড়ি চামড়ার হাটে চোখে পড়ে পাইকার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও মৌসুমি ব্যবসায়ীদের সরব উপস্থিতি। তবে, অন্যন্যা বছরের তুলনায় আজকের হাটে আমদানি অনেকটা কম বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে বেচাকেনাও কম। কিন্তু আগামী দুই হাটে বেচাকেনা বাড়ার সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছেন হাট সংশ্লিষ্টরা।
চামড়ার হাটে আসা গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার এরেন্ডাবাড়ী ইউনিয়নের গিজাবাড়ী এলাকার বাসিন্দা গোলাপ চাঁন (৫০) বলেন, ধারদেনা করে সরকার নির্ধারিত মূল্যে ৭০০ পিস চামড়া কিনেছিলাম। হাটে মূল ক্রেতার বদলে চামড়া কিনছেন তাদের প্রতিনিধিরা। তারা যে দাম দিচ্ছেন, তাতে চামড়াপ্রতি ২০০ টাকা লোকসান হচ্ছে।
গোলাপ চাঁনের অভিযোগ, ঈদ-পূর্ববর্তী সময়ে যে চামড়ার দাম ছিল এক হাজার টাকা, এখন সেই চামড়ার দাম বলা হচ্ছে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। তিনি আরও জানান, চামড়া কেনার পর গায়ে লেগে থাকা মাংস তোলা, ধোঁয়া, লবণ দেওয়া ও পরিবহনসহ চামড়া প্রতি খরচ হয় প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। সব মিলিয়ে যে চামড়া কেনা পড়েছে ৮০০ টাকা। অথচ তার দাম বলা হচ্ছে ৬০০ টাকা।

একই রকম মন্তব্য করেন দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার আমবাড়ী থেকে আসা ব্যবসায়ী সুবাস চন্দ্র।
তিনি বলেন, সরকার নির্ধারিত প্রতি বর্গফুট ৫৭ থেকে ৬২ টাকা বিক্রির টার্গেটে চামড়া কিনেছি। কিন্তু হাটে চামড়া কেনা হচ্ছে ২০ থেকে ৩০ টাকা দরে। ফলে চামড়া প্রতি প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে।
এদিকে, লোকসানে চামড়া বিক্রি করছেন স্থানীয় খুদে ব্যবসায়ীরাও। গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার ঢোলভাঙ্গা এলাকার ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলামের অভিযোগ, স্থানীয় পর্যায়ে মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারণে ন্যায্য মূল্যে চামড়া বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি দাবি করেন, তারা (মধ্যস্বত্বভোগী) ট্যানারি মালিকদের আশ্বস্ত করেন যে, ‘আপনারা যে দামে চামড়া কিনবেন, সেই চামড়া তার চেয়ে কম দামে আপনাদের আমরা কিনে দেব।’ বাস্তবে হচ্ছেও তাই। সে কারণে ট্যানারি মালিকরা সরেজমিনে হাটে এসে আর চামড়া কেনেন না।
গাইবান্ধা শহরের ফকিরপাড়ার হাফেজিয়া মাদরাসা ও এতিমখানার হুজুর জোবায়ের ঢাকা পোস্টকে জানান, তারা এবারের কোরবানির ঈদে ১২৭টি গরুর চামড়া সংগ্রহ করেছিলেন। এছাড়া পোস্ট অফিস হাফেজিয়া মাদরাসা ১৭৬টি এবং মুন্সিপাড়া হাফেজিয়া মাদরাসা ও এতিমখানা ২১৩টি চামড়া সংগ্রহ করেছিল। তারা পলাশবাড়ির এক ব্যবসায়ীকে প্রত্যেকটি চামড়া গড়ে ৫০০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন।
তিনি বলেন, অপর এক ব্যবসায়ী একটি করে চামড়া ৭০০ টাকা করে দাম ধরে কিনতে চেয়েছিলেন কিন্তু আমরা দেইনি। কারণ অভিজ্ঞতা বলে, ওরা বাছাই করতে করতে শেষ পর্যন্ত ১০০ এর মধ্যে ১০ থেকে ১৫টি চামড়া সলিড বের করে নিয়ে বাকি সব নামমাত্র মূল্যে নিয়ে নিতেন।
