বিজ্ঞাপন

বগুড়ায় এক কিলোমিটারে ৪২ ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টার, রয়েছে নানা অভিযোগ

বগুড়ায় এক কিলোমিটারে ৪২ ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টার, রয়েছে নানা অভিযোগ

বগুড়া শহরের অলিগলিতে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে গড়ে উঠেছে অসংখ্য বেসরকারি ক্লিনিক, হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। চিকিৎসাসেবার নামে এসব প্রতিষ্ঠানে চলছে অনিয়ম, প্রতারণা ও গলাকাটা বাণিজ্য—এমন অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। প্রশাসনের চোখের সামনেই বছরের পর বছর ধরে মানহীন এসব প্রতিষ্ঠান রমরমা ব্যবসা চালিয়ে গেলেও কার্যকর তদারকির অভাবে চরম ঝুঁকিতে পড়েছেন সাধারণ রোগীরা। এতে প্রায়ই ঘটছে মৃত্যুর ঘটনা।

সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়া কোনো ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিচালনা করা সম্পূর্ণ অবৈধ। একইসঙ্গে অবকাঠামো, জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জামের নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করা বাধ্যতামূলক। তবে বাস্তবে তা উপেক্ষিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বগুড়া শহরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথা থেকে কলোনি মোড় পর্যন্ত শেরপুর, বগুড়া সড়কের দুই পাশে প্রায় আড়াই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে গড়ে উঠেছে প্রায় ৭০টি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এর মধ্যে কানুছগাড়ী মোড় থেকে ঠনঠনিয়া বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত মাত্র এক কিলোমিটার সড়কের দুই পাশেই রয়েছে ৪২টি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার।

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বগুড়ায় মোট ৪৮৮টি ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, হসপিটাল ও ব্লাড ব্যাংকের অনুমোদন রয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ২৪৮টি, ধুনটে ২৭টি, গাবতলীতে ৪টি, আদমদিঘীতে ১৬টি, কাহালুতে ৬টি, সারিয়াকান্দিতে ৮টি, শাজাহানপুরে ১৫টি, শেরপুরে ৪৮টি, সোনাতলায় ২৬টি, শিবগঞ্জে ৪০টি, নন্দীগ্রামে ৮টি এবং দুপচাঁচিয়ায় ৪২টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তবে এর বাইরেও অসংখ্য লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠান সক্রিয় রয়েছে।

শহরের কয়েকটি ক্লিনিককে ঘিরে একাধিক মৃত্যুর অভিযোগও উঠেছে। পিটিআই মোড়ে অবস্থিত আলিফ জেনারেল হাসপাতালে সিয়াম শেখ (১৮) নামে এক এসএসসি পরীক্ষার্থীর মৃত্যুর অভিযোগ পাওয়া যায়। স্বজনদের দাবি, অপারেশনের সময় অ্যানেস্থেসিয়া প্রয়োগে অনিয়ম হয়েছিল।

জলেশ্বরীতলার এনাম ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ২০২৫ সালের ২ মার্চ রোকসানা নামে এক গর্ভবতী নারী ও তার গর্ভের সন্তানের মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে।

এ ছাড়া, ২০২৬ সালের ২৯ মার্চ সোনার দেশ ক্লিনিকে উজ্জ্বল হোসেন (৩০) এবং ২০ ফেব্রুয়ারি প্রভাতী ডায়াগনস্টিক সেন্টারে জবা বালা রানী (৩০) নামে এক গর্ভবতী নারীর মৃত্যুর অভিযোগে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।

গত ৩০ মে শহরের খান্দার এলাকার সুস্বাস্থ্য নামের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অহনা নামের এক রোগীর মৃত্যু হয়। নিহত বগুড়া শহরের ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের গাজীপালশা চৌকিরপাড় এলাকার বাসিন্দা।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, সন্তান প্রসবের জন্য অহনাকে শহরের খান্দার এলাকার সুস্বাস্থ্য নামের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। সেখানে সিজারের মাধ্যমে তিনি একটি সন্তানের জন্ম দেন। তবে অপারেশনের পরপরই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। একপর্যায়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

