দুই সন্তানের জননী তানজিলা বানু (৩২)। তাকে কামড় দিয়েছে ‘লেজার ব্ল্যাক কমন’ সাপ। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পর সাপে কামড় দিয়েছে কি না নিশ্চিত হতে কয়েক ঘণ্টা সময় কেটেছে। ততক্ষণে রোগীর শারীরিক অবস্থা আরও সংকটাপন্ন হয়। চার ঘণ্টার মাথায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক তাকে দ্রুত আইসিইউতে পাঠিয়ে দেন।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) দুপুরে রামেক হাসপাতালের ৫৮ নম্বর সর্প দংশন ও টক্সিকোলজি ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে দুজন সাপে কামড়ের রোগী ভর্তি আছেন। তানজিলা বানু এবং জাফেলা খাতুন (৫০)। দুজনই আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। জাফেলা খাতুনের বাড়ি নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলায়। আর তানজিলা বানুর বাড়ি নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলায়।
তানজিলা বানুর ভাই জহুরুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, বানুকে গত ৩১ মে সকাল ৯টায় রামেক হাসপাতালে ভর্তি হন। তাকে ৩০ মে রাত ৪টার দিকে একটি লেজার ব্ল্যাক কমন সাপ কামড় দেয়। তার আত্মচিৎকার ও জ্বালাপোড়ায় মনে হয়েছে তাকে সাপে কামড় দিয়েছে। কিন্তু আমরা সেভাবে নিশ্চিত হতে পারিনি। তবে একটি সাপ গরুর গোয়ালে দেখে নিশ্চিত হয়েছি তাকে সাপে কামড় দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, প্রথমে তাকে মহাদেবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে তারা জানায়, চিকিৎসকরা রোগীকে দুই ঘণ্টা অবজারভেশনে রাখবেন। চিকিৎসকরা এও জানায় তাদের এখানে আইসিইউ সুবিধা নেই। এসময় রোগীর শরীর থেকে ইনজেকশনের সিরিঞ্জে রক্ত বের করে দেখে নিশ্চিত হয় তাকে সাপে কামড় দিয়েছে। পরে তার অবস্থার অবনতি হলে রামেক হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। হাসপাতালে ভর্তি করার পর তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। বর্তমানে সেখানে তার চিকিৎসা চলছে।
একই ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার জাফেলা খাতুন (৫০)। গত ৩ জুন দুপুর দেড়টার দিকে রামেক হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। তার স্বজনরা জানান, তাকে একটি কালাচ (কমন ক্রেইট) সাপ কামড় দেয়। বুধবার দুপুরে তাকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন।
ওয়ার্ডের নার্সরা জানান, সাপে কাটা রোগীদের স্বজনরা হাসপাতালে আনতে দেরি করেন। সাপে কাটার পরে সাধারণত তারা ওঝার কাছে নিয়ে যান, সেখানে না পারলে একদম শেষ পর্যায়ে তারা হাসপাতালে নিয়ে আসেন। আমরা রোগী ও তাদের স্বজনদের সবসময় বলে থাকি, সাপে কাটার পর দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে আসতে। তাহলে রোগীর মৃত্যুর ঝুঁকি কম থাকে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের দেওয়া তথ্যমতে, চলতি বছরের মার্চ থেকে মে- এই তিন মাসে সাপের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে মোট ৩৫২ জন ভর্তি হয়েছেন। এ সময় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন চারজন। হাসপাতালের তথ্যানুযায়ী, মার্চ মাসে সাপের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে ৮৭ জন ভর্তি হন। এ মাসে একজনের মৃত্যু হয়। এপ্রিল মাসে ভর্তি হন ১২২ জন, যার মধ্যে একজন মারা যান।
সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছে মে মাসে। এ মাসে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ মোট ১৪৩ জন সাপের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। তাদের মধ্যে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। গ্রীষ্ম ও বর্ষা মৌসুমের শুরুতে সাপের উপদ্রব বৃদ্ধি পাওয়ায় আক্রান্তের সংখ্যাও বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র শংকর কে বিশ্বাস বলেন, তিনমাসে সাপের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে রামেক হাসপাতালে ৩৫২ জন ভর্তি হয়েছেন। সাপে কাটা রোগীদের জন্য আলাদা পৃথক ওয়ার্ল্ড রয়েছে, সেই ওয়ার্ডে তাদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে। এসময় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন চারজন।
সাপ নিয়ে মানুষের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করে। বোধয় সাপের কামড় দিলে মানুষ মারা যায়; তবে সব সাপের কামড়েই মানুষের মৃত্যু হয় না। কিন্তু সব সাপই মানুষ পিটিয়ে মেরে ফেলে নিরাপত্তার খাতিরে। পিটিয়ে মারা সাপগুলো হত্যার শিকার বলছেন, সাপ ও সরীসৃপ গবেষক বোরহান বিশ্বাস। তার সঙ্গে সাপের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা হলে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, রাজশাহী অঞ্চলে প্রায় ৫০ প্রজাতির সাপের মধ্যে মাত্র চারটি বিষধর। সচেতনতার অভাবে অনেক উপকারী ও দুর্লভ প্রজাতির সাপ আজ বিলুপ্তির পথে। বিভাগের নওগাঁ ও জেলার গোদাগাড়ী অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি সাপ নিধনের ঘটনা ঘটে। এরফলে লেসার ব্ল্যাক ক্রেইট' বা ‘কৃষ্ণ কালচ’ সাপ রাজশাহী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তিন বছর ধরে এই সাপ রাজশাহীতে দেখা যায় না।