মাওলানা জোবায়ের বলেন, ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে চামড়ার দাম কমিয়ে ক্রয় করে থাকেন। ফলে দেশের গরিব-দুঃখী মানুষ এবং এতিমদের হক নষ্ট হচ্ছে, তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। মূলত মাদরাসা শিক্ষাকে ধ্বংস করতে এটি একটি পায়তারাও বলা যায়। তিনি জানান, ২০০৭/২০০৮ সালে একটি চামড়া আমি নিজে ৬৪০০ টাকায় বিক্রি করেছি। তারপর থেকেই সিন্ডিকেটরা বাজারে পতন ঘটিয়েছেন।
তবে, মৌসুমি ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন স্থানীয় চামড়া ব্যবসায়ী মাহমুদুল হাসান। তিনি সাভার হেমায়েতপুরের আর কে লেদার কমপ্লেক্স ট্যানারির ক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তিনি বলেন, হাটে উন্মুক্তভাবে চামড়া কেনাবেচা হচ্ছে। এখানে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চামড়া কেনাবেচার কোনো সুযোগ নেই।
সরকার নির্ধারিত মূল্যে চামড়া ক্রয় করা হচ্ছে না এমন অভিযোগের বিষয়ে মাহমুদুল হাসান বলেন, একটি চামড়ার ‘এ’ থেকে ‘এইচ’ পর্যন্ত মোট ৮টি গ্রেড রয়েছে। ‘এ’ ক্যাটাগরির চামড়া প্রতি বর্গফুট ৬০ টাকা দরেই ক্রয় করা হচ্ছে। কিন্তু পরবর্তী গ্রেডের চামড়াগুলো কম দাম, তথা ২০ থেকে ৩০ টাকা ফুটের চেয়ে বেশি দরে ক্রয়ের সুযোগ নেই।
স্থানীয় চামড়া ক্রেতা আব্দুর রহিম জানান, চামড়া সংরক্ষণেও ত্রুটি রয়েছে। চামড়ায় চাহিদা অনুযায়ী লবণ দেওয়া হচ্ছে না। এছাড়া লাম্পি স্কিন রোগের কারণেও এবারের চামড়ার মান তুলনামূলক খারাপ। এসব কারণেও চামড়ার দাম কম।
কালিবাড়ী হাট ইজারাদারের প্রতিনিধি ফিরোজ কবির জানান, চামড়া হাটে ক্রেতা-বিক্রেতারা যাতে সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে বেচাকেনা করতে পারেন, সেজন্য সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ঈদ উপলক্ষ্যে চামড়া প্রতি ২৫ টাকা করে হাসিল (জমা) গ্রহণ করা হচ্ছে।
পলাশবাড়ি কালিবাড়ি চামড়া হাটের সাধারণ সম্পাদক মিনু মন্ডল ঢাকা পোস্টকে বলেন, ট্যানারি মালিক কিংবা তাদের প্রতিনিধিরা হাটে চামড়া কেনেন। কিন্তু তারাই সরকারি রেটে (নির্ধারিত মূল্যে) চামড়া কিনছেন না। যার ফলে স্থানীয় আড়তদাররাও সরকারি নির্ধারিত মূল্যে চামড়া কিনতে পারছে না।
অন্যদিকে মাঠ পর্যায়ের যারা সরকারি রেটে চামড়া কিনছেন তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। মূলত স্থানীয় আড়তদাররাও ট্যানারি মালিকদের কাছে জিম্মি।
এদিকে, চামড়া সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জানতে চেয়ে ফোন করা হলে ঢাকা পোস্টকে কোনো তথ্যই জানাতে পারেনি বিসিক জেলা কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক আব্দুল্লাহ আল ফেরদৌস। এক পর্যায়ে তিনি ডিসি অফিসে সকল তথ্য দেওয়ার কথা জানিয়ে সেখান থেকে সংগ্রহ করে নিতে বলেন।
গাইবান্ধা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আব্দুর রাজ্জাক ঢাকা পোস্টকে জানান, জেলায় এ বছর গরু-মহিষ ৪৪ হাজার ৯০টি এবং ছাগল-ভেড়া ৫৬ হাজার ৪২৪টিসহ মোট কোরবানি হয়েছে ১ লাখ ৫১৪টি পশু। যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১১ হাজার বেশি।
মাসুম বিল্লাহ/এসএইচএ
