বিজ্ঞাপন

লাম্পিতে মরছে গরু, ভুয়া চিকিৎসকের ফাঁদে নিঃস্ব গাইবান্ধার খামারিরা

লাম্পিতে মরছে গরু, ভুয়া চিকিৎসকের ফাঁদে নিঃস্ব গাইবান্ধার খামারিরা

গাইবান্ধায় লাম্পি রোগে একের পর এক গরুর মৃত্যুতে দিশেহারা খামারি ও কৃষকরা। অভিযোগ, মাঠপর্যায়ে সরকারি প্রাণিসম্পদ বিভাগের সেবা না পেয়ে বাধ্য হয়ে স্বল্প প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কথিত ‘গ্রাম্য পশু চিকিৎসকদের’ দ্বারস্থ হচ্ছেন তারা। ভুল চিকিৎসা, অতিরিক্ত খরচ এবং গবাদিপশুর মৃত্যুর ঘটনায় নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন অনেক পরিবার। জনবল সংকটের অজুহাতে দায়িত্ব এড়ানোর অভিযোগ উঠেছে প্রাণিসম্পদ বিভাগের বিরুদ্ধেও।

জেলার বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লাম্পি ছাড়াও অন্যান্য রোগ নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন গবাদিপশু পালনকারীরা। তবে অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত পশু চিকিৎসকের সংকট থাকায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভরসা করতে হচ্ছে গ্রাম্য চিকিৎসকদের ওপর। অনেকেই মাত্র দুই থেকে আড়াই মাসের প্রশিক্ষণ অথবা কোনো চিকিৎসকের সঙ্গে কিছুদিন কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়েই নিজেদের পশু চিকিৎসক হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন। ফলে জটিল রোগ শনাক্ত বা চিকিৎসা দেওয়ার মতো দক্ষতা না থাকায় তাদের হাতে প্রাণ হারাচ্ছে অসংখ্য গবাদিপশু।

কিন্তু প্রান্তিক পর্যায়ে প্রাণি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত ও ভুয়া চিকিৎসকদের দৌরাত্মে কোনো তৎপরতা নেই তাদের। শুধুমাত্র জনবল সংকটের অজুহাতে দায় এড়িয়ে চলছে দপ্তরটি।

খামারিরা বলছেন, সাধারণ সর্দি-জ্বর বা হালকা অসুখে কিছুটা কাজ করলেও, একটু জটিল হলেই এসব চিকিৎসকের ওপর ভরসা করা যায় না। বরং ভুল চিকিৎসায় গরুর অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়। একই সাথে ভিজিটের নাম করে ও ওষুধের অতিরিক্ত মূল্য ধার্যে রীতিমতো পকেট কাটেন তারা।

এদিকে, চিকিৎসা সেবায় সরকারি প্রাণিসম্পদ বিভাগের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তারা বলছেন, উপজেলা প্রাণিসম্পদ হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা এবং পরামর্শ থাকলেও মাঠপর্যায়ে সেবা পৌঁছায় না। ফলে বাধ্য হয়ে খামারিরা শরণাপন্ন হন অদক্ষ চিকিৎসকদের, যার ফল হচ্ছে অত্যন্ত ভয়াবহ। একটি গরু হারানো মানে একটি পরিবারের জন্য বড় অর্থনৈতিক ধাক্কা। অনেক ক্ষেত্রে এক বা দুইটি গরুই তাদের একমাত্র সম্বল, যার মৃত্যুতে নিঃস্ব হয়ে পড়ে গৃহস্থ, খামারি বা কৃষক।

লাম্পিতে মৃত্যু, খামারিদের কান্না

গত ৬ মে লাম্পি রোগে আক্রান্ত হয়ে সদরের কুপতলা ইউনিয়নের পূর্ব চাপাদহ গ্রামে মাঝারি খামারি মোশাররফ হোসেনের দুই বছর বয়সী ফ্রিজিয়ান জাতের একটি ষাঁড় গরু মারা যায়। যার আনুমানিক মূল্য ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা। একই সময়ে তার আরও ১৪-১৫টি গরু আক্রান্ত হয়।

এ ছাড়া বোয়ালী ইউনিয়নের পশ্চিম রাধাকৃষ্ণপুর গ্রামের কৃষক মাহাতাবের ফ্রিজিয়ান জাতের ৭০-৮০ হাজার টাকা মূল্যের একটি বকনা বাছুর এবং একই গ্রামের আব্দুল হামিদের ৩৫-৪০ হাজার টাকা মূল্যের একটি বাছুরও লাম্পি আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। বর্তমানে ওই এলাকার আরও একই সময়ে লাম্পিতে আক্রান্ত রয়েছে একই এলাকার শাহারুল, রোশনা বেগম, রবিউল ও লিটন মন্ডলের একটি করে গরু।

