বিভিন্ন স্থানে ঘুরে পুরুষ না থাকা বাসা-বাড়ি টার্গেট করতেন। এরপর গভীর রাতে দেওয়াল টপকে সেই বাড়িতে প্রবেশ করে ভারী বস্তু দিয়ে নারীদের মাথায় করতেন আঘাত, তারপর চুরি। রক্তপাতের ভয়ে একটিই আঘাত করতেন। তারপরও ঘটতো হতাহতের ঘটনা। সংবাদ সম্মেলনে এমনই এক সাইকোপ্যাথ সিরিয়াল কিলারের বর্ণনা দেন নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম।
সেই সাইকোপ্যাথ সিরিয়াল কিলারের নাম গোলাম মোরশেদ ওরফে মোরশেদ আলম (২৭)। তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় তদন্ত চালিয়ে বুধবার (১০ জুন) গাজীপুর মহানগরীর বাসন থানার শরীফপুর কোনাপাড়া এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) রাতে নওগাঁ পুলিশ সুপারের কার্যলয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম এসব তথ্য জানান।
তারিকুল ইসলাম বলেন, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত নওগাঁর ধামইরহাট, বদলগাছী ও পত্নীতলা উপজেলায় গভীর রাতে বাড়িতে ঢুকে নারীদের মাথায় ভোঁতা অস্ত্র দিয়ে আঘাত এবং চুরির একাধিক ঘটনা ঘটে। গত ১৮ জানুয়ারি রাতে জেলার ধামইরহাট থানার নানাইচ গ্রামে গভীর রাতে দেওয়াল টপকে হাসান আলীর বাড়িতে প্রবেশ করেন। এরপর তার মেয়ে কলেজছাত্রী উম্মে হাবিবার ঘরে ঢুকে মাথায় টিউবওয়েলের হাতল (হ্যান্ডেল) দিয়ে আঘাত করে পালিয়ে যান। গুরুত্বর আঘাতের ফলে উম্মে হাবিবা চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

একই দিনে অপরাধী আরও পৃথক দুই বাড়িতে প্রবেশ করে ভিকটিমদের মাথায় মারত্মকভাবে আঘাত করে পালিয়ে যান। বিষয়টি নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শনসহ আসামি শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করার নির্দেশ প্রদান করা হয়।
তিনি বলেন, গত ৭ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৭টায় একই থানার জাহানপুর গ্রামে শাহিন ইসলামের ঘরে প্রবেশ করে তার স্ত্রী সুলতানা বেগমকে মাথায় বাঁশ দিয়ে মেরে গুরুত্বর আঘাত করেন। এরপর এলাকায় একই রাতে আরও তিন বাড়িতে প্রবেশ করেন এবং ভোদোকে টিউবওয়েলের হ্যান্ডেল দিয়ে মাথায় আঘাত করে পালিয়ে যান। সিরিয়ালভাবে এই ধরনের ঘটনা ঘটায় এলাকায় জনসাধারণের মধ্যে ভয়ভীতি বা আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। গত ৭ মে জেলার বদলগাছী থানার দুর্গাপুর, ঘোয়ালভিটা ও নয়নশহর এলাকায় রাতে দেয়াল টপকে তিন বাড়িতে প্রবেশ করে শাহানাজ (২২), নাসরিন (১৩) ও বাক প্রতিবন্ধি বৃষ্টিকে (২০) মাথায় মারাত্মকভাবে আঘাত করে গুরুত্বর জখম করে পালিয়ে যান। সবশেষ ৪ জুন জেলার পত্নীতলা থানার শিমুলিয়া ও নান্দাশ গ্রামে গভীর রাতে দেওয়াল টপপে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে রোজি আক্তার (৩৭) এবং অপর একটি বাড়ির জানালা ভেঙে ঘরে প্রবেশ করে আলতা বানু (৪৫) ও তার মেয়ে আসমা খাতুনকে (২২) লোহার শাবল দিয়ে মাথায় মারাত্মকভাবে আঘাত করে গুরুত্বর জখম করে পালিয়ে যায়।
এ বিষয়ে জেলার বিভিন্ন থানায় চারটি মামলা হয়েছে। জেলার তিনটি থানায় অন্তত ১২টি এমন ঘটনা ঘটে। এরপর বিষয়টি নিয়ে পুলিশ প্রশাসন মাঠে নামে। কিন্তু পুলিশের কাছে এ বিষয়ে কোনো তথ্য ছিল না। মামলাগুলোর তদন্তে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি), সাইবার ইউনিট ও সংশ্লিষ্ট থানা-পুলিশের সমন্বয়ে বিশেষ টিম গঠন করা হয়। তথ্যপ্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় তদন্ত চালিয়ে গত ১০ জুন গাজীপুর মহানগরীর বাসন থানার শরীফপুর কোনাপাড়া এলাকা থেকে মোরশেদকে গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে মোরশেদ ধামইরহাটের উম্মে হাবিবা হত্যাসহ নওগাঁর বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত একাধিক হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। পরে তিনি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
পুলিশ সুপার আরও বলেন, গ্রেপ্তার আসামি মোরশেদ ছোট থেকেই চুরির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি ছোটখাটো চুরি করতেন। তার টার্গেট ছিল নারীরা। চুরির সময় নারীদের মাথায় একটা আঘাত করতেন। বাড়িতে পুরুষ থাকলেও তাকে কোনো ধরনের আঘাত করতেন না। তাকে সাইকো মনে হয়েছে। তিনি বিকৃত মস্তিষ্কের অধিকারী বলে মনে হচ্ছে । বাড়িতে মোটা অঙ্কের টাকাপয়সা থাকলেও সেগুলো নিতেন না৷ কিন্তু নারীদের মাথায় আঘাত করতেন। বিভিন্ন জেলায় অন্তত এমন ১৭-১৮ জনের ওপর হামলার তথ্য পাওয়া গেছে। নওগাঁ জেলায় দায়ের হওয়া চারটি মামলাসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মামলায়ও তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর প্রক্রিয়া চলছে। আদালতের মাধ্যমে তাকে জেল হাজতে প্রেরণ করা হবে।
মনিরুল ইসলাম শামীম/এএমকে
