বিশ্বকাপ ফুটবল এলেই নতুন উন্মাদনায় মাতেন মাগুরার কৃষক আমজাদ হোসেন (৭৪)। প্রিয় দল জার্মানির প্রতি ভালোবাসা থেকে এবারও তিনি হাজির হয়েছেন সাড়ে সাত কিলোমিটার দীর্ঘ পতাকা নিয়ে। বুধবার (১০ জুন) দুপুরে সদর উপজেলার ঘোড়ামারা গ্রামের এই কৃষক স্থানীয় নিশ্চিন্তপুর স্কুল মাঠে বিশাল পতাকা প্রদর্শন করে সবার দৃষ্টি কাড়েন।
গ্রামের পথে ব্যান্ড বাজিয়ে শিশু-কিশোর থেকে বয়স্ক মানুষ পর্যন্ত মিছিল করেন। জেলা বিএনপির কয়েকজন নেতাও শহর থেকে এসে এই ব্যতিক্রমী আয়োজনে যোগ দেন। এই ভালোবাসার স্বীকৃতিস্বরুপ একবারের জন্য হলেও জার্মানি যাওয়ার সুযোগ চান আমজাদ।
জানা গেছে, আমজাদ হোসেনের এই যাত্রা শুরু দুই দশক আগে। ২০০৬ সালে দেড় কিলোমিটার পতাকা বানিয়ে প্রথম নজর কাড়েন। ২০১০ সালে আড়াই কিলোমিটার, ২০১৪ সালে নিজের ৩০ শতক জমি বিক্রি করে সাড়ে তিন কিলোমিটার পতাকা তৈরি করেন। সেই সময় ঢাকার জার্মান দূতাবাসের কর্মকর্তারা মাগুরায় এসে তাকে সংবর্ধনা দেন এবং জার্মানির অফিশিয়াল ফুটবল ফ্যান ক্লাবের সদস্যপদের স্বীকৃতি দেন। ২০১৮ সালে সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার এবং ২০২২ সালে আরও দুই কিলোমিটার যুক্ত করে সাড়ে সাত কিলোমিটারের নতুন রেকর্ড গড়েন তিনি।
জার্মানির প্রতি এই অসাধারণ ভালোবাসার পেছনে রয়েছে এক কৃতজ্ঞতার গল্প। আমজাদ হোসেন জানান, ২০০৪ সালের দিকে একটি কঠিন রোগে আক্রান্ত হন তিনি। দেশে বিভিন্ন চিকিৎসায় তেমন উপকার না পেয়ে ভারতে গিয়ে জার্মানিতে তৈরি একটি হোমিওপ্যাথিক ওষুধ সেবন করেন। কয়েকবার ভারতে চিকিৎসা নিয়ে সেই ওষুধেই সুস্থ হয়ে ওঠেন। সেই থেকেই জার্মানির প্রতি বিশেষ টান তৈরি হয় তার, যা পরে ফুটবলপ্রেমে রূপ নেয়। পতাকা তৈরির পথ সবসময় সহজ ছিল না। বিশেষ করে ২০১৪ সালে পরিবারের অধিকাংশ সদস্য এই উদ্যোগের বিরোধিতা করেছিলেন। তবে নিজের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন আমজাদ।
পাঁচ ছেলে ও পাঁচ মেয়ের বাবা আমজাদ বলেন, আমি ভালোবাসা থেকেই এসব করি। এজন্য কখনো কারও কাছে সাহায্য চাইনি।
তিনি জানান, এবারের বিশ্বকাপে জমি বিক্রি না করে পরিবারের সহযোগিতা এবং জার্মান-ভক্তদের আর্থিক সহায়তায় পতাকা তৈরি করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মহাসিন হোসাইন বলেন, আমি আর্জেন্টিনার সমর্থক। আমজাদ দাদা জার্মানির সমর্থক। তিনি নিজের জমি বিক্রি করে সাড়ে সাত কিলোমিটার দীর্ঘ জার্মানির পতাকা তৈরি করেছেন। একটা বিষয় খেয়াল করেছি, আমজাদ দাদা তার বাড়িতে আগে নিজের দেশ বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা টানিয়েছেন, পাশাপাশি জার্মানির পতাকাও। আমি মনে করি, যে দলেরই সমর্থক হন না কেন, আগে নিজের দেশকে ভালোবাসতে হবে।

প্রতিবেশী আব্দুর রউফ মোল্লা বলেন, বিশ্বকাপ এলেই আমজাদ সাহেব জার্মানির পতাকা বানিয়ে আনন্দ করেন। তার মাধ্যমে জীবনে এত বড় পতাকা দেখতে পেলাম। আমাদের এলাকাবাসীর দাবি, জার্মান সরকার অন্তত একবার আমজাদ সাহেবকে জার্মানিতে নিয়ে গিয়ে সেখানকার জাতীয় ফুটবল দলের খেলোয়াড়দের সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করুক।
আমজাদ হোসেন নিজেও এই আক্ষেপের কথা জানান। তিনি বলেন, আমি ভালোবাসা থেকেই এসব করি। এজন্য কখনো কারও কাছে সাহায্য চাইনি। ২০১৪ সালের দিকে ঢাকার জার্মান দূতাবাসের কর্মকর্তারা নিজের ইচ্ছায় মাগুরায় এসে আমাকে সংবর্ধনা দেন এবং জার্মানির ফুটবল ফ্যান ক্লাবের সদস্যপদের স্বীকৃতিও প্রদান করেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় এ পর্যন্ত ক্লাবটা দেখার আহ্বান করেনি। জার্মানির সরকার আমাকে একবারের জন্য হলেও যেন দেখার সুযোগ করে দেয়। আমিতো তাদের দেশে পড়ে থাকবো না বা তাদের কাছে সহযোগিতাও চাইবো না।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রসঙ্গে আমজাদ জানান, আল্লাহ সুস্থ রাখলে ২০৩০ বিশ্বকাপ উপলক্ষ্যে ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ পতাকা তৈরি করবেন এবং সেটি জার্মানির কোনো জাদুঘরে সংরক্ষণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানাবেন।
তাছিন জামান/আরএআর
