ভিন্নরকম স্বাদের কারণে ভোক্তাপ্রিয় রংপুরের জিআই পণ্যখ্যাত ‘হাঁড়িভাঙা’ আম বাজারে আসতে শুরু করেছে। প্রতি বছর এই আম জুনের ২০ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে বাজারজাত শুরু হলেও এবার তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে গাছ থেকে আগাম আম পাড়তে শুরু করেছেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা। তবে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে আজ সোমবার (১৫ জুন) আনুষ্ঠানিকভাবে বাজারে আসছে হাঁড়িভাঙা আম।
এদিকে যে হাট ঘিরে হাঁড়িভাঙার বিকিকিনি হয়, সেই হাট এলাকার ব্যবসায়ী ও আম চাষিদের মধ্যে অস্বস্তির শেষ নেই। একদিকে ফলন কম অন্যদিকে হাঁড়িভাঙার রাজধানীখ্যাত পদাগঞ্জ হাটের বেহাল দশা। বাইপাস সড়কগুলোও কর্দমাক্ত অবস্থায় দুর্ভোগের শেষ নেই। পাশাপাশি কাগজে-কলমে জিআইপণ্যের স্বীকৃতি পাওয়া এই আমের ন্যায্য দাম পাওয়া নিয়ে শঙ্কা কাটছে না চাষিদের। তারপরও বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের থাবায় না পড়লে এই হাট থেকেই এবার ৩০০ কোটি টাকার আম বেচাবিক্রির আশা করছে কৃষি বিভাগ।
হাটে হাঁটা দায়, দুর্ভোগে বছর যায়
সরেজমিনে দেখা গেছে, জিআইপণ্যের স্বীকৃতি পাওয়া হাঁড়িভাঙার রাজধানী মিঠাপুকুরের পদাগঞ্জ বাজারের প্রবেশমুখ সব সময়ই থাকে কর্দমাক্ত। বৃষ্টি এলেই কাঁদাজলে একাকার। বেচাবিক্রির কোন পরিবেশ থাকে না। হাটের মাঠ ছাপিয়ে প্রধান সড়কটির প্রায় দেড় কিলোমিটার জুড়ে হয় বেচাবিক্রি। ড্রেন না থাকায় দুইধারের বেচাবিক্রিতে কাঁদাময় হয়ে উঠে হাঁড়িভাঙার এ হাট।
সকাল থেকেই পদাগঞ্জের হাটে অটোরিকশা, ভ্যান ও পিকআপে করে আসতে থাকে ক্যারেট ক্যারেট আম। অনেককেই হাটের রাস্তায় সাইকেল ও ভ্যানে ক্যারেট আম নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আম বেচতে দেখা গেছে। ক্রেতাদের সরব উপস্থিতিতে জমজমাট হয়ে উঠেছে আমের বেচাকেনা। হাটের পাশে একটি গুদাম ঘর থেকে আম ট্রাকে লোড করতে দেখা যায়। এর আশপাশে অনেক ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের জটলা ছিল। আবার কেউ কেউ সরাসরি বাগান থেকেই আম পেরে বিভিন্ন এলাকায় পাঠাচ্ছেন।
হাটটিতে কথা হয় খুচরা, পাইকারি, অনলাইন ব্যবসায়ী, আম চাষি ও লিজ চাষিদের সঙ্গে। তারা তুলে ধরেন হাট এবং আশপাশের রাস্তাঘাটের করুণ পরিণতির কথা।
অনলাইন ব্যবসায়ী কামরুজ্জামান বলেন, আমি অনলাইনে হাঁড়িভাঙা আম সারাদেশে ডেলিভারি দিয়ে থাকি। কিন্তু হাটে আসার প্রধান সড়ক নজিরেরহাট থেকে পদাগঞ্জ সড়কের বেহাল অবস্থা কারণে আমাদেরকে ঘুরে আসতে হয় ১০ কিলোমিটার। আবার হাটে এসে কাঁদাপানি তো আছেই। যেন হাটে হাঁটা দায়, এভাবেই দুর্ভোগে বছরের পর বছর পার হয়। হাটের কোনো উন্নয়ন হয়নি, এখানে ব্যবসা করা কষ্টকর।
স্থানীয় আমচাষি আমিনুল ইসলাম বলেন, একটু বৃষ্টি হলেই আম নিয়ে আসতে কষ্ট হয়। হাটের প্রবেশ মুখেই হাঁটু কাঁদা। যেসব রাস্তা দিয়ে আম আনা সেগুলোও ভালো না। চরম ভোগান্তি করে বেচাবিক্রি করতে হয়। ড্রেনেজ ব্যবস্থা থাকলে এই দুর্ভোগ লাঘব হতো। প্রতিবছরই প্রশাসন শুধু আশ্বাস দেন কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
