বিজ্ঞাপন

দিনে ক্লাস, সন্ধ্যায় ব্যবসা—নিজের খরচ চালিয়ে পরিবারকেও সহায়তা করছেন তারা

দিনে ক্লাস, সন্ধ্যায় ব্যবসা—নিজের খরচ চালিয়ে পরিবারকেও সহায়তা করছেন তারা

অভাবের সংসারে পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়াই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। কৃষক বাবার সীমিত আয়, ছোট বোনের লেখাপড়া আর নিত্যদিনের সংসারের খরচের চাপে একসময় নিজের শিক্ষাজীবনও অনিশ্চয়তায় পড়ে যায়। কিন্তু হার মানেননি যশোরের তরুণ আমির হামজা রাতুল। পড়াশোনার পাশাপাশি শুরু করেন স্ট্রিট ফুডের ব্যবসা। সেই ছোট্ট উদ্যোগই এখন তার শিক্ষার খরচ জোগাচ্ছে, পাশাপাশি পরিবারের দায়িত্বেও রাখছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান।

রাতুল শেখহাটি এলাকার তোহিদুর রহমানের ছেলে এবং যশোর সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণির ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী। এর পাশাপাশি বীর মুক্তিযোদ্ধা আলী হোসেন মনি সড়কে (প্যারিস রোড) পিজ্জা আড্ডা নামে তার একটি দোকান আছে।

শুরুটা সহজ ছিল না রাতুলের জন্য। তবে তিনি থেমে থাকেননি। ফুফাতো ভাই রাকিবুল ইসলাম রাকিবের সহযোগিতায় গড়ে তুলেছেন স্বপ্নের এই দোকানটি। রাকিবও নতুনহাট পাবলিক কলেজ থেকে এইচএসসি শেষ করে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য উন্নত দেশে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি এই দোকানে কাজ করছেন।

শুধু রাতুল কিংবা রাকিবই নন; দিনে ক্লাস, আর সন্ধ্যায় ব্যবসা—এভাবেই পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের খরচ চালানো ও পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন শতাধিক তরুণ-তরুণী। চাকরির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন বুকে লালন করে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে চলেছেন তারা।

বিকেল ৪টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা আলী হোসেন মনি সড়ক (প্যারিস রোড) ছাড়াও শহরের ব্যস্ত সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে এবং অলিগলিতে দেখা মেলে এমন অনেক শিক্ষার্থীর। বই-খাতা গুছিয়ে ক্লাস শেষ করেই তারা ছুটে যান নিজেদের ছোট্ট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে। কেউ বিক্রি করছেন ফাস্টফুড, কেউ চা-কফি, কেউ ঘরোয়া খাবার, আবার কেউ হোমমেড গয়না বা বিভিন্ন হস্তশিল্প সামগ্রী। স্বপ্ন আর সংগ্রামকে সঙ্গী করে তারা গড়ে তুলছেন নিজেদের ভবিষ্যৎ।

কথা হয় আমির হামজা রাতুলের সঙ্গে। পিজ্জার চুলায় জ্বাল দিতে দিতে জানালেন মনের সব কথা। তিনি বলেন, আমার বাবা কৃষক। অভাবের সংসার। পড়াশোনার পাশাপাশি কিছু করতে চেয়েছিলাম। সেই থেকে শুরু।

তিনি বলেন, তার ফুফাতো ভাই রাকিব ঢাকায় একটি রেস্তোরাঁয় পিজ্জা বানানো প্রশিক্ষণ নিয়েছে। পরে তার সঙ্গে পার্টনারশিপে এখানে দুই মাস ধরে দোকান দিয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ, এখন নিজের পড়াশোনার খরচ নিজেই চালাই। প্রথমে নানা জটিলতা তৈরি হয়। দোকান তৈরি করতে খরচ হয়েছে ৯৫ হাজার টাকা। জমানো ছিল কিছু টাকা। আর বাকি টাকা জন্য বন্ধু-বান্ধব সহযোগিতা করেছে। আমি আমার এ কাজে গর্বিত। বড় একটি রেস্টুরেন্ট করার ইচ্ছার কথা জানান তিনি।

যশোর আমিনিয়া মাদরাসা শিক্ষার্থী হাফেজ ফারহান ইসলাম এসএসসি পরীক্ষার ক্যান্ডিডেট। একই সড়কের পাশে গড়ে তুলেছেন ড্রিংক জোন নামে একটি শরবতের দোকান। বাড়ি চাঁচড়া রায়পাড়ায়।

