বিজ্ঞাপন

দাদির উপহারের ভেড়া থেকে সফল খামারি আশিক

দাদির উপহারের ভেড়া থেকে সফল খামারি আশিক

আশিক চৌধুরী (২২) যখন চতুর্থ কিংবা পঞ্চম শ্রেণিতে পড়তেন, তখন দাদি তাকে একটি ভেড়া উপহার দিয়েছিলেন। সেসময় সেটি ছিল শুধু একটি সাধারণ উপহার। কিন্তু সেই ভেড়াই হয়ে ওঠে তার স্বপ্নের সিঁড়ি। সময়ের সঙ্গে ভেড়াটি বাচ্চা দেয়। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে সংখ্যা। বাড়তে থাকে আশিকের আগ্রহ ও আত্মবিশ্বাসও। প্রায় এক যুগ ধরে পরিচর্যা, ধৈর্য ও পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি গড়ে তুলেছেন ভেড়ার বিশাল পাল।

আশিক এবার ঈদুল আজহার আগে ২৬টি ভেড়া বিক্রি করে আয় করেছেন ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা। এমন সাফল্যের মাধ্যমে তরুণ উদ্যোক্তাদের মাঝে এক অনুপ্রেরণামূলক উদাহরণ তৈরি করেছেন জয়পুরহাটের আশিক চৌধুরী। 

২০২২ ও ২০২৪ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করেছেন আশিক। এখন পড়াশোনা বন্ধ রেখে পুরো সময় দিচ্ছেন ভেড়া পালনে। তবে সুযোগ হলে পড়াশোনা আবারও শুরু করতে চান এই মেধাবী তরুণ।

জেলার পাঁচবিবি উপজেলার কুসুম্বা ইউনিয়নের হরেন্দা চৌধুরীপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রহিম চৌধুরীর ছেলে আশিক। সফল খামারির পাশাপাশি তিনি মেধাবী শিক্ষার্থীও। তিনি ২০২২ সালে হাকিমপুর কৈজুরী বেগম নুরজাহান রিয়াজ (বি.এন.আর) উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি পাস করেন। ২০২৪ সালে ঢাকার ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়ে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। বর্তমানে তিনি পড়াশোনা ছেড়ে পুরো সময় দিচ্ছেন ভেড়া পালনে। তবে সুযোগ হলে আবারও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা রয়েছে তার।

গত ৩ জুন (বুধবার) দুপুরে চানপাড়া-পাঁচবিবি সড়কে হরেন্দা এলাকায় দেখা যায় আশিককে। সড়কের পাশে বিশাল ভেড়ার পাল চড়াচ্ছিলেন তিনি। সেখানেই হাসিমুখে ঢাকা পোস্টকে শোনালেন নিজের সংগ্রাম আর সাফল্যের গল্প।

আশিক চৌধুরী বলেন, আমি যখন চতুর্থ কিংবা পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ি, তখন আমার দাদি আমাকে একটি ভেড়া উপহার দেন। সেই ভেড়াটির দেখাশোনা করতেন আমার মা। আমিও মায়ের সাথে থাকতাম। পরে ভেড়াটি বাচ্চা দেয়। ধীরে ধীরে সংখ্যা বাড়তে থাকে। কখনো হাল ছাড়িনি। নিয়মিত যত্ন নিয়েছি, রোগবালাই থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছি। আজ সেই একটি ভেড়া থেকে অনেকগুলো ভেড়ার পাল গড়ে উঠেছে।

তিনি বলেন, কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে ভেড়ার চাহিদা বেড়ে যায়। এ বছর ঈদের আগে ৯৬টি ভেড়া ছিল। ২৬টি ভেড়া ২ লাখ ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছি। এখন ছোট-বড় মিলে ৭০টি ভেড়া রয়েছে। মা অসুস্থ হওয়ার কারণে আমি পুরোপুরি এখন ভেড়া পালনে সময় দিচ্ছি। ভবিষ্যতে ভেড়ার খামার আরও সম্প্রসারণের পাশাপাশি গরুর খামার গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

আশিকের মা রেহেনা খাতুন বলেন, শুরুর দিকে এটা ছিল শখের মতো। কিন্তু ধীরে ধীরে ভেড়ার সংখ্যা বাড়তে থাকে। ছোটবেলা থেকেই আশিক পশুপাখি খুব ভালোবাসে। সে নিজের মতো করে ভেড়াগুলোর যত্ন নেয়। তার এই নিষ্ঠা ও পরিশ্রমের ফল এখন সবাই দেখতে পাচ্ছে। আমার ছেলের আরও বড় খামার করার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারি সহযোগিতা পেলে সেটি আরও ভালো হতো।

স্থানীয় বাসিন্দা রেজাউল করিম বলেন, পরিকল্পিতভাবে পশুপালন করেও যে সফল হওয়া যায়, আশিক তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। দাদির উপহার পাওয়া একটি ভেড়া থেকে আজ প্রায় শতাধিক ভেড়ার মালিক হয়েছেন। তার এই সংগ্রাম তরুণদের আত্মবিশ্বাসী হতে ও উদ্যোক্তা হয়ে উঠতে উদ্বুদ্ধ করবে।

হাকিমপুর কৈজুরী বেগম নুরজাহান রিয়াজ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাইদুর রহমান বলেন, আশিক চৌধুরী অত্যন্ত ভদ্র ও ভালো ছেলে। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছিল। তার পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো না। এখন পুরোপুরি খামারে সময় দিচ্ছে। তবে এই মেধাবী ছেলে দমে যায়নি, ভেড়া পালন করে এখন একজন সফল খামারি হয়েছে। বর্তমানে এই ভেড়া পালনের আয় দিয়েই ওর পরিবার চলছে।

পাঁচবিবি উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. হাসান আলী ঢাকা পোস্টকে বলেন, আশিক চৌধুরীর একটি ভেড়ার খামার রয়েছে। তিনি একজন সফল খামারি। আমরা নিয়মিত তাকে কারিগরি সহযোগিতা করি। বর্তমানে আর্থিক কোন সহযোগিতা করার সুযোগ নেই, যদি আগামীতে সরকারিভাবে সুযোগ আসে। তাহলে আমরা তাকে অর্থিক সহযোগিতাও করবো।

আরএআর