বগুড়া শহরের কানুছগাড়ী এলাকায় অবস্থিত সৃষ্টি জেনারেল হাসপাতালে মাত্র আড়াই মাস আগে পৃথিবীর আলো দেখেছিল ছোট্ট আবদুল্লাহ আল আয়ান। মায়ের বুকের উষ্ণতা আর স্বজনদের আদরে বড় হওয়ার কথা ছিল তার। সিঙ্গাপুরপ্রবাসী বাবা আবদুল আহাদ সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন বুনছিলেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন থেমে যায় হাসপাতালের বেডেই। ৩১ মে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বগুড়ার একটি বেসরকারি হাসপাতালে মৃত্যু হয় আবদুল্লাহর। স্বজনদের অভিযোগ, সময়মতো চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ না দেওয়ার কারণেই প্রাণ হারিয়েছে শিশুটি।

নিহত শিশুর খালা পুতুল অভিযোগ করে বলেন, রাতে ডাক্তার স্যালাইন ও ইনজেকশন লিখে দিয়েছিলেন। আমরা বারবার নার্সদের বিষয়টি বলেছি। কিন্তু তারা সকালে দেওয়ার কথা বলেন। পরে আর সেগুলো দেওয়া হয়নি। সকালে দেখি আমার ভাগনে আর বেঁচে নেই।

সবশেষ গত সোমবার (২ জুন) রাত আনুমানিক ১০টার দিকে শহরের চকযাদু রোডে অবস্থিত সারা ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ভুল চিকিৎসায় মোছা. শাপলা আক্তার (২৮) নামে এক রোগীর মৃত্যু হয়।

স্বজনদের অভিযোগ, মোশাররফ হোসেন নামের এক পল্লী চিকিৎসক দালালের মাধ্যমে দুপুর ১টার দিকে টনসিল অপারেশনের জন্য শাপলাকে সারা হাসপাতালে নিয়ে আসেন। পরে আনুমানিক সাড়ে ৮টার দিকে তাকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয়। অপারেশনের জন্য অজ্ঞান করার পর আর জ্ঞান ফেরেনি। রাত ১০টার দিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তার মরদেহ বের করে দেয়। স্বজনদের দাবি, এ সময়ের মধ্যে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নানা ধরনের চেষ্টা-তদবির করছিল। তাদের অভিযোগ, ভুল ইনজেকশন প্রয়োগ করে তাকে অজ্ঞান করা হয়েছিল। পরে রাত আনুমানিক ১০টার দিকে শাপলার মৃত্যু হয়।

যেসব হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে অনেকেই গণমাধ্যমকে এড়িয়ে যান।

শাপলা আক্তারের মৃত্যুর ঘটনায় পরদিন মঙ্গলবার সকালে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে বগুড়া সদর থানায় মামলা দায়ের করেন ভুক্তভোগীর স্বজনরা। বিষয়টি নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে চাইলে সাংবাদিকের উপস্থিতি টের পেয়ে কর্তৃপক্ষের লোকজন সেখান থেকে চলে যান।

শহরের স্টেডিয়াম রোডে অবস্থিত সুস্বাস্থ্য ক্লিনিকে অহনা নামে এক প্রসূতি নারীর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে চলে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে বুধবার (৩ জুন) দুপুরে বগুড়ার সিভিল সার্জন ডা. খোরশেদ আলম ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করে প্রতিষ্ঠানটিতে পরিবেশগত ও ব্যবস্থাপনাগত নানা অনিয়ম দেখতে পান। এ সময় তিনি ক্লিনিকটি ১৫ দিনের জন্য বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন।

এ বিষয়ে সুস্বাস্থ্য ক্লিনিকের কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে ক্লিনিকে গিয়ে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। এ ছাড়া, ক্লিনিকের মালিক ডা. মো. আলিমুল রেজার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

