বিজ্ঞাপন

নদী খননের মাটিতে চাপা পড়েছে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর, স্বপ্ন ভাঙছে গৃহহীনদের

নদী খননের মাটিতে চাপা পড়েছে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর, স্বপ্ন ভাঙছে গৃহহীনদের

নদী খননের মাটিতে চাপা পড়েছে খুলনার ডুমুরিয়ার তিনটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের অসংখ্য ঘর। এতে স্বপ্ন ভাঙছে গৃহহীনদের। নদী খনন করতে গিয়ে যত্রতত্র মাটি ফেলার কারণে কোথাও ঘরগুলোর ওপর আস্ত মাটির পাহাড় তুলে দেওয়া হয়েছে, আবার অপরিকল্পিতভাবে ড্রেজিংয়ের কারণে নদীগর্ভে ধসে পড়ার হুমকিতে পড়েছে প্রকল্পের বহু ঘর। নষ্ট হয়েছে বেশকিছু টিউবওয়েল, ভেঙেছে টয়লেট। উপজেলার  চুকনগর, কাঁঠালতলা এবং খর্নিয়া এলাকার সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্প লাগোয়া ভদ্রা নদী খননের কাজ শুরু হওয়ায় বিপাকে পড়েছে এখানকার বসবাসকারীরা।  

ভুক্তভোগীরা জানান, নদী থেকে তোলা পলিমাটির প্রচণ্ড চাপে তার ঘরের পেছনের দেয়াল ও জানালা ভেঙে ভেতরে কাদা ঢুকে গেছে। নদী খননের মাটি যেভাবে ঘরের গা ঘেঁষে স্তূপ করে রাখা হয়েছে, তাতে যেকোনো মুহূর্তে পুরো ঘর ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রচণ্ড গরমে একদিকে যেমন ঘরে থাকার উপায় নেই, অন্যদিকে মাটির ভারে ঘরের দেয়াল ও মেঝেতে ফাটল ধরেছে। তাদের খাবার রান্না করার জায়গা নেই। শিশুদের নিয়ে ঘুমানোর নিরাপদ আশ্রয় নেই।

তারা আরও জানান, এই নদী খনন কর্মসূচিতে কাঠালতলা আশ্রয়ণ প্রকল্পের মানুষদের খাবার পানির জন্য তিনটি টিউবওয়েল এর মধ্যে দুটিই ইতোমধ্যে নষ্ট হয়েছে। বেশিরভাগ ঘরের মানুষদের টয়লেট ভেঙে দেওয়া হয়েছে খননের সময়ই। খর্নিয়া ও কাঠালতলা এলাকার বেশ কয়েকটি পরিবারের মানুষ তাদের ঘরের খাট, হাঁড়ি-পাতিলসহ যৎসামান্য আসবাবপত্র আছে তাও বাইরে বের করে খোলা আকাশের নিচে এনে রেখে প্রহর গুনছেন কখন তার শেষ সম্বলটুকু ভেঙে পড়বে।

খর্নিয়া এলাকার দিনমজুর আব্দুল জলিল বলেন, নদী কাটার সময় মেশিন দিয়ে ঘরের একদম গোড়া পর্যন্ত গর্ত করা হয়েছে। একটু বৃষ্টি হলেই ঘরগুলো নদীতে ধসে পড়বে। আমরা গরিব মানুষ, আমাদের তো আর যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। বাথরুম সব ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তিনটি পানি খাওয়ার কল ছিল, নষ্ট হয়ে গিয়েছে ২টি। এখন ২৬ পরিবারের একমাত্র ভরসা একটি টিউবওয়েল।