খামারি মোশাররফ হোসেন বলেন, গত ৬ মে আমার ১ লাখ ২০ হাজার টাকা মূল্যের একটি বিদেশি গরু লাম্পিতে মারা গেছে। একই সঙ্গে আরও ১৪-১৫টি গরুতে লাম্পি হয়েছিল। আমি প্রাণিসম্পদের কোনো সহযোগিতা পাইনি। তারা কোনোদিন গ্রামে খোঁজ নিতে আসে না।

মাঠ পর্যায়ে সেবা নেই প্রাণিসম্পদের

স্থানীয়দের অভিযোগ, সরাসরি মাঠপর্যায়ে পরামর্শ ও চিকিৎসা সেবা দেওয়ার দায়িত্ব থাকলেও উপসহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের বেশিরভাগ সময় এলাকায় দেখা যায় না। ফলে খামারিরা বিনামূল্যের পরামর্শ ও স্বল্পমূল্যের চিকিৎসা সেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।

রাধাকৃষ্ণপুর গ্রামের কৃষক সাইফুল ইসলাম বলেন, কোনোদিন দেখিনি পশু হাসপাতালের কেউ গ্রামে এসেছে। গরু অসুস্থ হলে স্থানীয় ডাক্তারদের কাছেই যেতে হয়।

একই ধরনের অভিযোগ করেছেন রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের উত্তর হরিণসিংহা গ্রামের কৃষক আব্দুর রহিমসহ আরও অনেকে।

স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও রাকৃষ্ণপুর বায়তুল মামুর জামে মসজিদের সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম তারা বলেন, গেল কয়েক বছর আগে আমার একটি কোরবানি যোগ্য পশু লাম্পিতে আক্রান্ত হলে চিকিৎসার জন্য অনেক টাকা খরচ করি। শেষ পর্যন্ত প্রাণিসম্পদের দুজন লোককে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে নিয়ে এসেও বাঁচাতে পারিনি।

ভুয়া চিকিৎসকের ফাঁদে খামারিরা

আব্দুল হামিদের বাছুরটির চিকিৎসা করেন স্থানীয় এক ব্যক্তি, যিনি নিজেকে পশু চিকিৎসক হিসেবে পরিচয় দেন। হামিদের দাবি, তিন দিনে সাতটি ইনজেকশন ও বিভিন্ন ওষুধ বাবদ ৫-৬ হাজার টাকা খরচ হলেও শেষ পর্যন্ত গরুটি মারা যায়।

পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওই ব্যক্তির প্রাণিসম্পদ বিষয়ে কোনো একাডেমিক শিক্ষা বা স্বীকৃত প্রশিক্ষণ নেই। তিনি স্বীকার করেন, একজন পশু চিকিৎসকের সঙ্গে ঘুরে ঘুরেই চিকিৎসা কাজ শিখেছেন।

এসব বিষয়ে কথা হলে গবাদিপশু বিষয়ে একাডেমিক শিক্ষা এবং কোনো প্রশিক্ষণ না থাকার বিষয়টি ঢাকা পোস্টের কাছে স্বীকার করেন শ্রী সন্তোষ। তিনি বলেন, আমি একজন গরুর চিকিৎসকের সাথে গ্রামে ঘুরে ঘুরে এটা (চিকিৎসা) শিখেছি। তিনি বলেন, গরুর ডাক্তার হিসেবে আমার পরিচয় দেওয়া ঠিক না, এটা ঠিক। কিন্তু কোনো সমেস্যা হচ্ছে না তো।

অন্যদিকে, সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দেয়াল ও বিদ্যুতের খুঁটিতে ‘গরুর ডাক্তার’ পরিচয়ে বিজ্ঞাপনও দেখা গেছে। তাদের মধ্যে কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কেউ আড়াই মাসের প্রশিক্ষণ, আবার কেউ ছয় মাসের বেসরকারি প্রশিক্ষণ নিয়েই চিকিৎসা দিয়ে আসছেন।

এসব বিজ্ঞপনের একটিতে ফোন করা হলে কথা হয় গরুর ডাক্তার হিসেবে পরিচয় দেওয়া জীবন মিয়ার সাথে। জানতে চাইলে ঢাকা পোস্টকে তিনি বলেন, গাইবান্ধা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে ‘মৎস্য, কৃষি, গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি’র  আড়াই মাসের আবাসিক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তিনি। এছাড়া বেসরকারি একটি কোম্পানির মাধ্যমে ২ মাসের ইপিআই (বীজ প্রদান) প্রশিক্ষণ নিয়ে হয়েছেন পশু চিকিৎসক। 

জীবন বলেন, শুরুর দিকে আমি পশু ডাক্তার লিখেছিলাম, এখন আর লিখি না। এখন পল্লী চিকিৎসক লিখি। এসময় চিকিৎসা দিয়ে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন তিনি।