এর আগে, মঙ্গলবার বিকেলে জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আজাদ হোসেন ঝটিকা অভিযান চালিয়ে তিনটি ক্লিনিক পরিদর্শন করেন। অভিযানে বিভিন্ন অনিয়ম ও লাইসেন্সের মেয়াদ না থাকায় দুটি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৮০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একইসঙ্গে ত্রুটি সংশোধনের জন্য তাদের দুই মাস সময় বেঁধে দেওয়া হয়।

এর মধ্যে সার্ক জেনারেল হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে ২০ হাজার টাকা এবং রুপালী ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে ৬০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। তবে রুপালী ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গত বছরও লাইসেন্সের মেয়াদ উত্তীর্ণ ও স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘনের দায়ে ৮৫ হাজার টাকা জরিমানা ও ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।

পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান দুটিকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব ত্রুটি সংশোধন করে নিয়ম অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে এ বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি।

এখানেই শেষ নয়, অভিযোগ রয়েছে শহরের সৃষ্টি জেনারেল হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় দুই মাস বয়সী আয়ান নামে এক শিশুর মৃত্যুর। মৃত্যুর পর স্বজনরা হাসপাতালের সামনে বিক্ষোভ করেন। এ বিষয়ে সৃষ্টি জেনারেল হসপিটালের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে মো. রকি মিয়া নামে এক স্টাফ সাংবাদিককে টাকা দিয়ে ম্যানেজের চেষ্টা করেন এবং সংবাদটি প্রকাশ না করতে অনুরোধ জানান। এ সময় তিনি বলেন, আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছেন, এতে কী করার আছে? তবে শিশুটির মৃত্যুর কারণ ও হাসপাতালের ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য দিতে রাজি হননি তিনি।

অভিযান চালানো হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা সাময়িক বলে অভিযোগ রয়েছে। জরিমানা বা সিলগালার কিছুদিন পর আবারও চালু হয়ে যায় অনেক প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে গত বছর সদরের কানুছগাড়ীর মা ফাতেমা ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড ক্লিনিককে অনুমোদন ছাড়া কার্যক্রম পরিচালনার দায়ে ২ লাখ টাকা জরিমানা ও সিলগালা করা হয়। ঠনঠনিয়ার সেবা ব্লাড ব্যাংক অনুমোদন ছাড়া রক্ত সংরক্ষণ ও মেয়াদোত্তীর্ণ রক্ত রাখার দায়ে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ও সিলগালা করা হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নীতিমালা অনুযায়ী, একটি ছোট বা মাঝারি ক্লিনিক পরিচালনার জন্য ন্যূনতম এক থেকে তিনজন নিবন্ধিত এমবিবিএস চিকিৎসক, দুই থেকে ছয়জন প্রশিক্ষিত নার্স, এক থেকে দুইজন ল্যাব টেকনোলজিস্ট, একজন ফার্মাসিস্ট এবং দুই থেকে চারজন সহায়ক কর্মী থাকার কথা। একইভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অন্তত একজন প্যাথলজিস্ট বা চিকিৎসক, দুই থেকে তিনজন ল্যাব টেকনোলজিস্ট, একজন এক্স-রে টেকনিশিয়ান এবং প্রয়োজনীয় সহকারী কর্মী থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু অধিকাংশ হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে এমন অভিজ্ঞ লোকজন চোখে পড়ে না।

ঢাকা পোস্টের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনেক ক্লিনিকে কোনো নিবন্ধিত এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়মিত উপস্থিত থাকেন না। কাগজে কলমে নাম থাকলেও বাস্তবে ডিপ্লোমাধারী বা অপ্রশিক্ষিত ব্যক্তিরাই চিকিৎসা দিচ্ছেন। নার্সের পরিবর্তে স্বল্প প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এইড নার্স দিয়ে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এ ছাড়া, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া অপারেশন থিয়েটারে অ্যানেস্থেসিয়া ও নিয়ন্ত্রিত ওষুধ ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে, যা রোগীর জীবনের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করে বলেন, একই পরীক্ষার ভিন্ন ভিন্ন রিপোর্ট দেওয়া হয় এবং দালালের মাধ্যমে রোগী এনে অপ্রয়োজনীয় টেস্ট করিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়।