হাটের প্রবেশ মুখে আরেক চাষি সাজ্জাদ মণ্ডল ভ্যান নিয়ে কাঁদায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি বলেন, অসুবিধা মানে অনেক অসুবিধা। যদি ড্রেন থাকতো তাহলে ভালো হতো। এমনিতেই আমের দাম কম। কাঁদার কারণে আরো কম দামে আম বিক্রি করা লাগে। এখন উপায় তো নাই।

দেদারছে টোল আদায়, নেই হাট উন্নয়ন
দেখা গেছে, হাটে দেদারছে আমের টোল আদায় করা হচ্ছে। কাউকেই ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। আমের মৌসুমে ইজারাদারদের টোল দিতে হয় আরও বেশি। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকারি এবং অনলাইন ব্যবসায়ীরা আসেন। লাখ লাখ টাকা সরকারের রাজস্ব ফান্ডে গেলেও উন্নয়ন হয় না হাটটির। এতে ক্ষুব্ধ সবাই।
ছামিউল ইসলাম নামের এক আমচাষি জানালেন, মাল নিয়ে আসলে বৃষ্টিতে-কাঁদায় অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। আমরা তো নিয়মিত টোল দেই। প্রতি বছর ডিসি, ইউএনও, চেয়ারম্যান সাহেব ও হাট ইজারাদার আশ্বস্ত করে উন্নয়ন হবে। কিন্তু কাজ হয় না। ওনারা আসেন আশ্বস্ত করে চলে যান। কিন্তু অসুবিধা আগের মতোই থাকে। কারা এই হাটের উন্নয়ন করবে আমরা বুঝি না।
ঢাকা থেকে আসা মোহাম্মদ আবু হাসান নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, এই হাট থেকে শত শত কোটি টাকার হাঁড়িভাঙা আম বেচাবিক্রি হয়। আমার মতো শত শত পাইকার এখানে আসেন। কিন্তু হাটটির কোন উন্নতি হলো না। অথচ আমরা অনেক সময় তিনডাবল টোল দিচ্ছি। এক মণ আম কিনলে ৪টা আম তারা টোল হিসেবে নিচ্ছে। কিন্তু ইজাদারেরা কোনো ব্যবস্থা নেয় না।
অনলাইন ব্যবসায়ী জেসমিন আখতার বলেন, আমি প্রতিবছর এই হাট থেকে ১০০ টনেরও বেশি আম অনলাইনে সরবরাহ করি। কিন্তু হাটে কেনাবেচার কোনো পরিবেশ নেই। কাঁদামাটি দিয়ে একাকার। হাটের অবস্থা অনেক খারাপ। গাড়ি চলাচলে অনেক সমস্যা। ইজারাও বেশি দেওয়া হয়। এত টোল দেওয়ার পরও আমরা ব্যবসায়ীরা সুবিধা পাচ্ছি না।
আমচাষি সাগর মিয়া বলেন, হাটের কোনো উন্নতি নেই। রাস্তা, প্রবেশ মুখ সবখানে কাঁদা। হাটের ভেতরের পশ্চিম পাশে পানিতে ভরা। প্রত্যেক বছর সবাই আশ্বাস দেয় কিন্তু কাজ করে না। প্রশাসন কেন হাটটির ব্যাপারে নজর দেয় না, বুঝি না। ইজারাদাররা তো আম আর টাকা তোলা নিয়ে ব্যস্ত থাকে।
লিজ চাষি ফখরুল ইসলাম বলেন, শত শত কোটি কোটি টাকার হাড়িভাঙ্গা আম বেচাবিক্রি হয় পদাগঞ্জ হাট থেকে। এখানে একটা শেড নেই। বাথরুমের ব্যবস্থা নেই। বছরের পর বছর অসুবিধার মধ্যেই স্থানীয় ও বাইরের ব্যবসায়ীরা এখান থেকে আম কিনছেন।

ইউএনও-চেয়ারম্যানের দিকে অভিযোগের তীর
হাটের ইজারাদাররা দোষ চাপিয়েছেন ইউএনও ও চেয়ারম্যানের ওপর। এবার ৫৬ লাখ টাকায় ডাক হয়েছে এটি। পার্টনারশিপে ১৬ জন হাটটি ডেকে নিয়েছেন। তাদের একজন মানিক মিয়া।
তিনি আরও জানান, রাস্তার দুইধারে ড্রেন এবং হাটে রাবিশ ও ইট ফেলানোর জন্য আমরা লিখিত আবেদন করেছি চেয়ারম্যান ও ইউএনও’র কাছে। কিন্তু তারা কোনো ভ্রুক্ষেপ নেয় না। আমরা তাদের কাছে একাধিকবার গেছি। তারা কথা শোনে না। আমরা নিজেরা যতটুকু পারি কোনোমতে মাটি দিয়ে হাটটা চালু রেখেছি। ব্যবসায়ী ও চাষিরা সামান্য বৃষ্টি হলেই চরম অসুবিধায় পড়েন।
