এক সময় বাপ-দাদার প্রায় ৫০ বিঘা জমির মালিক ছিলেন আব্দুল মানিক। সেই জমিতেই ছিল পরিবারের স্বপ্ন, নিরাপত্তা আর ভবিষ্যৎ। কিন্তু যমুনার অব্যাহত ভাঙনে একে একে সব হারিয়ে এখন তার পরিবারের হাতে রয়েছে মাত্র কয়েক শতাংশ জমি। সেই সামান্য জায়গার ওপর নির্ভর করেই কোনোভাবে টিকে আছে ১০ সদস্যের সংসার।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) যমুনা পাড়ের জেলা সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার চরকানালিয়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, যমুনার ভাঙন নিয়ে চরম আতঙ্কে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে নিজের জীবনের গল্প বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন আব্দুল মানিক। তবে এসব এলাকায় কাজ করার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
তিনি বলেন, বারবার ঘর করেছি। কিন্তু নদী আবার সব নিয়ে গেছে। আমরা আর কিচ্ছু চাই না। আমরা শুধু চাই একটা স্থায়ী বেড়িবাঁধ।
এক সময় যে পরিবার বিস্তীর্ণ জমির মালিক ছিল, আজ তারা নিজেদের ভিটেমাটি রক্ষার লড়াইয়ে ব্যস্ত। বারবার ঘর নির্মাণ করেও টিকিয়ে রাখা যায়নি। যমুনার ভাঙন প্রতিবারই তাদের নতুন করে নিঃস্ব করেছে।
আব্দুল মানিকের মতো একই শঙ্কায় দিন কাটছে চৌহালীর আরও হাজারো মানুষের। নদীভাঙনের কারণে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি ও বসতভিটা হারিয়ে অনিশ্চয়তায় জীবনযাপন করছেন তারা।
চর সলিমাবাদের বাসিন্দা বিলকিস বলেন, আমরা কিছুই চাই না। শুধু একটা স্থায়ী বেড়িবাঁধ চাই। আমরা কাজ করে খেতে পারি, কিন্তু নদীর ভাঙন থামাতে পারি না।
একই এলাকার ৬০ বছর বয়সী সাবিয়া বেগমের জীবনেও ভাঙনের গভীর ক্ষত রয়েছে। কয়েক বছর আগে যমুনা গিলে নিয়েছে তার বসতভিটা। স্বামী ও সন্তান হারানোর বেদনার সঙ্গে এখন যোগ হয়েছে আশ্রয়হীনতার কষ্ট। নদীর দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, কি আর বলব। আমাদের গ্রাম, বাড়িঘর, জমিজমা সব নদী গিলে খাচ্ছে। রাতে ঘুমাতে পারি না, কখন মনে হয় নদী ভাঙনের চিন্তায়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সম্প্রতি চৌহালীর বাঘুটিয়া ইউনিয়নের সম্ভুদিয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন ঘাট এলাকায় একসঙ্গে প্রায় ৩০০ মিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। খাসপুখুরিয়া ও বাঘুটিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন অংশ এখন চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
বাঘুটিয়া ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য বাবুল সরকার বলেন, চর বিনানই নদীর পশ্চিম পাশে চার জায়গায় প্রায় ১শ ফুট এলাকার জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। পার্শ্ববর্তী চর সলিমাবাদ গ্রামের মোল্লা সাইফুল ইসলামের বাড়িটি চোখের পলকেই যমুনায় চলে গেছে।
২০২২ সালের জনশুমারি তথ্য অনুযায়ী, চৌহালী উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে জনসংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার। তবে স্থানীয়দের দাবি, নদীভাঙনের কারণে বহু মানুষ ইতোমধ্যে নাটোর, টাঙ্গাইল, পাবনা দেশের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে নতুন করে বসতি গড়তে বাধ্য হয়েছেন।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী জাকির হোসেন বলেন, সিরাজগঞ্জ শহরের শহর রক্ষা বাঁধ এলাকায় যমুনা পানি টানা কয়েকদিন বেড়ে যাওয়ার পরে ২৪ ঘন্টায় (৭ জুন) ৯ সেন্টিমিটার কমেছে। বর্তমানে বিপদসীমার ৪৪৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান বলেন, ওই এলাকাগুলোতে কাজ করতেছি না আমরা। আর চরের ভেতরে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ সম্ভব নয়। আমরা চড় এলাকার ভিতরে আসলে কাজ করি না। দ্বীপ চড়গুলোতে অনেক ভাঙছে, বালুরচড় বা ফসলি জমিও ভাঙছে, বাড়িঘরও আছে। আসলে ওই জায়গাগুলোতে কাজ করলেও বর্ষাকলে টিকবে না।
যমুনার পাড়ে দাঁড়িয়ে আব্দুল মানিক এখনও একটি স্বপ্ন দেখেন। হারানো ৫০ বিঘা জমি হয়তো আর ফিরে পাবেন না, কিন্তু একটি স্থায়ী বেড়িবাঁধ হলে অন্তত তার মতো মানুষদের আর ভিটেমাটি হারানোর ভয় নিয়ে বাঁচতে হবে না।
নাজমুল হাসান/আরকে