রাজশাহী অঞ্চলে সাপ নিয়ে সাপ ও সরীসৃপ গবেষক বোরহান বিশ্বাস ঢাকা পোস্টকে বলেন, রাজশাহী বিভাগের সাপের বর্তমান অবস্থা ও অস্তিত্ব রক্ষার চ্যালেঞ্জিং। গরম ও বর্ষা মৌসুমে খাবারের সন্ধানে এবং প্রজননের কারণে সাপের বিচরণ ও মানুষের সাথে সংঘাত বৃদ্ধি পায়, যার ফলে এই অঞ্চলের নওগাঁ ও গোদাগাড়ীর মতো এলাকায় প্রচুর সাপ মারা পড়ছে। সাপেদের এই গণহারে হত্যার পেছনে মূলত জনসাধারণের ভীতি ও অসচেতনতা দায়ী, যা প্রাকৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রজাতিকে বিলুপ্তির পথে ঠেলে দিচ্ছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে এই অঞ্চলে প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ প্রজাতির সাপ থাকলেও মাত্র চারটি প্রজাতি বিষধর, অথচ ভয়ের কারণে নির্বিষ সাপগুলোও মানুষের হাতে প্রাণ হারাচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বোরহান বিশ্বাস সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, পর্যাপ্ত উদ্ধারকর্মী নিয়োগ এবং ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। প্রকৃতির ভারসাম্য ও ইকোসিস্টেম রক্ষায় সাপ নিধন বন্ধ করে সংরক্ষণ প্রক্রিয়া জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।
সাপের আধিক্য ও হত্যার কারণ
বোরহান বিশ্বাসের ধারণা মতে, এই অঞ্চলে প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০টি সাপ মেরে ফেলা হয়। গরম এবং বর্ষা মৌসুমে সাপ বেশি সক্রিয় হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি আবহাওয়া, খাদ্যের প্রয়োজন এবং প্রজননকে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, এই সময়টায় সাপ একটিভ থাকে, সাধারণত তারা গর্ত থেকে বের হতে চায় না। যখন তারা এভাবে বিভিন্ন কারণে বের হয়ে আসে তখনই হচ্ছে মানুষের সাথে একটা কনফ্লিক্ট হয়। তখন মানুষ পিটায়, হত্যা করে অথবা সাপের কামড়ে মানুষ আক্রান্ত হয়। শীতের কয়েক মাস তারা না খেয়ে থাকে বলে এই সময়ে খাবারের সন্ধানে এবং ডিম পাড়ার উপযুক্ত গর্ত খুঁজতে গিয়ে তাদের মুভমেন্ট বেড়ে যায়, যার ফলে তারা মানুষের নজরে পড়ে এবং নিধনের শিকার হয়।
সাপ হত্যার পরিসংখ্যান ও অঞ্চল
রাজশাহী বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সাপ মারা পড়ে নওগাঁয়। এরপর পর্যায়ক্রমে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও নাটোরে সাপ হত্যার ঘটনা বেশি ঘটে। তালিকার শেষের দিকে রয়েছে রাজশাহী জেলা। তবে, রাজশাহী জেলার উপজেলাগুলোর মধ্যে গোদাগাড়ীতে সবচেয়ে বেশি সাপ হত্যা করা হয়। এরপর যথাক্রমে তানোর, বাঘা এবং পুঠিয়া অঞ্চলে সাপ হত্যার প্রবণতা বেশি। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, যদি কেউ ১০টা সাপ পায় তাহলে ৮টাই হত্যা করার চেষ্টা করে। আর মাত্র ২ শতাংশ উদ্ধার কল আসে।
উদ্ধার কাজের সীমাবদ্ধতা
তিনি জানান, যে প্রতিদিন রেসকিউ কল আসলেও সব কল তারা কাভার করতে পারেন না। তাদের কাছে আসা কলের মাত্র ৫০ শতাংশ তারা রেসপন্স করতে পারেন। এর প্রধান কারণ হিসেবে তিনি দূরত্ব, একই সময়ে একাধিক কল আসা এবং রেসকিউয়ারদের অপ্রতুলতার কথা উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, এই কাজটা তো সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাশ্রমে করতে হয়। আমাদের আছে ম্যাক্সিমাম স্টুডেন্ট, স্টুডেন্টের পক্ষে এটা আসলে এফোর্ট করা কঠিন হয়ে পড়ে।
পরিবেশগত প্রভাব ও বিলুপ্তি
রাজশাহী বিভাগে প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ প্রজাতির সাপ পাওয়া যায়, যার মধ্যে মাত্র চারটি প্রজাতি বিষধর। বোরহান বিশ্বাস সতর্ক করে বলেন, এটা চলতে থাকলে সাপ আমাদের দেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এটা কিন্তু মারাত্মক ক্ষতি করবে, আমাদের প্রকৃতি পরিবেশ প্লাস হচ্ছে আমাদের যে ইকোসিস্টেম। তিনি উদাহরণ হিসেবে 'লেসার ব্ল্যাক ক্রেইট' বা 'কৃষ্ণ কালচ' সাপ আগে রাজশাহীতে দেখা যেত, কিন্তু গত দুই-তিন বছর ধরে আর একদমই দেখা যাচ্ছে না।
সমাধানের উপায়
সাপ ও পরিবেশ রক্ষায় তিনি তিনটি মূল সমাধানের কথা বলেছেন এরমধ্যে জনসচেতনতা একটি। এটি রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রচার করা উচিত এবং মানুষের মন থেকে সাপের ভীতি দূর করা প্রয়োজন। প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী দরকার। উপজেলাভিত্তিক প্রশিক্ষিত রেসকিউয়ার তৈরি করা দরকার। সরঞ্জাম সরবরাহ করা। উদ্ধারকারীদের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বা টুলকিটস প্রদান করা এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করা।
এসএইচএ
