বিজ্ঞাপন

হাজারো লোকগানের স্রষ্টা অনিল হাজারিকা, অর্থাভাবে চিকিৎসা করাতে পারছেন না

হাজারো লোকগানের স্রষ্টা অনিল হাজারিকা, অর্থাভাবে চিকিৎসা করাতে পারছেন না

‘ঠিলে ধুয়ে দে বউ, গাছ কাটতি যাব, ঠোঙ আইনে দে, দড়া আইনে দে বউ, বালিধারা খান কই? ঠিলের গলায় কানাচ নাগা, বেলা গেল ওই’- এমন অসংখ্য জনপ্রিয় লোকগানের রচয়িতা, সুরকার ও কণ্ঠশিল্পী অনিল হাজারিকা। বৃহত্তর যশোর অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষা, লোকজ সংস্কৃতি ও গ্রামীণ জীবনের চিত্র তার গানে এমনভাবে ফুটে উঠেছে, যা আজও মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে।

কিন্তু যে মানুষটি সারাজীবন গান দিয়ে মানুষকে আনন্দ দিয়েছেন, সেই শিল্পী আজ নিজেই জীবনযুদ্ধের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। বয়সের ভার, দীর্ঘদিনের অসুস্থতা এবং আর্থিক সংকটের কারণে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি।

মাগুরার শালিখা উপজেলার ধনেশ্বরগাতী ইউনিয়নের তিলখড়ি গ্রামের বাসিন্দা অনিল হাজারিকার বয়স এখন ৭০ বছর। পাঁচ বছর আগে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে তিনি প্রায় কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। এক সময় যার কণ্ঠে মুখর থাকত গ্রামবাংলা, আজ তিনি বিছানায় শুয়ে দিন কাটান। নিয়মিত চিকিৎসার প্রয়োজন হলেও অর্থাভাবে তা সম্ভব হচ্ছে না।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অনিল হাজারিকা প্রায় ১ হাজার ৩০০ আঞ্চলিক গান রচনা, সুরারোপ ও পরিবেশন করেছেন। তার অনেক গান বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত হয়েছে। লোকসংগীতের মাধ্যমে তিনি যশোর অঞ্চলের বহু বিলুপ্তপ্রায় শব্দ, প্রবাদ-প্রবচন এবং লোকজ জীবনধারাকে সংরক্ষণ করেছেন।

অনিল হাজারিকা জানান, শৈশবে সংসারের অভাব-অনটনের কারণে মাত্র ১৫ বছর বয়সে লেখাপড়া ছেড়ে বাবার সঙ্গে কাজ শুরু করতে হয় তাকে। তার বাবা প্রয়াত হাজারী লাল বিশ্বাসও ছিলেন সংগীতপ্রেমী মানুষ। বাবার কাছ থেকেই সংগীতের হাতে খড়ি। মাত্র ২০ বছর বয়সে গান লেখা শুরু করেন অনিল হাজারিকা। স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা থেকেই তিনি আঞ্চলিক উপভাষায় গান রচনা করতে থাকেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার গান ছড়িয়ে পড়ে বৃহত্তর যশোর অঞ্চলের বিভিন্ন প্রান্তে।

তিনি বলেন, আমার লেখা গানের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৩০০। আরও অনেক গান ছিল, যেগুলো সময়ের স্রোতে হারিয়ে গেছে। মানুষের ভালোবাসাই ছিল আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

লোকসংগীতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৮৫ সালে তিনি খুলনা বেতারের তালিকাভুক্ত শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগ, যশোরের নৃত্যবিতান এবং মাগুরা জেলা শিল্পকলা একাডেমি তাকে সম্মাননা প্রদান করেছে।

তবে জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই সম্মাননা যেন তার কষ্ট লাঘব করতে পারছে না। বর্তমানে পৈতৃক ভিটায় টিনের একটি সাধারণ ঘরে স্ত্রী জ্যোৎস্না হাজারিকাকে নিয়ে বসবাস করছেন তিনি। দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। পরিবারের সামান্য সহায়তা এবং এক বিঘা জমির ধানের ওপর নির্ভর করেই চলছে সংসার।

অনিল হাজারিকার স্ত্রী জ্যোৎস্না হাজারিকা বলেন, “পাঁচ বছর আগে স্ট্রোক করার পর বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা করাতে গিয়ে চার লাখ টাকারও বেশি খরচ হয়েছে। কিন্তু পুরোপুরি সুস্থ হয়নি। এখন আর চিকিৎসার খরচ চালানো সম্ভব হচ্ছে না। উন্নত চিকিৎসা করাতে পারলে হয়তো আবার কিছুটা সুস্থ হয়ে গান লেখা ও গাওয়ার কাজে ফিরতে পারতেন।”

জীবনের এই শেষ সময়ে কী প্রত্যাশা- এমন প্রশ্নের জবাবে আবেগাপ্লুত হয়ে অনিল হাজারিকা বলেন, এখন আর গান করতে পারি না। শরীর সায় দেয় না। গানই ছিল আমার জীবন। আজ গান থেকে দূরে থাকতে হচ্ছে, এটাই সবচেয়ে বড় কষ্ট। মৃত্যুর আগে যদি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আর স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে একটি সম্মাননা পেতাম, তাহলে ভালো লাগত।

সংগীতাঙ্গনের অনেকের মতে, আঞ্চলিক লোকসংগীত সংরক্ষণ ও জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে অনিল হাজারিকার অবদান অনস্বীকার্য। অথচ জীবনের শেষ সময়ে এসে তিনি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও যথাযথ স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত।

স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীরা বলছেন, অনিল হাজারিকার মতো শিল্পীরা শুধু গান রচনা করেননি, তারা বাংলার লোকঐতিহ্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করেছেন। তাই তার চিকিৎসা ও জীবিকার দায়িত্ব নেওয়া রাষ্ট্রের নৈতিক কর্তব্য।

শালিখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানভীন হাসান চৌধুরী ঢাকা পোস্টকে বলেন, অনিল হাজারিকা যদি জেলা প্রশাসক বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে আর্থিক সহায়তার জন্য আবেদন করেন, তাহলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।

লোকসংগীতের এই সুরের পাখিকে বাঁচিয়ে রাখা শুধু একজন শিল্পীকে সহায়তা করা নয়; বরং বাংলার লোকসংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারাকে সংরক্ষণ করা। তাই তার চিকিৎসা, আর্থিক সহায়তা এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবিতে স্থানীয় সাংস্কৃতিক মহলসহ সচেতন মানুষ সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

তাছিন জামান/আরকে