এ ব্যাপারে মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. পারভেজ বলেন, পদাগঞ্জ হাটটির উন্নয়নের সব দায়িত্ব চেয়ারম্যানের। এজন্য চেয়ারম্যানকে বরাদ্দ দেওয়া হয়। তিনি কেন এ ব্যপারে উদাসীন জানি না। দ্রুত হাটটির সংস্কার ও অবকাঠামো নির্মাণ জরুরি।
আমে ছত্রাকনাশক কীটনাশক স্প্রেতে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
ক্রেতাদের অভিযোগ, বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু হওয়ায় কীটনাশকের ব্যবহার বেড়েছে। অথচ কোনো কোনো বাগানে এখনও সম্পূর্ণ পরিপক্ব হয়নি হাঁড়িভাঙা আম। নির্ধারিত সময়ের আগেই কেউ কেউ কৃত্রিমভাবে আম পাকিয়ে বাজারজাত করায় বাড়ছে স্বাস্থ্য ঝুঁকি। গাছ থেকে আম সংগ্রহের ৮-১০ দিন আগে অনেকে ছত্রাকনাশক কীটনাশক স্প্রে করেন।
চাষিরা বলছেন, হাঁড়িভাঙা আম পাকলে এটি তিন-চার দিনের বেশি রাখা যায় না। সংরক্ষণের কোনো কার্যকর পদ্ধতিও জানা নেই তাদের। যদি এই আম সংরক্ষণের সঠিক প্রক্রিয়া থাকত, তাহলে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে প্রচুর পরিমাণে রপ্তানি করা সম্ভব হতো। হাঁড়িভাঙা আম সংরক্ষণের জন্য এ অঞ্চলে একটি বিশেষায়িত হিমাগারের দাবি জানান তারা।
পদাগঞ্জ হাটে আম কিনতে আসা শাফিউল ইসলাম জানান, জিআইপণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে হাঁড়িভাঙা। কিন্তু এটার রপ্তানির আলোচনা আমরা শুনি না। বাজার ব্যবস্থাপনাও খুব নাজুক। সরকারের উচিত দ্রুত ঐতিহ্যবাহি এ আমের রপ্তানির মাধ্যমে চাষিদের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, সরকারি উদ্যোগে আনুষ্ঠানিকভাবে আজ (১৫ জুন) থেকে আম বাজারজাত শুরু হয়েছে। কিন্তু এই আম পরিপক্ব না হতেই এক সপ্তাহ আগে থেকে অনেকেই বাড়তি লাভের আশায় বাগান থেকে পেরে বিভিন্ন এলাকায় পাঠাচ্ছেন।
পাইকারি ব্যবসায়ী আনারুল ইসলামের ভাষ্য, বাগানে আম পরিপক্ক হয়েছে। বাগান মালিকরা তাকে ডেকে আম বিক্রির কথা বলেন। তাই এক সপ্তাহ আগ থেকেই তাদের কাছ থেকে তিনি আম কিনে বিক্রি শুরু করছেন।

আমের ফলন কম, নেই সেই চেনা রং
একদিকে হাটের এমন দশায় বাজারজাতে অন্তহীন সমস্যা। অন্যদিকে এপ্রিলের শেষ দিকে শিলাবৃষ্টিতে ঝরে পড়েছে ৩০-৩৫ ভাগ হাঁড়িভাঙা আম। বৃষ্টিতে আমের রং নষ্ট হওয়া, কালোদাগ পড়া, সঙ্গে ফেটে যাওয়া। সব মিলিয়ে ন্যায্য দাম পাওয়া নিয়ে শঙ্কিত চাষি ও ব্যবসায়ীরা। এরই মধ্যে আজ থেকে শুরু হচ্ছে হাঁড়িভাঙার আনুষ্ঠানিক বাজারজাত। যদিও ১০ জুন থেকেই আম বেচাবিক্রি শুরু হয়েছে। অনেক বাগানের আম রাখা যাচ্ছে না। পেকে যাওয়ায় তারা বিক্রি শুরু করেছেন। আবার বৃষ্টির কারণে আমের রং নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তার উপর কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ার অভিযোগ চাষিদের।
মণ্ডলপাড়ার আম বাাগানে আম ছিড়ছিলেন বাগান মালিক মাহফুজুর রহমান নয়ন। এটা তাদের নিজস্ব বাগান। নিজেরাই আবাদ করেন। তিনি জানান, বাজারটা খুব ওঠানামা করছে। এবার আমের ফলন কম হয়েছে। বৃষ্টির কারণে আমের কালারও নাই। সেকারণে বাজার ভালো যাচ্ছে না। প্রকারভেদে ১৪০০ থেকে ১৮০০ টাকা মণের মধ্যেই বিক্রি করছি। আশা করি সামনে বাজার ভালো হবে। আকাশ ভালো থাকলে চাহিদা বাড়ার দাম বাড়বে।
