বিজ্ঞাপন

নরমাল ডেলিভারিতে ১০ হাজার শিশুর জন্ম নিলুফা বেগমের হাতে

নরমাল ডেলিভারিতে ১০ হাজার শিশুর জন্ম নিলুফা বেগমের হাতে

একজন মা যখন সন্তান জন্মদানের সময় সবচেয়ে বড় চাওয়া থাকে নিরাপদ প্রসব ও সুস্থ সন্তান। আধুনিক সময়ে যেখানে অধিকাংশ ডাক্তার ও রোগীর পরিবার সিজারিয়ান ডেলিভারির দিকে ঝুঁকছেন, সেখানে ব্যতিক্রমী এক নাম হয়ে উঠেছেন হুমাইয়ারা নিলুফা বেগম। দীর্ঘ ৩৬ বছরের কর্মজীবনে তিনি প্রায় ১০ হাজার প্রসূতি মায়ের সন্তান জন্মদান করিয়েছেন নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে।

হুমাইয়ারা নিলুফা বেগম একজন মানবিক সেবার প্রতীক। তিনি সরকারি চাকরিজীবনে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯০ সালের ১১ জানুয়ারি মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার আরোয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে প্রথম চাকরিতে যোগদান করেন। তারপর হরিরামপুর উপজেলার বাল্লা ইউনিয়ন, সিংগাইর উপজেলার জামশা ও শায়েস্তা ইউনিয়ন এবং সর্বশেষ মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার হাটিপাড়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে দীর্ঘ ২৬ বছর দায়িত্ব পালন করেন এবং পরে ২০২৩ সালে অবসরে যান।

জানা যায়, আরজুমান্দ হুমাইয়ারা নিলুফা বেগম ৮ অক্টোবর ১৯৬৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৮৮ সালের ১৫ ডিসেম্বর মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার বাঠুইমুড়ি গ্রামের ডা. পান্নু মিয়ার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

তিনি অসংখ্য প্রসূতি মাকে নিরাপদ মাতৃত্বের সেবা দিয়েছেন। তার চাকরি জীবনে তিনি পুরো সময়জুড়েই বিনামূল্যে নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে সন্তান প্রসব করাতে কাজ করেছেন। তার দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও মানবিক সেবার কারণে হাজারো পরিবার তাকে বিশ্বাস ও আস্থার জায়গা হিসেবে দেখেছে।

তার স্বামী পান্নু মিয়া ছিলেন উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (SACMO)। দুই বছর আগে স্বামীর মৃত্যুর পর তার শেষ ইচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দিতে তিনি নিজ এলাকায় প্রতিষ্ঠা করেন হাটিপাড়া ১০ শয্যা বিশিষ্ট হাটিপাড়া সেবা সদন হাসপাতাল। বর্তমানে এই হাসপাতালেই তিনি গ্রামের সাধারণ মানুষের জন্য স্বল্প খরচে নরমাল ডেলিভারির সেবা দিয়ে থাকেন। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন তার কাছে সন্তান প্রসব করাতে।

হুমাইয়ারা নিলুফা বেগম মিডওয়াইফারি ও মেনস্ট্রুয়াল রেগুলেশন (MR) বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তার অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার কারণে হাসপাতালে সবসময় রোগীদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৩৫ জন প্রসূতির সফল নরমাল ডেলিভারি সম্পন্ন করেন তিনি।

সন্তান জন্মদান শুধু চিকিৎসা নয়, এটি আস্থা, সাহস ও মানবিকতার বিষয়। আর সেই আস্থার নাম হয়ে বহু বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছেন হুমাইয়ারা নিলুফা বেগম। যিনি হাজারো মায়ের মুখে হাসি ফুটিয়েছেন, নতুন প্রাণকে নিরাপদ আগমনের পথ দেখিয়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা রফিজা আক্তার বলেন, আমার মেয়ের জন্মও হুমাইয়ারা ভাবির হাতে নরমাল ডেলিভারিতে হয়েছিল। আজ আমি আবার আমার মেয়ের ডেলিভারি করাতে এসেছি। তিনি খুব যত্ন নিয়ে ব্যথামুক্তভাবে ডেলিভারি করান। আমরা তার ওপর ভরসা পাই।

