বিজ্ঞাপন

ভক্তির ফুলে তাদের বেঁচে থাকার লড়াই

ভক্তির ফুলে তাদের বেঁচে থাকার লড়াই

ময়মনসিংহ নগরের কে বি ইসমাইল রোডে পৌর কাঁচাবাজারের সামনের ফুটপাতজুড়ে ভোর থেকেই বসে ছোট্ট এক ফুলের হাট। কাগজ, কুলা আর ডালায় সাজানো জবা, গাঁদা, বেলিসহ নানা রঙের ফুল ও বেলপাতা দেখে মনে হতে পারে এগুলো শুধু পূজার অনুষঙ্গ। কিন্তু বিক্রেতাদের কাছে ভক্তির প্রতিটি ফুলেই জড়িয়ে আছে বেঁচে থাকার গল্প, সংসার চালিয়ে যাওয়ার ভরসা। 

রোববার (৭ জুন) সকাল ৮টায় পৌর কাঁচাবাজারে গিয়ে কথা হয় কয়েকজন ফুল বিক্রেতার সঙ্গে। তাদের প্রত্যেকের জীবনগল্প ভিন্ন হলেও সংগ্রামের জায়গাটা প্রায় একই।

পুলিশ লাইন এলাকার বাসিন্দা ৭০ বছর বয়সী ফুলবাসী প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এখানে ফুল বিক্রি করছেন। প্রতিদিন সকালে ফুল নিয়ে বসেন তিনি। পূজার জন্য ফুল কিনতে আসা ক্রেতারাই তার প্রধান ভরসা।

তিনি বলেন, চাহিদা ভালো থাকলে আয়ও ভালো হয়। সাধারণত ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা আয় হয়। ফুলের অনেকটাই নিজের গাছ থেকে আনি, তবে কিছু ফুল কিনেও আনতে হয়।

সংসারের দায়িত্ব এখন পুরোপুরি তার কাঁধে নেই। ছেলে-মেয়েরা আয়-রোজগার করেন। তারপরও কারও ওপর বোঝা হতে চান না বলেই বয়সের ভার উপেক্ষা করে প্রতিদিন বাজারে আসেন তিনি।

দক্ষিণ চরকালীবাড়ি এলাকার আরতি রানী বর্মণের (৬৫) স্বামী মারা গেছেন ১৬ বছর আগে। ছেলেমেয়েরা খোঁজ নেয় না। পাঁচ বছর ধরে এই বাজারে ব্যবসা করছেন। প্রতিদিন সকাল ৬টায় আসেন, সকাল ৯টায় বিক্রি শেষ করে চলে যান। রোববার সকাল ৮টা নাগাদ ২৫০ টাকার ফুল-অনুষঙ্গ বিক্রি করেছেন। নানা জায়গা থেকে বেলপাতা, তুলসীপাতা, দূর্বাঘাস সংগ্রহ করেন। নিজের বাড়িতে কয়েক ধরনের ফুলের গাছ লাগিয়ে রেখেছেন।

একই স্থানে বসে ফুল বিক্রি করছেন চর ঈশ্বরদিয়ার বাসিন্দা মমতা রানী (৪৫)। প্রায় সাত থেকে আট বছর ধরে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত আছেন তিনি। সংসারের বাড়তি আয়ের জন্যই মূলত ফুল বিক্রি শুরু করেছিলেন।

মমতা রানী জানান, তার বিক্রি করা ফুলের একটি অংশ নিজের বাগান থেকে আসে, বাকিগুলো কিনে আনতে হয়। প্রতিদিন খুব বেশি বিক্রি না হলেও পূজার সময় ভালো বিক্রি হয়।

তিনি বলেন, যা আয় হয় তার কিছু সংসারে দিই, কিছু নিজের জন্য রাখি। আমার নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়। সপ্তাহে প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকার ওষুধ লাগে।

জীবনের কঠিন বাস্তবতার আরেক নাম বুশতি বেগম (৬৫)। সাধারণত হিন্দুধর্মাবলম্বী নারীরা এখানে ফুল বিক্রি করলেও তিনি একমাত্র মুসলিম। দাপুনিয়া এলাকার এই নারী গত ১৬ বছর ধরে ফুল বিক্রি করছেন। পরিবারে তার দেখভাল করার মতো কেউ নেই।