গৃহবধূ রওশন আরা বেগম বলেন, জোয়ার আসলে ঘর বিলীন হয়ে যাবে সেই আশঙ্কা রয়েছে। আমরা চাই এখানে ভালোভাবে যেন বসবাস করতে পারি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্প-২ এর আওতায় ২০২১ সালের ২৩ জানুয়ারি ও ২০ জুন এবং ২২ সালে তিনটি ধাপে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর, খর্নিয়া এবং কাঠালতলা এলাকায় শতাধিক ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারগুলোকে পুনর্বাসন করে তৎকালীন সরকার। চুকনগর, খর্নিয়া এবং কাঁঠালতলা এলাকায় খাস জমি চিহ্নিত করে দুই কক্ষবিশিষ্ট সেমি-পাকা ঘরগুলো নির্মাণ করা হয়। জমিসহ ঘরের দলিল হস্তান্তরের দিন এই মানুষগুলোর চোখে ছিল আনন্দের জল। যারা একসময় রেললাইনের ধারে বা অন্যের বারান্দায় রাত কাটাতেন, তারা পেয়েছিলেন একটি স্থায়ী ঠিকানা। যশোর ও খুলনার ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনে আপার ভদ্রাসহ ৫টি নদীর (হরিহর, হরি-তেলিগাতী, আপারভদ্রা, টেকা ও শ্রী) ৮১.৫ কিলোমিটার পুনঃখনন কাজ দেয় সরকার। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এবং সেনাবাহিনীর মধ্যে নদী খননের এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয় ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড মাধ্যমে বাস্তবায়িত হওয়ায় এই নদী খনন শুরু হয়।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড বাস্তবায়ন করছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এবং সেনাবাহিনীর মধ্যে নদী খননের এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয় ২০২৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় যশোর ও খুলনা এলাকার হরিহর নদী ৩৫ কিলোমিটার, হরি-তেলিগাতি নদী ২০ কিলোমিটার, আপারভদ্রা নদী ১৮.৫ কিলোমিটার, টেকা নদী ৭ কিলোমিটার ও শ্রী নদী ১ কিলোমিটারসহ মোট ৫টি নদীর ৮১.৫ কিলোমিটার পুনঃখনন করা হবে। এ জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৩ হাজার ৯৯৮ দশমিক ১৯ লাখ টাকা। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী সেনাবাহিনী ‘অর্পিত ক্রয়কার্য’ পদ্ধতিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। নদী খননের পাশাপাশি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়ন, ড্রেজড মাটি সংরক্ষণ ও স্থানীয় জনগণের চলাচলের রাস্তা হিসেবে ব্যবহারযোগ্য করা হবে। পরিবেশবান্ধব পুনঃখনন নিশ্চিত করতে টার্ফিং ও বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমও হাতে নেওয়া হবে। ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়।

চলতি বছর জানুয়ারিতে ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর বাজার সংলগ্ন এলাকায় নদী খননে ভেঙে ফেলা হয় ৮০ পরিবারের শেষ আশ্রয় স্থল। বিপাকে পড়ে কাঠালতলা ২৬টি পরিবার এবং খর্নিয়া উপজেলার আরও ২৫ পরিবার।

এ বিষয়ে ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবিতা সরকার বলেন, ডুমুরিয়ার বরাতিয়ার কাঠালতলা ও খর্নিয়ার গৃহহীন পরিবারের ঘরগুলোতে নদী খননের মাটি উঠে গেছে এই ঘটনা সত্য। এই নদী খনন প্রকল্প  যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং সোনাবাহিনীর তত্ত্বাবধায়নে পরিচালিত হচ্ছে। আমি ইতোমধ্যে যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর সাথে কথা বলেছি। তারা বিষয়টি অবগত। খুব তাড়াতাড়ি ভূমিহীন এসব পরিবারের জন্য তারা ব্যবস্থা নেবেন। এছাড়া চুকনগরের যে পরিবারগুলো ছিল, তারা ওই পাশের হাটের জায়গায় বসবাস করছে। কিছুদিন আগে কয়েকটি পরিবারকে অন্য আশ্রয়ণ প্রকল্পে সরিয়ে নেওয়ার জন্য প্রস্তাব দেওয়া হলেও তারা সেখানে যাননি। বিষয়টি জেলা প্রশাসক স্যারকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।    

মোহাম্মদ মিলন/এসএইচএ