সদ্য ভূমিষ্ট এক পুত্র সন্তানের মা বলেন, ওনার ওপর ভরসা পাই। এই হাসপাতালের খোঁজ পেয়ে এখানেই চেকআপ করিয়েছি নিয়মিত। কালকে এখানে ভর্তি হয়েছি আজ আমার পুত্র সন্তান হয়েছে। আমরা দুইজনেই সুস্থ আছি।

বালিরটেক গ্রামের খাদিজা বেগম বলেন, আমার নাতনি নিয়ে আসছি। এখানে কাটা ছেড়া করা লাগে না, ব্যাথা ছাড়াই ডেলিভারি হয়। এখানে খুব সুন্দরভাবে নরমাল ডেলিভারি করে। বাইরে সিজার করতে গেলে অনেক সমস্যা হয়, ভয় থাকে। এজন্য এই হাসপাতালে ভরসা পাই আমরা।

নিলুফা বেগমের ছেলে ডা. হিফজুল আল মঈন বলেন, অত্র এলাকায় কোনো হাসপাতাল নেই। আমার আব্বুর ইচ্ছাতেই মা এর সঙ্গে এই হাসপাতাল পরিচালনা করছি। আমাদের উদ্দেশ্য একটাই মা ও শিশুদের মৃত্যু হার কমানো এবং গ্রামের মানুষের পাশে থেকে সঠিক চিকিৎসা দেওয়া।

হুমাইয়ারা নিলুফা বেগম বলেন, শিশু ও তার মায়েদের মৃত্যুহার কমাতে আমি নরমাল ডেলিভারি করতে শুরু করি। পরবর্তীতে সরকার থেকে আমাকে এই বিষয়ে বিশেষ ট্রেনিংয়ের সুযোগ করে দেন। আমি ৩৬ বছরে প্রায় ১০ হাজার বাচ্ছা প্রসব করিয়েছি। সরকারি চাকরি থেকে অবসরের পর স্বামীর শেষ ইচ্ছে অনুযায়ী আমি আর আমার ছেলে মিলে এই হাসপাতাল পরিচালনা করছি। খুবই স্বল্প মূল্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ডেলিভারি করে থাকি আমরা। আমরা চাই গ্রামের মানুষ যেন সচেতন থাকে। মা ও শিশুর মৃত্যু ঝুঁকি না থাকে এবং গ্রামের মানুষ যেন সুচিকিৎসা পায়।

আটিগ্রাম ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (SACMO) মো. শাহিনুর ইসলাম বলেন, আমি হাটিপাড়া স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হুমাইয়ারা নিলুফা বেগমের সঙ্গে প্রায় ৩ বছর কাজ করেছি। তখন দেখেছি প্রচুর নরমাল ডেলিভারি হতো সেখানে। সে খুব অভিজ্ঞ ও রোগীদের প্রতি যত্নশীল, এজন্যই মানুষ তার ওপর অন্য রকমভাবে বিশ্বাস রেখেছে। অন্য কোনো পরিদর্শিকার সময়ে এত নরমাল ডেলিভারি দেখিনি। আমি যতটুকু শুনেছি উনি এর আগে যেখানেই ছিলেন সেখানেও নরমাল ডেলিভারির জন্য মানুষ তার কাছে ছুটে যেত। 

মানিকগঞ্জ জেলার সিভিল সার্জন আইভী ফেরদৌস ঢাকা পোস্টকে বলেন, সরকার থেকে নরমাল ডেলিভারির জন্য সবাইকে সচেতন করা হচ্ছে।  যারা নরমাল ডেলিভারিতে অভিজ্ঞ বা বেশি বেশি নরমাল ডেলিভারি করিয়ে থাকেন তাদের আমরা পুরস্কৃত করে থাকি।

আরকে

বিজ্ঞাপন