দীর্ঘ ২৭ দিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে কফিনবন্দি হয়ে দেশে ফিরল লেবাননে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় নিহত সাতক্ষীরার দুই প্রবাসী শফিকুল ইসলাম ও নাহিদুল ইসলামের মরদেহ।
রোববার (৭ জুন) তাদের মরদেহ সাতক্ষীরার নিজ নিজ গ্রামে পৌঁছালে সৃষ্টি হয় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। স্বজনদের বুকফাটা কান্না আর আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে চারপাশের পরিবেশ।
নিহতরা হলেন, সদর উপজেলার ভালুকা চাঁদপুর গ্রামের শফিকুল ইসলাম (৪০) এবং আশাশুনি উপজেলার কাদাকাটি গ্রামের মো. নাহিদুল ইসলাম (২০)। গত ১১ মে দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়েহ অঞ্চলের জিবদিন এলাকায় নিজ আবাসস্থলে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় তারা নিহত হন।
এর আগে, শনিবার গভীর রাতে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায় তাদের মরদেহ। পরে সেখান থেকে রাতেই নিজ নিজ গ্রামের উদ্দেশে রওনা দেওয়া হয়। মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর শেষবারের মতো প্রিয়জনকে দেখতে ভিড় করেন স্বজন ও এলাকাবাসী।
নিহত শফিকুল ইসলামের মেয়ে তামান্না আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমরা দুই বোন, আমাদের কোনো ভাই নেই। এখন আমরা কীভাবে চলব? আব্বু আমাদের ভালো রাখার জন্য বিদেশে গিয়েছিলেন। আমরা শুধু শেষবারের মতো আব্বুকে দেখতে চেয়েছিলাম।
স্ত্রী রুমা খাতুন বলেন, সংসার আর মেয়েদের ভবিষ্যতের জন্য ঋণ করে বিদেশে গিয়েছিলেন। এখন সব শেষ হয়ে গেল। আমি এখন কীভাবে বাঁচব?
নিহতের বাবা আফসার আলী বলেন, ঋণ করে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম। এখন সে লাশ হয়ে ফিরল। আমি শেষবার ছেলের মুখটা দেখতে চাই।
স্থানীয় বাসিন্দা অরবিন্দ বলেন, শফিকুলের পরিবার খুবই দরিদ্র। তার আয়ের ওপরই পুরো পরিবার চলত। এখন তারা সম্পূর্ণ অসহায়।
ধুলিহর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) প্যানেল চেয়ারম্যান ফারুক হোসেন মিঠু বলেন, এই পরিবারটির পাশে দাঁড়ানো এখন খুব জরুরি। সরকারের কাছে অনুরোধ, যেন দ্রুত তাদের জন্য সহায়তা নিশ্চিত করা হয়। অন্যদিকে, নাহিদুল ইসলামের পরিবারেও চলছে শোকের মাতম। স্বজনরা তার মরদেহ ফিরে পাওয়ায় শেষবারের মতো দেখতে ভিড় করছেন।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রবাসী কল্যাণ সেন্টার, খুলনার সহকারী পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. খালেদুর রহমান বলেন, নিহত প্রবাসীদের মরদেহ দেশে পৌঁছানোর পরপরই বিমানবন্দরে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দাফন-কাফন বাবদ ৩৫ হাজার টাকার চেক প্রদান করা হয়েছে।
তিনি বলেন, যেহেতু তারা বৈধভাবে বিদেশে গিয়েছিলেন, সেজন্য ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড থেকে ৩ লাখ টাকা এবং জীবন বীমা থেকে এককালীন ১০ লাখ টাকা পাবেন। অর্থাৎ ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি বা তার পর বৈধভাবে বিদেশে যাওয়া প্রবাসীদের জন্য মোট ১৩ লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তার বিধান রয়েছে। সেই অনুযায়ী সাতক্ষীরার নিহত দুই প্রবাসী শফিকুল ইসলাম, নাহিদুল ইসলাম এবং আহত অপর প্রবাসী শুভজিতের পরিবারও এই সহায়তা পাবে।
এই আর্থিক সহায়তা কিছুটা স্বস্তি দিলেও দুই পরিবারের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তা কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়। মাত্র দুই মাস আগে যারা জীবিকার আশায় হাসিমুখে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন, আজ তাদের নিথর দেহ ফিরে আসায় স্তব্ধ হয়ে পড়েছেন স্ত্রী, সন্তান ও স্বজনরা।
শফিকুল ও নাহিদুলের এই করুণ পরিণতিতে শুধু তাদের পরিবার নয়, গোটা সাতক্ষীরা জেলাজুড়েই নেমে এসেছে গভীর শোক ও বেদনার ছায়া।
ইব্রাহিম খলিল/এএমকে
