রংপুর মহানগরীতে থানার ভেতরে এক স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করার অভিযোগে জড়িত থাকাসহ পেশাগত দায়িত্ব পালনে অবহেলা ও অপেশাদার আচরণের অপরাধে ১১ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি।
শুক্রবার (১২ জুন) বিকেলে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরপিএমপি) উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিবি) সনাতন চক্রবর্তী এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে, গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন ও সুপারিশের ভিত্তিতে ১১ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
বরখাস্ত হওয়া পুলিশ সদস্যরা হলেন- এসআই (নিরস্ত্র) মো. মাসুদ রানা, এসআই (নিরস্ত্র) মো. আলম বাদশাহ, এসআই (নিরস্ত্র) মো. আকতারুল ইসলাম, এএসআই (নিরস্ত্র) মো. মনিরুল ইসলাম, এএসআই (নিরস্ত্র) মো. আরিফুল ইসলাম, এএসআই (নিরস্ত্র) মোছা. মেহেরুন নেসা, কনস্টেবল মো. মোস্তাকুর রহমান খন্দকার, কনস্টেবল মো. মোখলেছুর রহমান মামুন, কনস্টেবল মো. রাকিব আহমেদ, কনস্টেবল লিমা সরেন ও কনস্টেবল ভাবনা রানী।
এর আগে, গত ৩ জুন (বুধবার) রাত সাড়ে ৯টার দিকে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কোতয়ালি থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকে মারধরের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ওইদিন রাতেই তিনজন এবং পরের দিন গণমাধ্যমের সমালোচনার মুখে থানার দায়িত্বে থাকা ওসিসহ আরও দুজনকে ক্লোজড করা হয়।
ক্লোজড হওয়া পুলিশ সদস্যরা হলেন- কোতয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আজাদ রহমান, কনস্টেবল লিমা সরেন, বাসুদেব, ডিউটি অফিসার মেহেরুন্নেসা ও সাব-ইন্সপেক্টর মাসুদ রানা।
একইসঙ্গে অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত হওয়াসহ প্রকৃত তথ্য উদঘাটনের লক্ষ্যে ঘটনার পরপরই অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (প্রশাসন ও অর্থ) নরেশ চাকমাকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন— ডিসি (ক্রাইম) মো. মাহফুজুর রহমান এবং কোতোয়ালি জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) সুকুমার রায়।
তদন্ত কমিটি অভিযোগ সংশ্লিষ্ট সকল নথিপত্র, সাক্ষ্য-প্রমাণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং কোতয়ালী থানায় সংরক্ষিত সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে বিস্তারিত অনুসন্ধান সম্পন্ন করে প্রতিবেদন দাখিল করে।
সেই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ভুক্তভোগী রাকিবুজ্জামান রাকিব, সিরাজুম মুনিরা ও রুমন বাবুর সাথে সংঘটিত ঘটনায় কয়েকজন পুলিশ সদস্যের কর্তব্য পালনে ইচ্ছাকৃত অবহেলা, অদক্ষতা, অপেশাদার আচরণ ও অসদাচরণের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। তদন্তে আরও প্রতীয়মান হয়, অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যদের আচরণের ফলে ভুক্তভোগীরা শারীরিক ও মানসিকভাবে হেনস্তার শিকার হয়েছেন এবং ঘটনাটি বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত হওয়ায় রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে।
এদিকে, অভিযোগসমূহ প্রাথমিকভাবে সত্য প্রমাণিত হওয়ায় পিআরবি’র ৮৮০ বিধি এবং সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ এর ধারা ৩৯(১) উপধারার বিধান অনুযায়ী ওই ১১ জন পুলিশ সদস্যকে বৃহস্পতিবার (১১ জুন) থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বরখাস্ত হওয়া পুলিশ সদস্যরা পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত থাকবেন এবং বিধি মোতাবেক খোরপোষ ভাতাদি প্রাপ্য হবেন।
এ ব্যাপারে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরপিএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, কোনো পুলিশ সদস্যের দায়িত্বে অবহেলা, অসদাচরণ বা আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে আরপিএমপি ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি অনুসরণ করে। ভবিষ্যতেও এ ধরনের অভিযোগের বিষয়ে যথাযথ তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় আইনানুগ ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত থাকবে।
প্রসঙ্গত, থানার ভিতরে মারধরের শিকার হওয়া ওই নেতার নাম রাকিবুল ইসলাম রাকিব। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের রংপুর সদর উপজেলা কমিটির সদস্য সচিব। ঘটনার পর তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
তার অভিযোগ ছিল, এক যুগলের পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে সালিশি বৈঠকে ডাক পেয়ে তিনি কোতোয়ালী থানায় গিয়েছিলেন। সেখানে ওই প্রেমিক যুগলকে আটকে রেখে মারধর করতে দেখে বাধা দিতে গেলে ওসি আজাদ রহমানের নেতৃত্বে কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাকে বেধড়ক মারধর করে রক্তাক্ত করেন। এ ঘটনার খবর পেয়ে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা থানার সামনে জড়ো তাকে
উদ্ধার করে।
ফরহাদুজ্জামান ফারুক/এসএইচএ
