বিজ্ঞাপন

দখল-দূষণে ধুঁকছে দেড়শো বছরের কেডি খাল, টেকসই সংস্কারের দাবি

দখল-দূষণে ধুঁকছে দেড়শো বছরের কেডি খাল, টেকসই সংস্কারের দাবি

ক্রমাগত দখল ও দূষণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে রংপুর নগরীর ঐতিহ্যবাহী কেডি খাল। ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হওয়া দেড়শো বছরের পুরোনো এই খালটি এখন মশার নিরাপদ প্রজননকেন্দ্র। জমে থাকা বর্জ্যের দুর্গন্ধ ও মশার উপদ্রবে বাড়ছে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি। এমন পরিস্থিতিতে দখল-দূষণ রোধে টেকসই পরিকল্পনা নিয়ে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে খালটি পুনরুদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকেরা।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, গৃহস্থালির বর্জ্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য পাইপের মাধ্যমে সরাসরি ফেলা হচ্ছে খালে। দুই পাশ দখল হয়ে যাওয়ায় খালটি সরু নালায় পরিণত হয়েছে। পানির প্রবাহ বন্ধ, গভীরতা কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। অনেক জায়গায় কচুরিপানাসহ আগাছা জন্মেছে, পানি কালো হয়ে গেছে।

বর্ষায় রংপুর নগরীর পানি নিষ্কাশনে শ্যামাসুন্দরী খালের পরই কেডি খালের অবস্থান। কিন্তু পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক না থাকায় ভারি বৃষ্টিতে আশপাশের নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে। বাড়ছে পরিবেশ দূষণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সংস্কারের নামে বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নেওয়া হলেও স্থায়ী কোনো সমাধান মেলেনি। বরং অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জনগণের অর্থের অপচয় হয়েছে।

মাহিগঞ্জ রেলগেট এলাকার বাসিন্দা রাজিমুজ্জামান বলেন, বিভিন্ন সময়ে খাল খনন ও সংস্কারের নামে যে অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে, তারই কারণে এখন এই খাল আমাদের গলার কাঁটা। কোনো উন্নয়ন হয়নি, বরং খালটিকে সরু করে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আমরা দাবি করছি, খালটি দখলমুক্ত করে খনন ও সংস্কার করা হোক।

একই এলাকার সেলিনা আক্তার বলেন, একবার খনন করার পর সেই মাটি খালেই মিশে গেছে। আশপাশের বাড়ির পয়ঃনালির ময়লা এই খালে পড়ছে। মশা-মাছির যন্ত্রণায় দিনের বেলাও বাচ্চাদের মশারির ভেতর রাখতে হচ্ছে। মাঝেমাঝে এত দুর্গন্ধ ছড়ায় যে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়।

স্থানীয় বাসিন্দা আনিস মোল্লা বলেন, এই খালের জল ছিল একসময় স্বচ্ছ, মানুষ এখানে গোসল করতেন। এখন এটি মশার উৎপাদনকেন্দ্র হয়ে উঠেছে। শ্যামাসুন্দরী খাল নিয়ে অনেক আন্দোলন হলেও কেডি খাল নিয়ে কেউ কথা বলছে না। মেয়র আসে-যায়, কাজ হয় না।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রংপুর মহানগরের সভাপতি অ্যাডভোকেট জোবাইদুল ইসলাম বুলেট বলেন, স্থানীয় প্রভাবশালীদের অনিয়ন্ত্রিত দখলের কারণে শ্যামাসুন্দরী ও কেডি খাল নালায় পরিণত হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

তিনি আরও বলেন, খাল শুধু খনন করলেই হবে না, খালপাড়কে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে বিনোদনের স্থান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও নদী বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, কেডি ও শ্যামাসুন্দরী খাল বাঁচাতে পানিপ্রবাহ পুনরুদ্ধার করতে হবে। গত তিন-চার দশকে কোথায় কোথায় প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে তা চিহ্নিত করা জরুরি। এ দুটি খালের বর্জ্য দূষণ অন্য নদীতেও ছড়িয়ে পড়ছে, ফলে মাছসহ নদীকেন্দ্রিক জীববৈচিত্র্য হুমকিতে পড়েছে।

জানা গেছে, ২০২২ সালে কেডি খাল সংস্কারে প্রায় এক কোটি ৩১ লাখ টাকা ব্যয় হলেও এর সুফল পাননি নগরবাসী।

রংপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট মাহফুজ উন-নবী চৌধুরী ডন বলেন, কেডি খাল রংপুরের ঐতিহ্যবাহী খাল। এটি খনন করে প্রাণ ফেরাতে সাধ্যমতো চেষ্টা করব। দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে শ্যামাসুন্দরী, কেডিসহ অন্যান্য খাল সংস্কারে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করছি। এ ক্ষেত্রে নগরবাসীর সহযোগিতা চাই।

ফরহাদুজ্জামান ফারুক/আরএআর

বিজ্ঞাপন