বগুড়ার এক ডা. মো. আজিজুল হাকিম বাপ্পা, এমবিবিএস (বিসিএস) ঢাকা পোস্টকে বলেন, বগুড়া শহরের অলিগলিতে ব্যাঙের ছাতার মতো অসংখ্য ক্লিনিক ও হাসপাতাল গড়ে উঠেছে। এগুলোর অধিকাংশেরই মান নিয়ন্ত্রণের কোনো বালাই নেই। এসব হাসপাতালে ডিউটি ডাক্তার হিসেবে কোনো এমবিবিএস চিকিৎসক থাকেন না। নথিপত্রে বড় ডাক্তারদের নাম থাকলেও বাস্তবে তাদের পাওয়া যায় না। মূলত ডিএমএস বা ম্যাটস থেকে পাস করা ডিপ্লোমাধারী নন-মেডিকেল ব্যক্তিদের দিয়ে চিকিৎসা কার্যক্রম চালানো হয়।

তিন বলেন, নার্সদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। ডিপ্লোমা বা বিএসসি নার্স সচরাচর পাওয়া যায় না। রোস্টারে নাম থাকলেও ডিউটি করেন এইড নার্সরা, যাদের কোনো স্বীকৃত ডিগ্রি নেই। তারা কেবল স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং তাদের নার্সের ইউনিফর্ম পরিয়ে ডিউটি করানো হয়।

তিনি আরও বলেন, জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে নিয়মিত ঝটিকা অভিযান বা শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করা প্রয়োজন। হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর লাইসেন্স নবায়নের বিষয়টি কঠোরভাবে তদারকি করতে হবে। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আরও তৎপর হলে এই অনিয়মগুলো রুখে দেওয়া সম্ভব।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বগুড়ার অনেক ক্লিনিকের ওটিতে অপারেশন পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় নারকোটিকস বা মাদকদ্রব্য ব্যবহারের কোনো লাইসেন্স নেই। নিয়মবহির্ভূতভাবে এসব হাসপাতালে অপারেশনের কাজে অ্যানেস্থেসিয়া বা অন্যান্য ড্রাগ ব্যবহার করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ বেসরকারি ক্লিনিক মালিক সমিতির বগুড়া জেলার সাধারণ সম্পাদক আরভিল আহমেদ খোকন ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমরা বারবার সিভিল সার্জন অফিসে যাচ্ছি এবং সিভিল সার্জনকে বিষয়টি জানাচ্ছি। তারা লোকবলের দোহাই দিয়ে কাজগুলো করছে না। এ বিষয়ে গণমাধ্যমেরও ভূমিকা পালন করা দরকার। আমরা বারবার মিটিং করেছি। যেগুলোর লাইসেন্স নেই, সেগুলো বন্ধ করে দেওয়া উচিত। আবার যেগুলো মানহীন, সেগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে সিলগালা করা দরকার। কিন্তু দেখা যায়, প্রশাসন ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে চলে আসে, অথচ প্রতিষ্ঠানটি আবারও চালু থাকে।

