মাগুরার মহম্মদপুর ও ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে নির্মিত হয়েছিল মধুমতি সেতু। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানী ঢাকার যোগাযোগ সহজ করার পাশাপাশি এ অঞ্চলের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয় সেতুটি। কিন্তু কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এখন ভুগছে অবহেলা ও রক্ষণাবেক্ষণের সংকটে। সেতুর সব স্ট্রিট লাইট দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে অচল থাকায় রাত নামলেই পুরো এলাকা ডুবে যায় ঘন অন্ধকারে। এতে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন হাজারো মানুষ।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে মধুমতি সেতুর চিত্র পুরোপুরি বদলে যায়। দিনের বেলায় যে সেতু সৌন্দর্য আর প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর থাকে, রাতের অন্ধকারে সেটিই যেন পরিণত হয় এক নির্জন ও ঝুঁকিপূর্ণ পথে। সেতুর দুই পাশে স্থাপিত স্ট্রিট লাইটগুলো দীর্ঘদিন ধরে অচল হয়ে পড়ে আছে। কোথাও কোনো আলোর ব্যবস্থা না থাকায় সেতুর ওপর দিয়ে চলাচলকারী যানবাহন ও পথচারীদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
মহম্মদপুর উপজেলা সদরে ২০২০ সালে ৬৩ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে নির্মিত মধুমতি সেতুটি বর্তমানে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ মাধ্যম। উদ্বোধনের পর থেকেই এটি মাগুরা, ফরিদপুরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পদ্মা সেতু চালুর পর মধুমতি সেতুর গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।
প্রতিদিন শত শত দূরপাল্লার বাস, পণ্যবাহী ট্রাক, ব্যক্তিগত গাড়ি, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেল এ সেতু ব্যবহার করে। কিন্তু পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকায় রাতে যানবাহন চালকদের অতিরিক্ত সতর্ক হয়ে চলতে হয়। বিশেষ করে মোটরসাইকেল আরোহীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
শুধু যোগাযোগের ক্ষেত্রেই নয়, মধুমতি সেতুকে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। ঈদের সময় দুই পাড়ে বসে মেলা, চলে নাগরদোলা ও নৌভ্রমণ। সেতুকে ঘিরে গড়ে ওঠা এসব পর্যটন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমও আলোর অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তবে, পর্যটন সম্ভাবনাময় এ এলাকাটির সৌন্দর্য ও নিরাপত্তা এখন হুমকির মুখে। স্থানীয়দের অভিযোগ, স্ট্রিট লাইট বন্ধ থাকায় সন্ধ্যার পর দর্শনার্থীদের অনেকেই এখানে আসতে চান না। অন্ধকারে ছিনতাই কিংবা অন্য কোনো অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. ইউনুছ আলী বলেন, দুই বছরের বেশি সময় ধরে সেতুর লাইটগুলো বন্ধ। সন্ধ্যার পর পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসলেও ভয় লাগে। দ্রুত লাইটগুলো চালু করা প্রয়োজন।
আরেক বাসিন্দা মো. ইমামুল ইসলাম বলেন, আমার শ্বশুরবাড়ি সেতুর কাছেই। প্রায়ই এ পথে যাতায়াত করি। রাত হলে সেতু পার হতে ভয় লাগে। বিশেষ করে মোটরসাইকেলে চলাচলের সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও বলছেন, আলোর অভাবে সন্ধ্যার পর ক্রেতা ও দর্শনার্থীর সংখ্যা কমে যায়। এতে ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের।
এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ এ সেতুর আলোকসজ্জা দীর্ঘদিন অচল থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। ফলে জনদুর্ভোগ দিন দিন বাড়ছে।
এ বিষয়ে মহম্মদপুর উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) মো. গোলজার হোসেন বলেন, সেতুর বেশ কিছু বাতি নষ্ট হয়ে গেছে। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক তার চুরির ঘটনাও ঘটেছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত সংস্কার কাজ শুরু করা হবে।
মহম্মদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বেদবতী মিস্ত্রি বলেন, সার্ভিস তার ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চুরি হয়ে যাওয়ায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলছে। আশা করছি খুব দ্রুত স্ট্রিট লাইটগুলো পুনরায় চালু করা সম্ভব হবে।
তাছিন জামান/এসএইচএ