বিক্রিতেও নেই সহযোগিতা

খামারিদের অভিযোগ, চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি গবাদিপশু বিপণনেও কার্যকর সহায়তা মিলছে না।

ফুলছড়ি উপজেলার দক্ষিণ উদাখালি গ্রামের খামারি কিশোর চার বছর ধরে লালন-পালন করে প্রায় ৮০০ কেজি ওজনের একটি ষাঁড় গরু প্রস্তুত করেন। জেলার সবচেয়ে বড় গরু হিসেবে আলোচনায় এলেও বিক্রির সময় কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতা পাননি বলে অভিযোগ তার।

কিশোর বলেন, গরুটি নিয়ে অনেক প্রচার হয়েছে, কিন্তু বিক্রির সময় কেউ পাশে ছিল না। শেষে গত ২৮ মে তাদের ২০ মণ ওজনের লাল বাবুকে বগুড়ার মহাস্থানগড় হাটে সাড়ে ৪ লাখে বিক্রি করা হয়।

তবে ফুলছড়ি উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. জহিরুল ইসলাম বলেন, গরুটির তথ্য ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় প্রচার করা হয়েছিল, যাতে দ্রুত ক্রেতা পাওয়া যায়।

জনবল সংকটের কথা বলছে দপ্তর

সদর উপজেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা (ইউএলও) তরুণ কুমার ঢাকা পোস্টকে বলেন, ২০১৯ সালে লাম্পি এই রোগটি সর্বপ্রথম চট্রগ্রামে ধরা পড়ে। এটি মশাবাহিত রোগ। লাম্পি বিষয়ে সচেতনতায় আমরা বিভিন্ন এলাকায় সচেতনতা লিফলেট বিতরণ করছি।

মাঠপর্যায়ে সেবা না পৌঁছানোর বিষয়ে তিনি বলেন, জনবল সংকটের কারণে সব জায়গায় কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সদর উপজেলায় তিনজনের স্থলে বর্তমানে দুইজন উপসহকারী কর্মকর্তা রয়েছেন।। ফলে সবকিছু ঠিকঠাক করা যাচ্ছে না। তবে, আমরা চেষ্টা করছি এবং সমন্বয় করে কাজ করছি।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (ডিএলও) ডা.আব্দুর রাজ্জাক ঢাকা পোস্টকে বলেন, মাঠ পর্যায়ে সরাসরি চিকিৎসা ও পরামর্শ সেবায় জেলার সাত উপজেলার প্রত্যেকটিতে তিনজন করে মোট ২১ জন উপসহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা থাকার কথা, কিন্তু আছে মাত্র ১১ জন। যা দিয়ে আমরা কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে পারছি না।

তিনি বলেন, ১১ জন লোক দিয়ে জেলার ৮১ টি ইউনিয়নে কীভাবে সেবা পৌঁছানো সম্ভব! এসময় প্রত্যেকটি ইউনিয়নে এই পদে জনবলের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন এই কর্মকর্তা।

লাম্পি বিষয়ে খামারিদের সতর্ক করে এ কর্মকর্তা জানান, এ রোগের জন্য প্রতি বছরে একবার আগাম টিকা দিতে হবে। হাসপাতালেও স্বল্লমূল্যে এই টিকা পাওয়া যায়। যদি আক্রান্ত হয়েই যায় তবে, হোমিও ওষুধ পরিহার করা এবং শুরুতেই এন্টিবায়েটিকের ব্যবহার না করার পরামর্শ দেন তিনি।

রোগাক্রান্ত কিংবা মৃত্যুর পরিসংখ্যান নেই দপ্তরে

জেলায় বছরে কত গরু কোন কোন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে এবং কত গরু মারা যাচ্ছে, সে বিষয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নেই প্রাণিসম্পদ দপ্তরে। ফলে সমস্যার প্রকৃত চিত্র অজানাই থেকে যাচ্ছে। 

অভিজ্ঞদের মতে, পরিসংখ্যান না থাকলে কার্যকর প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব নয়।

খামারিদের দাবি

খামারি ও সচেতন নাগরিকদের দাবি, গ্রামপর্যায়ে দক্ষ ও নিবন্ধিত পশু চিকিৎসকদের মাধ্যমে সেবা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ভুয়া চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান, রোগ প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধি, টিকাদান কার্যক্রম জোরদার এবং বাড়ি বাড়ি পরামর্শ সেবা চালুর উদ্যোগ নিতে হবে।

তাদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু খামারিরাই নয়, দেশের গ্রামীণ পশুভিত্তিক অর্থনীতিও।

মাসুম বিল্লাহ/এসএইচএ

বিজ্ঞাপন