এই বাগানেই কথা হয় মাহমুদা বেগম নামের এক কৃষাণির সঙ্গে। তিনি জানান, শিলাবৃষ্টির কারণে ৩০-৩৫ ভাগ আম পড়ে গেছে। ফলনও কম হয়েছে। বৃষ্টির কারণে এবার আমের সেই আগের মতো রঙও ঠিক থাকছে না। দাম এখন কিছুটা কম। এর আগের বছরগুলোতে এই সময়ে ২৪০০ থেকে ২৮০০ টাকা মণ বিক্রি করেছি। এবার এখনও ১৬০০ টাকা মণ দরেও বিক্রি করতে পারছি না।
আমচাষি ও উদ্যোক্তা হানিফুর রহমান সজীব বলেন, এবার আবহাওয়া পরিস্থিতি বিবেচনায় অনেকেই আগেই আম পারতে শুরু করেছে। আমের আকার বা সাইজ ভেদে প্রতিমণ আম সর্বনিম্ন ১ হাজার ২০০ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৪০০ টাকা মণ বিক্রি হচ্ছে। সহনীয় তাপমাত্রা থাকলে আমের বাজার কিছুটা বেশি হয় বলেও জানান এই ব্যবসায়ীরা।
তিনি আরও বলেন, হাঁড়িভাঙা আম খেতে সুস্বাদু। একেকটি আম ১৫০ থেকে ৫০০ গ্রাম হয়। খুচরা বাজারে এর দাম আরও বেশি। কাঁচা আমের তুলনায় আবার পাকা আমের দাম কম। এ ক্ষেত্রে গাছ পাকা আম হলে আবার বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু এই আম গাছ থেকে সংগ্রহের চার-পাঁচ দিনের মধ্যে পেকে যায়। এ কারণে প্রতি মৌসুমে প্রচুর আম নষ্ট হয়।
হাঁকডাকে সরব অন্য হাটও, বিক্রির ধুম
শুধু পদাগঞ্জ হাটেই নয়, হাঁড়িভাঙা আমের প্রধান উৎপাদন এলাকা খোঁড়াগাছ, পাইকারহাট, ময়েনপুর, চ্যাংমারী, বালুয়া মাসুমপুর, কুতুবপুর, গোপালপুর, লোহানীপাড়া, রামনাথপুর, কালুপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় আম বিক্রির হাঁকডাক শুরু হয়েছে। এসব এলাকায় এখন আম বিক্রির ধুম চলছে। হাটে-বাজারে মানুষের সমাগমে যে কারো মনে হতে পারে এসব এলাকা যেন হাঁড়িভাঙা আমের রাজ্য।
সরেজমিনে দেখা গেছে, আমবাগানের মালিক, আমের ফড়িয়া, বাগানের পরিচর্যায় নিয়োজিত ব্যক্তি, মৌসুমি আম বিক্রেতা, অনলাইনে আম বিক্রেতা, পরিবহন ব্যবসায়ী, কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবসায়ী—সবাই যে যার মতো করে আম কেনাবেচার জন্য ব্যস্ত সময় পার করছেন।
পদাগঞ্জ এলাকার আমচাষি মোসাব্বির বকসি জানান, তিনি ৮ একর জমিতে আমের চাষ করেছেন। শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ে বাগানের কিছুটা ক্ষতি হয়েছে। তবে আমের ভালো দাম থাকায় ক্ষতি পুষিয়ে লাভের আশা করছেন তিনি।
স্থানীয় পাইকারি ব্যবসায়ী জুয়েল মিয়া জানান, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ দেশের বিভিন্নস্থান থেকে অনেক বড় বড় পার্টি ইতোমধ্যে যোগাযোগ শুরু করেছেন। তিনি আশা করছেন এবার আমের দাম ও চাহিদা দু’টোই সন্তোষজনক হবে।
এদিকে রংপুর নগরীর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল সড়ক, সিটি বাজার, লালবাগ, মডার্ন মোড়, ধাপ বাজার, শাপলা চত্বরসহ নগরীর বিভিন্ন হাট-বাজারেও মিলছে এই আম। হাট-বাজার ছাড়াও পাড়ামহল্লার অলিগলিতে ফেরি করে হাঁড়িভাঙা আম বিক্রি করতে দেখা গেছে। তবে প্রতিবারের মতো এবারও শুরুতেই আমের চড়া দাম চাইছেন বিক্রেতারা।

৩০০ কোটি টাকার হাঁড়িভাঙ্গা বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা
