বিজ্ঞাপন

চিকিৎসককে মারধরের অভিযোগ

মায়ের মরদেহ ফেরত পেতে ‘কান ধরে ওঠবস’ করলেন ছেলে

মায়ের মরদেহ ফেরত পেতে ‘কান ধরে ওঠবস’ করলেন ছেলে

রোগীর মৃত্যু ঘিরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দিনভর চলে উত্তেজনা, বিক্ষোভ ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। চিকিৎসকদের সঙ্গে হাতাহাতির অভিযোগের পর মায়ের মরদেহ ফেরত পেতে মৃতের ছেলে রিফাত হোসেনকে কান ধরে ওঠবস করতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্বজনরা।

স্বজনরা বলছেন, অক্সিজেন না দেওয়ায় রোগী মারা গেছেন। এনিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। তবে চিকিৎসকদের অভিযোগ, রোগীর মৃত্যুর পর দুই চিকিৎসকের ওপর হামলা ও মারধর করেছেন রিফাত হোসেন।

এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দিনভর পাল্টাপাল্টি অভিযোগে উত্তপ্ত ছিল রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। হামলাকারীদের শাস্তির দাবিতে রোগীর মরদেহ আটকে রেখে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা বিক্ষোভ করেন। অন্যদিকে মরদেহ হস্তান্তরের দাবিতে রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়ক অবরোধ করে মৃতের স্বজনরা।

স্বজনদের অভিযোগ, ঘটনার পর নিজেদের অবহেলার অভিযোগ এড়াতে হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীরা মরদেহ আটকে রাখেন। শুধু তাই নয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা নানা অজুহাত আর দাবি তুলে মরদেহ হস্তান্তরে বিলম্ব করে। এক পর্যায়ে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মৃতের ছেলে রিফাত হোসেন উপস্থিত হলে তাকে কান ধরে ওঠবস করানোর পর তার মায়ের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

বিষয়টি নিয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানিয়ে রোগীর স্বজন ও ছেলেরা মরদেহ নিয়ে হাসপাতাল ছেড়ে যায়। এর কিছুক্ষণ পর ইন্টার্ন চিকিৎসকসহ হাসপাতালের অনেকেই রিফাত হোসেনের কান ধরে ওঠবস করার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করে, যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়।

শনিবার (১৩ জুন) দুপুর সোয়া ২টার দিকে হাসপাতালের পরিচালকের কার্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে। এর আগে বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কার্যক্রম বন্ধ ছিল।

রোগীর স্বজন ও হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, নগরীর জুম্মাপাড়া এলাকার নূর নাহার বেগমকে শনিবার ভোরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগে ভর্তি করা হয়। ভর্তির কিছু সময় পর তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় চিকিৎসকদের অবহেলার অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তার ছোট ছেলে রিফাত হোসেন। একপর্যায়ে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের সঙ্গে স্বজনদের কথা-কাটাকাটি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।

এ সময় ইন্টার্ন চিকিৎসক নাইম বকশী ও ইনডোর মেডিকেল অফিসার ডা. রাকিব হাসান মারধরের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনার প্রতিবাদে ইন্টার্ন চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামেন। একপর্যায়ে তারা হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কার্যক্রম বন্ধ করে দেন। ফলে বেলা ১১টা থেকে প্রায় আড়াই ঘণ্টা জরুরি বিভাগের চিকিৎসাসেবা বন্ধ থাকে। পরে বেলা দেড়টার পর কার্যক্রম পুনরায় চালু হয়। এ সময় অভিযুক্ত রিফাত হোসেনকে হাসপাতালে এনে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের কাছে ক্ষমা চাওয়ানোর দাবি জানান আন্দোলনকারীরা।

রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, নূর নাহার বেগমের মৃত্যুর পর তার মরদেহ হাসপাতালের আইসিইউতে রাখা হয় এবং পরিবারের সদস্যদের কাউকে দেখতে দেওয়া হয়নি। পরে মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে তুলে বাড়িতে নেওয়ার প্রস্তুতির সময় কয়েকজন ইন্টার্ন চিকিৎসক ও শিক্ষার্থী বাধা দেন। একপর্যায়ে অ্যাম্বুলেন্স থেকে মরদেহ নামিয়ে হাসপাতালের মর্গে নিয়ে রাখা হয় বলে অভিযোগ করেন তারা।

তবে মরদেহ আটকে রাখার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইন্টার্ন চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ আসিফ। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, চিকিৎসকদের মারধরের ঘটনায় জড়িতদের শাস্তির দাবিতে আমরা আন্দোলন করছি। তবে কোনো মরদেহ আটকে রাখা হয়নি।

পরে চিকিৎসক মারধরের ঘটনায় অভিযুক্ত রিফাত হোসেন হাসপাতালের পরিচালকের কার্যালয়ে অবস্থান করছেন—এমন খবর পেয়ে সেখানে জড়ো হন ইন্টার্ন চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা পরিচালক কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে রিফাত হোসেনকে প্রকাশ্যে কান ধরে ওঠবস করানোর দাবি জানান। পরবর্তীতে পরিচালকের কার্যালয়ের ভেতরে রিফাত হোসেনকে ১০ বার কান ধরে ওঠবস করানোর পর তার মায়ের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এদিকে মরদেহ হস্তান্তরের দাবিতে রোগীর স্বজনরা রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়ক অবরোধ করেন। এ সময় মৃতের ছেলে নুরুজ্জামান রিন্টু সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার মা ভোরে মারা গেছেন, অথচ এখন পর্যন্ত তার মুখটা দেখতে পারিনি। তারা লাশ অ্যাম্বুলেন্স থেকে নিয়ে মর্গে রেখেছে। আমরা বারবার ক্ষমা চেয়ে মরদেহ চেয়েছি, কিন্তু তারা দিচ্ছিল না।

দুপুর আড়াইটার দিকে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজে চিকিৎসকদের মারধরের ঘটনা দেখা গেছে। এটি অত্যন্ত অমানবিক ঘটনা।

মরদেহ আটকে রাখা এবং জরুরি বিভাগের কার্যক্রম বন্ধ রাখার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা কাম্য নয়। তবে অনেক সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে তোলার সময় সেখানে অতিরিক্ত মানুষের ভিড় ছিল। নিরাপত্তার স্বার্থে মরদেহটি মরচুয়ারিতে সরিয়ে রাখা হয়েছিল। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা অভিযোগ দাখিল করব, এজাহার দেব। অভিযুক্ত ছেলেকে পুলিশের দায়িত্বে দেওয়া হয়েছে।

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম নাজমুল কাদের বলেন, এ ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং রোগীর পরিবারের কারো কাছ থেকে এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি।

ফরহাদুজ্জামান ফারুক/আরকে

বিজ্ঞাপন