নেত্রকোণায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) এক শিক্ষার্থীকে ‘জুলাই যোদ্ধা’ ট্যাগ দিয়ে হেনস্তা করার অভিযোগ উঠেছে। গত বুধবার (১০ জুন) রাত ৮টার দিকে নেত্রকোণা-পূর্বধলা সড়কের পূর্বধলা উপজেলার ত্রিমোহনী সিন্দুররাটিয়া শালদিঘা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ওইদিন রাত ১২টার পর বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ছড়িয়ে পড়া ২৩ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, শরীফ হোসেনকে বস্ত্রহীন করে বলানো হচ্ছে, ‘আমি একজন জুলাই যোদ্ধা, আমি আর জুলাই করতাম না। আমি আগে ভুল করছি ছাত্রদের পক্ষে থাইক্কা। জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু।’
হেনস্তার শিকার ওই শিক্ষার্থীর নাম মো. শরীফ হোসেন। তিনি নেত্রকোণার আটপাড়া উপজেলার শুনই এলাকার জানু মিয়ার ছেলে। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগী শরীফ হোসেন বাদী হয়ে পূর্বধলা থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পূর্বধলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী শরীফ হোসেন গত ৯ জুন বিকেলে নেত্রকোণা সদর থানার গদাইকান্দি এলাকায় তার বোন জামাই মো. উজ্জল খান (৪২) এর বাড়িতে বেড়াতে আসেন। পর দিন ১০ জুন সন্ধ্যায় ভিকটিম তার বোন জামাইয়ের বাড়ি থেকে নেত্রকোণা সদর থানাধীন নতুন বাইপাসের উদ্দেশ্যে সিএনজিযোগে রওয়ানা হন। ভুলবশত পূর্বধলা থানাধীন শালদিঘা এলাকায় অজ্ঞাত স্থানে নেমে যান।
পরবর্তীতে ভিকটিম হেঁটে ত্রিমোহনীর দিকে যাওয়ার সময় রাত আনুমানিক ৭টার দিকে শালদিঘা ঈদগাহ মাঠ সংলগ্ন নেত্রকোণা-পূর্বধলা চৌরাস্তামুখী পাকা রাস্তার উপর পৌঁছামাত্রই অজ্ঞাতনামা ২ জন ছিনতাইকারী ভিকটিমের পথরোধ করে।
ভিকটিমের কথাবার্তায় অন্য এলাকার বুঝতে পেরে ছিনতাইকারীরা চড় থাপ্পর ও কিলঘুষি দিয়ে তাকে মাদক কারবারি বলে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার ভয় দেখায়। তাদেরকে ২০ হাজার টাকা দিলে তারা ভিকটিমকে ছেড়ে দেবে বলে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে এবং মারপিট করতে থাকে। তখন ভিকটিম টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় ভিকটিমকে তাদের বড় ভাইয়ের কাছে নিয়ে যাবে বলে ঘটনাস্থল থেকে নির্জন একটি জায়গায় নিয়ে যায়।
সেখানে যাওয়ার পর অজ্ঞাতনামা আরও এক ছিনতাইকারী এলে তিনজন ছিনতাইকারী মিলে ভিকটিমকে হত্যার হুমকিসহ মারপিট শুরু করে তার প্যান্টের পকেটে থাকা নগদ ৪ হাজার ৫৬০ টাকা ছিনিয়ে নেয় এবং হত্যার ভয় দেখিয়ে আরও ২০ হাজার টাকা বিকাশে এনে দেওয়ার জন্য চাপ দেয়। তখন ভিকটিম ভয়ে তার এলাকার বিকাশের দোকান থেকে ফোন করে জরুরি ১০ হাজার টাকা এবং বিকাশ অফিস থেকে আরও ১৫০০ টাকা লোন নেয়। এরপর ২২ হাজার টাকা মূলের একটি মোবাইল ফোনও নিয়ে নেয় তারা।
এরপর মোবাইলের ফেইসবুক আইডি চেক করে জানতে পারে সে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তখন তারা ভিকটিমকে জুলাই যোদ্ধা, শিবির ও রাজাকারের বাচ্চা বলে পুনরায় মারধর করে এবং বিবস্ত্র করে তাদের হাতে থাকা মোবাইল ফোন দিয়ে ভিডিও করে ও ভিডিও কলে তাদের নেতাকর্মীদেরকে দেখিয়ে বলে ভাই একটা জুলাই যোদ্ধা পাইছি, তখন ভিডিও কলের ওপাশ থেকে বলে ভিকটিমকে যেন জীবিত না ছাড়ে। অজ্ঞাতনামা তিনজন ভিকটিমকে বিবস্ত্র অবস্থায় রেখে সে মাদক কারবারি, জুলাইযোদ্ধা, আগের শেখ হাসিনা সরকার ভালো ছিল বলে স্বীকার করিয়ে জয় বাংলা স্লোগান দিতে বাধ্য করে এবং ব্ল্যাকমেইল করার জন্য ভিকটিমকে বিবস্ত্র করে তাদের মোবাইলে ভিডিও ধারণ করে।
এরপর হুমকি দেওয়া হয়, যদি কোনো আইনি পদক্ষেপ নেয় তাহলে তাদের কাছে থাকা ভিডিওগুলো সোশ্যাল মিডিয়ায় ছেড়ে দেওয়া হবে। পরে ভিকটিমকে বিবস্ত্র অবস্থায় রেখে কাপড় চোপড় ফেলে চলে যায়।
ভিকটিমের ভাষ্যমতে, সে জুলাই যোদ্ধা না এবং কোন রাজনৈতিক সংগঠন বা ছাত্র রাজনৈতিক সংগঠনের সাথেও জড়িত না।
এ বিষয়ে জানতে ভুক্তভোগীর চাচি স্থানীয় শুনই ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মনোয়ারা বেগমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তার ভাতিজাকে মারধরের বিষয়টি সত্য। তবে কি কারণে তাকে এভাবে মারধর করা হয়েছে এটি এখনও তিনি জানেন না। বিষয়টি না জানার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভুক্তভোগী এখনও তার বোন জামাই এর বাড়িতে রয়েছে যার কারণে বিস্তারিত কিছু জানেনে না।
এ বিষয়ে পূর্বধলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন ঢাকা পোস্টকে বলেন, হেনস্তার শিকার হওয়া শিক্ষার্থী শরীফ হোসেন বাদী হয়ে গতকাল থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। এ বিষয়ে আমরা তদন্ত শুরু করেছি। আসামিদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে অভিযান চলমান রয়েছে।
চয়ন দেবনাথ মুন্না/এসএইচএ