তিনি বলেন, আমার বাবা কাপড়ের দোকানের মজুর। দুই ভাইয়ের মধ্যে আমি ছোট। এই রোডেই ভাবির একটি কেকের দোকান রয়েছে। সেখান থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে ৪-৫ মাস ধরে শরবতের দোকান দিয়েছি। আমার এখানে ২৫ রকম শরবত করে থাকি। প্রতিদিন এভারেজে ৫০০-৭০০ লাভ থাকে। যা দিয়ে নিজের ভরণপোষণ চলে যায়।

হামিদপুর আল হেরা ডিগ্রি কলেজে অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী স্বাধীন ঘোষ। বর্তমানে তার দোকানে বার্গার, স্যান্ডউইচ, ফ্রাইড চিকেন ও বিভিন্ন ধরনের স্নাক্স বিক্রি হয়। তিনি বলেন, আমরা যৌথ পরিবার। এই সড়কে আমাদের আরও একটি ফাস্টফুডের দোকান রয়েছে। ওটা আমার বড় ভাইয়ের দেখেন। এটি আমি দেখি। এক কথায় পড়াশোনার পাশাপাশি বড় ভাইকে সাহায্য করছি। তবে মাস শেষে কিছু হাত খরচের টাকা নিয়ে থাকি।

একইভাবে সুমাইয়া ইসলাম রোজা নামে এক নারী শিক্ষার্থী এই সড়কে ফেসবুকে ‘স্বপ্নবতী’ নামে পেজে খুলে ঘরে তৈরি জুয়েলারি বিক্রি করছেন। ক্লাসের ফাঁকে অর্ডার নেওয়া, জুয়েলারি প্রস্তুত করা এবং ডেলিভারির কাজ করেন তিনি। পাশাপাশি বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত একটি টেবিল হোমমেড চুড়ি, কানের দুল, ব্রেসলেট ও অর্গানিক মেহেদি বিক্রয় করেন।

তিনি বলেন, পড়াশোনার পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনা সহজ নয়। তবে সময়ের সঠিক ব্যবস্থাপনা করলে সবকিছুই সম্ভব। এই কাজ আমাকে আত্মনির্ভরশীল হতে সাহায্য করছে।

যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হামিদুল হক শাহীন। তিনি নিজেও আইডিয়া পিঠা পার্ক নামে একটি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা। যেখানে শতাধিক শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাশাপাশি আয়ের সুযোগ পাচ্ছেন। তিনি বলেন, যেসব শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি নিজে কিছু করছে তাদেরকে আমি সাধুবাদ জানাই। বিশ্বের উন্নত দেশে শিক্ষার্থীদের কর্মের ক্ষেত্র অনেক। তবে আমাদের দেশে সেই সুযোগ কম। পড়াশোনা শেষ করে চাকরি করতে হবে এমনটাই আমাদের সমাজের ধারণা। তবে যারা ছাত্রজীবনে কর্মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লেন তারা জীবনে এগিয়ে থাকলেন। বিশেষ করে যেসব শিক্ষার্থী এই প্যারিস রোডে ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করেছেন তারা চাকরি নয় উদ্যোক্তা হবার প্রত্যয়ে অনেকাংশে এগিয়ে গেলেন।

তিনি আরও বলেন, আমাদের সমাজে এসব কর্মজীবী শিক্ষার্থীদের জন্য কেউ এগিয়ে আসে না। যেসব শিক্ষার্থী কিছু করতে চান তাদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সহযোগিতা করা উচিত বলে আমি মনে করি। তাহলে দেশ এগিয়ে যাবে।

আইডিয়া পিঠা পার্কের বিষয়ে তিনি বলেন, যশোরে পিঠা তৈরির কাঁচামাল সহজলভ্যতা রয়েছে। পিঠা যশোরের ঐতিহ্য। যে কারণে শিক্ষার্থীদের পিঠা বানাতে আলাদাভাবে প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয় না। তারা পারিবারিকভাবেই পিঠা বানানো শিখে আসেন। আমি চেয়েছি পিঠার কাঁচামালের সহজলভ্যতা ও পারিবারিক প্রশিক্ষণ এই দুইয়ের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে সকলের জন্য কিছু করার। যে কারণে আইডিয়া পিঠা পার্কের উদ্ভাবন।  এতে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।

রেজওয়ান বাপ্পী/আরকে

বিজ্ঞাপন