কপোতাক্ষ এক্সপ্রেস ট্রেনের পেছনের অতিরিক্ত লোকো (ইঞ্জিন) খুলে গিয়ে ধাক্কা লেগে পাজরের ছয়টি হার ভেঙে গেছে ওয়েম্যান জাহিদ হোসেনের। কর্তব্যরত অবস্থায় জাহিদ আহত হলেও তার চিকিৎসা চলছে নিজ খরচে। ফলে অর্থিক সংকটে চিকিৎসা চালিয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছে পরিবারটি।
বর্তমানে জাহিদ আহত অবস্থায় তার শ্বশুরবাড়ি রাজশাহীর পবা উপজেলার শ্যামপুর রয়েছেন। শুক্রবার (১৩ জুন) সন্ধ্যায় সেখানে গিয়ে দেখা গেছে, তিনি শয্যাশায়ী। বুকের ব্যাথার কারণে উঠে বসতে পারছেন না।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, জাহিদের শরীরের ছয়টি হাড় ভেঙে গেছে। ফুসফুসে রক্তক্ষরণসহ নানা জটিলতা দেখা দিয়েছে। এখন পর্যন্ত চিকিৎসার যাবতীয় ব্যয় পরিবার ব্যক্তিগতভাবে বহন করছে। রেল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো আর্থিক সহায়তা পাওয়া যায়নি। চিকিৎসায় তাদের ৩০ হাজারের বেশি টাকা খরচ হয়ে গেছে। যদিও কিছু দাপ্তরিক নথিপত্রে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে, তবে পরিবারটি এখনো জাহিদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার খরচ ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছে। তারা জাহিদের সুস্থতার জন্য কর্তৃপক্ষের সরাসরি হস্তক্ষেপ, বেতনসহ ছুটি এবং পরবর্তীতে তাকে অপেক্ষাকৃত সহজ কোনো অফিস পদে পদায়নের দাবি জানিয়েছেন।
জাহিদ কর্মরত অবস্থায় দুর্ঘটনায় পতিত হলেও এখন পর্যন্ত রেল কর্তৃপক্ষ বা সরকার থেকে কোনো আর্থিক সাহায্য পাওয়া যায়নি। তবে সম্প্রতি জিএম স্যারের অনুমতিতে কল্যাণ ট্রাস্টের আবেদনের জন্য তার সই এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। জাহিদের বাবা (রেলওয়ের সাবেক চিফ অফিসার টলিম্যান ছিলেন) চিকিৎসার খরচের নথিপত্রগুলো রেলওয়ে অফিসে জমা দিয়েছেন। জাহিদের পরিবারের আশা- রেল কর্তৃপক্ষ তার আগামী দিনের চিকিৎসার দায়িত্ব নেবে এবং সুস্থ হওয়ার পর তাকে কোনো অফিসে কাজ করার সুযোগ করে দেবে।
জাহিদের পরিবারের দাবি, দুর্ঘটনাটি যেহেতু ‘অন ডিউটি’ বা কর্মরত অবস্থায় হয়েছে, তাই প্রথম দিন থেকেই রেল কর্তৃপক্ষের চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়া উচিত ছিল। বর্তমানে তারা প্রত্যাশা করছেন যে, আগামীতে জাহিদের যে উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন (যেমন- অর্থোপেডিক ও হার্টের ডাক্তার দেখানো), সেই সব চিকিৎসার যাবতীয় খরচ যেন রেল কর্তৃপক্ষ বহন করে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জাহিদকে আগামী ছয় মাস পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে হবে। পরিবার আশা করছে এই ছয় মাস যেন তাকে ছুটি দেওয়া হয় এবং তার নিয়মিত বেতন বা আর্থিক সুবিধাগুলো বজায় রাখা হয়।