তিনি আরও বলেন, অবৈধভাবে ব্যবসা করে তারা সেই জরিমানার টাকা তুলে ফেলে। এ সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন। আমরা যারা মানসম্মতভাবে ক্লিনিক পরিচালনা করতে চাই, তারাও এসব প্রতিষ্ঠানের কারণে মান ধরে রাখতে পারছি না।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) বগুড়া জেলা শাখার সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ ফজলে রাব্বি ডলার ঢাকা পোস্টকে বলেন, মেডিকেল বর্জ্য সংগ্রহ ও সঠিকভাবে ডাম্পিংয়ের উদ্যোগ ক্লিনিক মালিকদের মধ্যে তেমন দেখা যায় না। সরকার নির্ধারিত ফি ও নিয়ম অনুসরণ না করার কারণে অনেকেই প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র নেয় না। ফলে এসব বর্জ্য পরিবেশের পাশাপাশি নদী-নালা ও জীববৈচিত্র্যের জন্যও বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অনেক সময় এই বর্জ্য পৌরসভার ডাস্টবিনে ফেলা হয়, যেখানে পথশিশুরা ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন জিনিস কুড়াতে গিয়ে আহত হচ্ছে এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে।

তিনি আরও বলেন, জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের কিছু অনিয়মও রয়েছে। অনেক ক্লিনিক লাইসেন্স পাওয়ার আগেই আবেদন করা আছে, এমন অজুহাতে কার্যক্রম শুরু করে দেয়। আবার অনেক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হলেও তা নবায়ন করা হয় না। এতে স্বাস্থ্যখাতে বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে।

অনিবন্ধিত কিছু ক্লিনিকে গর্ভপাতসহ নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক। পাশাপাশি ক্লিনিক মালিক সমিতি ও কিছু অসাধু কর্মচারীর মধ্যে একটি সিন্ডিকেট কাজ করছে বলে তিনি দাবি করেন। এর ফলে অদক্ষ লোকজন দিয়ে সিজারসহ গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

তিনি বলেন, এই সমস্যাগুলো সমাধানে শুধু জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের ভূমিকা যথেষ্ট নয়। পরিবেশ, স্বাস্থ্যসেবা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উন্নতি আনতে হলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। কার্যকর মনিটরিং নিশ্চিত করা গেলে নাগরিকরা নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা পাবে এবং পরিবেশগত ঝুঁকিও কমবে।

বগুড়ার সিভিল সার্জন ডা. খোরশেদ আলম ঢাকা পোস্টকে বলেন, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে অনেক ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার নিবন্ধনের বাইরে পরিচালিত হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোর তথ্য স্বাস্থ্য বিভাগের নথিভুক্ত তালিকায় থাকে না। বগুড়ায় বর্তমানে নিবন্ধিত ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা ২১৫টি হলেও বাস্তবে এর চেয়ে বেশি প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম চালাচ্ছে।

তিনি বলেন, বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা ও অলিগলিতে গড়ে ওঠা অনেক ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার স্বাস্থ্য বিভাগের অগোচরেই পরিচালিত হয়। তবে কোনো অবৈধ প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেলে সিভিল সার্জন কার্যালয় দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

সিভিল সার্জনের ভাষ্য, নিয়মিত তদারকির অংশ হিসেবে মেডিকেল অফিসার ও ডেপুটি সিভিল সার্জনরা বিভিন্ন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনে কোনো অবৈধ প্রতিষ্ঠান শনাক্ত হলে প্রশাসনের সহযোগিতায় তা বন্ধ করে দেওয়া হয়।

তিনি আরও বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় লাইসেন্স, নারকোটিকস-সংক্রান্ত অনুমোদন, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রসহ অন্যান্য কাগজপত্রে ঘাটতি থাকলে প্রথমে সতর্ক করা হয়। তাদের দুই সপ্তাহ থেকে এক মাস পর্যন্ত সময় দেওয়া হয় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও শর্ত পূরণের জন্য। এ সময়ের মধ্যে সবকিছু ঠিকঠাক করতে পারলে প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়। অন্যথায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের জন্য অধিদপ্তরে সুপারিশ পাঠানো হয় এবং তাদের কার্যক্রম বন্ধ রাখার ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

তবে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, চিকিৎসাসেবার মতো স্পর্শকাতর খাতে এমন অনিয়ম ও প্রতারণা শুধু আইন ভঙ্গ নয়, মানবতার বিরুদ্ধেও অপরাধ। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপই এই অনিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতি থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে পারে।

এএমকে