ফুলের ঝুড়ির দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, আমার কেউ নাই। এই ফুল বিক্রি করেই চলি। যা আয় হয় তা দিয়েই খাওয়া-দাওয়া, সংসার সব চলে।

ডাল-ভাত জোগাড় করতে পারলেই সন্তুষ্ট সংকর বিন (৪২)। তিনিও দীর্ঘদিন ধরে ফুল বিক্রির সঙ্গে জড়িত। পরিবারে স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে। সংসারের প্রধান উপার্জনকারী তিনি নিজেই।

সংকর বিন জানান, ফুল বিক্রির পাশাপাশি গরু পালন করেন এবং দুধ বিক্রি করেন। নিজের গাছ থেকে ফুল সংগ্রহ করেন, আবার চাহিদা অনুযায়ী কিছু ফুল কিনেও আনেন।

তিনি বলেন, ডাল-ভাত খেয়ে থাকতে পারলেই হয়। সংসারের সব খরচ আমারই চালাতে হয়। ফুল বিক্রি আর দুধ বিক্রি মিলিয়েই কোনোভাবে চলি।

ফুল বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের অধিকাংশই ভোরে ঘুম থেকে উঠে ফুল সংগ্রহ করেন। নিজের বাগান থেকে পাওয়া ফুলের পাশাপাশি বাজার থেকে কিনেও আনতে হয় অনেককে। এরপর সকাল থেকেই শুরু হয় বিক্রির অপেক্ষা।

তাদের আয়ের বড় অংশ নির্ভর করে পূজা-পার্বণ ও বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠানের ওপর। দুর্গাপূজা, সরস্বতী পূজা কিংবা অন্যান্য উৎসবের সময়ে বিক্রি বাড়ে। তবে সাধারণ দিনে আয় সীমিতই থাকে। এর মধ্যে অবিক্রীত ফুল নষ্ট হয়ে গেলে লোকসানের মুখেও পড়তে হয়।

নগরের দূর্গাবাড়ি এলাকার বাসিন্দা টুম্পা বর্মন এসেছিলেন পূজার জন্য ফুল কিনতে। তিনি বলেন, গ্রামে পূজার জিনিসপত্রের কথা চিন্তা করতে হয় না। কিন্তু শহরে এসব পাওয়া দুষ্কর। তাই এই হাটই আমাদের ভরসা। কম টাকায় সব পাওয়া যায়।

নগরের মেছুয়া বাজার এলাকার বাসিন্দা শান্ত পাল বলেন, দুই বছর ধরে প্রতিদিনের ক্রেতা আমি। প্রতিদিন সকালে এসে পূজার অনুষঙ্গ নিয়ে যাই। এই হাটে পূজার জন্য ফুল-বেলপাতা পাওয়া না গেলে শহরের বাসায় বসে প্রতিদিন আমাদের পূজা করা হতো না।

ময়মনসিংহ নগরের কে বি ইসমাইল রোডে পৌর কাঁচাবাজারের সামনের এই ছোট্ট ফুলের বাজার শহরের অনেক মানুষের কাছে হয়তো সাধারণ একটি দৃশ্য। কিন্তু কাছ থেকে দেখলে বোঝা যায়, প্রতিটি ফুলের পেছনে জড়িয়ে আছে সংগ্রাম, আত্মসম্মান আর বেঁচে থাকার গল্প। পূজার জন্য বিক্রি হওয়া এসব ফুল শুধু ভক্তির প্রতীক নয়, কয়েকটি পরিবারের প্রতিদিনের অন্নসংস্থানেরও মাধ্যম।

সকালের ব্যস্ততা বাড়তে থাকলে একে একে ক্রেতারাও ভিড় করতে শুরু করেন। বিক্রেতাদের চোখে তখন নতুন আশার ঝিলিক দেখা দেয়। সেই আশাতেই প্রতিদিন ভোরে পৌর কাঁচাবাজারের এই ফুটপাতে ফুল হাতে ছুটে আসেন তারা।

সাখাওয়াত সুমন/আরকে