জাহিদের শারীরিক অবস্থা এখন এমন যে, তিনি আগের মতো ‘ওয়েম্যান’ হিসেবে পরিশ্রমসাধ্য কাজ করতে পারবেন না। তাই পরিবার থেকে বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে যেন সুস্থ হওয়ার পর তাকে রেলওয়ের কোনো অফিসে কাজ করার (অফিসিয়াল পোস্ট) ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়।
এর আগে গত ৩ জুন (বুধবার) দুপুর ১টা ১০মিনিটে রাজশাহী নগরীর নতুন বুধপাড়া রেলক্রসিং এলাকায় রাজশাহী-খুলনা রুটে চলাচলকারী কপোতাক্ষ এক্সপ্রেসের পেছনে ঈশ্বরদী থেকে একটি অতিরিক্ত ইঞ্জিন রাজশাহীতে আনার সময় ছুটে গিয়ে আহত হন ওয়েম্যান জাহিদ।
ছুটি যাওয়া লোকোতে (ইঞ্জিন) থাকা একজন লোকো মাস্টার (ইঞ্জিন চালক) বলেছিলেন, পবা উপজেলার ভরোয়াপাড়া এলাকায় ট্রেনের পেছন থেকে ইঞ্জিনটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ট্রেনটি দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাওয়ায় বিচ্ছিন্ন ইঞ্জিনটি পেছনে পেছনে আসতে থাকে এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) চারুকলা এলাকায় থামে। আর লোকো কপোতাক্ষ এক্সপ্রেস রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছে যায়। পরে ইঞ্জিনে থাকা লোকো মাস্টার ইঞ্জিনটি চালু করে স্টেশনে নিয়ে যান।
গ্যাং-৬-এর ওয়েম্যান সেকেন্দার আলী বলেন, জাহিদ বাড়িতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাকে আর্থিকভাবে সহায়তার জন্য আমরা (ওয়েম্যান) টাকা তুলছি। আর কল্যাণ ট্রাস্ট থেকে তাকে টাকা দেওয়ার জন্য আবেদন করা হয়েছে।
কীভাবে এমন ঘটনা ঘটলো- এমন কথার উত্তরে আহত জাহিদ বলেন, আমাদের এই লাইনে সাধারণত একটি ট্রেন গেলে কমপক্ষে ২০ মিনিট কোনো ট্রেন থাকে না। কপোতাক্ষ এক্সপ্রেস ট্রেনটি যাওয়ার পরপরই নীরবে ইঞ্জিনটি চলে আসে। আমি কিছু বুঝে উঠার আগেই আমার ধাক্কা লাগে। আল্লাহ বাঁচিয়ে দিয়েছেন। আমার শারীরিক অবস্থা ভালো না। কাশি দিলে রক্ত আসছে। বাম হাত নড়াতে পারছি না। কারও সাহায্য ছাড়া উঠার ক্ষমতা নেই আমার।
আহত জাহিদের স্ত্রী মোছা. ময়ূরী খাতুন বলেন, ওর (স্বামী) অবস্থা খুব একটা ভালো না। ট্রিটমেন্ট চলছে, ১৫ দিনের ওষুধ খেয়ে আবার যেতে বলেছে। এখনো মুখ দিয়ে কাশির সঙ্গে ব্লাড আসছে। উনার চিকিৎসা আমাদের নিজেদের খরচে চলছে। আমাদের রেল থেকে এখন পর্যন্ত কোনো টাকা দেয়নি। সবকিছু নিয়েছে কিছু কাগজ পত্রজমা নিয়েছে। জিএম স্যার হাসপাতালে গিয়ে দেখে এসেছেন। কল্যাণ ট্রাস্টের আবেদনের জন্য ডকুমেন্ট দেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৩০ হাজারের বেশি টাকা খরচ হয়ে গেছে।
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে রাজশাহীর পিডব্লিউ (পার্মানেন্ট ওয়ে) মো. বাকিতুল্লাহ বলেন, দুর্ঘটনায় ওই ব্যক্তির বুকের ছয়টি হাড় ভেঙে গেছে। রামেক হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে বাসায় গেছে। রেলওয়ের সহকর্মীরা ব্যক্তিগতভাবে সাহায্যের পাশাপাশি কল্যাণ ট্রাস্ট নামক বিশেষ তহবিল থেকে তার জন্য আর্থিক সহায়তার চেষ্টা করা হচ্ছে।
শাহিনুল আশিক/আরএআর