বিষমুক্ত ও অতি সুমিষ্ট আঁশহীন হাঁড়িভাঙা আমের চাহিদা বাড়ছে দিন দিন। কয়েক বছর ধরে ফলন ভালো হওয়ায় বেড়ে চলেছে আম উৎপাদনের পরিধিও। রংপুর সদর, মিঠাপুকুর ও বদরগঞ্জ উপজেলার বিস্তৃত এলাকার ফসলি জমি, বাগানসহ উঁচু-নিচু ও পরিত্যক্ত জমিতে চাষ হচ্ছে এই আম।
কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, এবার রংপুর জেলায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার হেক্টর জমিতে হাঁড়িভাঙা আম আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এর মধ্যে ২০০০ হেক্টরের বেশি জমিতে চাষ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে হাঁড়িভাঙা আম প্রায় ১০ থেকে ১২ টন ফলন হয়। সব কিছু ঠিক থাকলে অন্তত ৩০০ কোটি টাকার ওপরে হাঁড়িভাঙা আম বিক্রি হবে বলে জানিয়েছেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা।
কৃষি সম্প্রসারণ রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম জানান, শিলাবৃষ্টিতে হাঁড়িভাঙা ঝড়ে পড়লেও ফলন ভালো হয়েছে। আকার বড় হয়েছে। তাই কৃষকরা পুষিয়ে উঠতে পারবেন। এবার ৩০০ কোটি টাকারও বেশি হাঁড়িভাঙা বেচাবিক্রি হবে। যা এই অঞ্চলের প্রান্তিক অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করবে।
রপ্তানি ঘিরে বাণিজ্যের বিশাল সম্ভাবনা
২০২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি হাঁড়িভাঙা আম রংপুরের ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন রংপুর জেলা কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, হাঁড়িভাঙা আম এখন আর কেবল দেশের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, পাকিস্তান, ভারতসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এই আম রপ্তানি করা হয়। দেশের ভেতরে ফেসবুক ও ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সরাসরি বাগান থেকে আম সরবরাহের হার গত কয়েক বছরে কয়েক গুণ বেড়েছে।
তিনি আরও বলেন, ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকে এই আমের ব্র্যান্ড ভ্যালুও বেড়েছে, যা ভালো দাম নিশ্চিতে ভূমিকা রাখছে। এই আম ঘিরে বিশাল বাণিজ্যের সম্ভাবনা থাকলেও হিমাগার বা আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাব নিয়ে চাষিদের কিছুটা দুশ্চিন্তা রয়েছে। হাঁড়িভাঙা আম দ্রুত পচনশীল হওয়ায় এটি পরিবহনে বিশেষ ট্রেন বা দ্রুতগামী যানবাহনের ব্যবস্থা করা উচিত।
রংপুর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিনের বলেন, জিআইপণ্যখ্যাত হাঁড়িভাঙা আমের আনুষ্ঠানিকভাবে বাজারজাত সোমবার দুপুর থেকে শুরু করব। যেহেতু এবার একটু ফলন কম হয়েছে। সুতরাং আমের বাজার মূল্য এবার চাষিরা ভালোই পাবেন বলে মনে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, অবকাঠামোগত যে অসুবিধা, ব্যাংকিংসহ রাস্তাঘাট এবং নিরাপত্তা সেসব বিষয় আমাদের নজরে এসেছে। কিভাবে এগুলোর সমাধান করা যায় তা নিয়ে আমরা কাজ করছি। এছাড়া রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতাগুলো আমরা দূর করার চেষ্টা করছি। ২০২৪ সালের ১২ এপ্রিল জিআই বা ভৌগলিক পণ্যের স্বীকৃতি পায় হাঁড়িভাঙা আম।
আরকে
