মেঘনা উপকূলীয় জেলা লক্ষ্মীপুরে রয়েছে ছোট বড় অসংখ্য খাল। এর মধ্যে একটি মুছার খাল। এক সময় বছরে ৩ ফসল উৎপাদনে ব্যবহার হতো এই খালের পানি। কিন্তু দখল-দূষণ আর পলি জমে খালটি প্রায় মৃত হয়ে পড়েছিল। এতে দীর্ঘদিন সেচ সংকট ও জলাবদ্ধতায় ভোগান্তিতে ছিলেন হাজারো কৃষক। সম্প্রতি খালটির সাড়ে ছয় কিলোমিটার পুনঃখনন শুরু হওয়ায় জলাবদ্ধতা নিরসন ও সেচ সংকট দূর হয়ে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখছে কৃষক।
সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দারা জানায়, মুছার খালটি এখন জিয়ার খাল নামেও পরিচিত। সদরের চররমনী মোহন ইউনিয়নের মজুচৌধুরীর হাট থেকে শুরু করে ভবানীগঞ্জ, কমলনগরের চরমার্টিন হয়ে তোরাবগঞ্জ উত্তর বাজার পর্যন্ত এর বিস্তৃতি। এর মধ্যে ভবানীগঞ্জ ইউনিয়নেই প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকায় বহমান ছিল খালটি। এক সময় খালটির পানি ব্যবহার করে বছরে ৩ বার ফসল উৎপাদন করা হতো। পরবর্তীতে দখল-দূষণ, ছোট ছোট বাঁধ আর পলি জমে পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে এটি মরা খালে পরিণত হয়। এতে আশপাশের হাজারো একর কৃষি জমিতে দেখা দেয় সেচ সংকট। ফসল উৎপাদনে ভোগান্তিতে পড়তে হতো কৃষকদের। মাঝে মাঝে চাষাবাদও অনিশ্চিত হয়ে পড়তো। দুই যুগেরও বেশি সময় শুষ্ক মৌসুমে পানি না পাওয়ায় এক ফসলেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে স্থানীয় কৃষকরা। এছাড়া বর্ষায় খালে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে আশপাশের কৃষি জমি তলিয়ে নষ্ট হয় ফসল এবং খালপাড়ের বাসিন্দাদেরও দুর্ভোগে পড়তে হয়।
এদিকে বর্তমান সরকারের খাল পুনঃখনন কর্মসূচির অংশ হিসেবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি’র আওতায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় এক কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে লক্ষ্মীপুরে মুছার খাল পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কমলনগর উপজেলার উত্তর সীমানা থেকে ভবানীগঞ্জের চরমনসা পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ছয় কিলোমিটার খাল পুনঃখনন প্রায় শেষ পর্যায়ে। একই সঙ্গে খালপাড় সংস্কার, রাস্তা বাঁধাই এবং দুই পাশে গাছ লাগানোর কাজও চলছে। এতে নতুন করে কৃষকের মাঝে জেগেছে আশার আলো।
স্থানীয় কয়েকজন কৃষক ও শ্রমিক জানায়, সেচ সুবিধা নিশ্চিত হওয়ায় এখন বছরে দুই থেকে তিনটি ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হবে। এতে কৃষি উৎপাদন যেমন বাড়বে, তেমনি অর্থনৈতিকভাবেও লাভবান হবেন তারা। শুধু কৃষকই নন, খাল পুনঃখনন কাজে স্থানীয় কার্ডধারী শ্রমিকদেরও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। এই প্রকল্প শ্রমিক পরিবারের আয়-রোজগারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ভবানীগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাইফুল হাসান রনি বলেন, মুছার খাল পুনঃখননের ফলে কৃষিখাতে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে। এক ফসলি জমি দুই থেকে তিন ফসলি জমিতে রূপান্তরিত হবে। এতে কৃষি উৎপাদন বাড়বে, বেকারত্ব কমবে। পাশাপাশি স্থানীয় কার্ডধারী শ্রমিকদেরও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
গত এপ্রিল মাসে মুছার খাল পুনঃখননের উদ্বোধন করেন পানিসম্পদ মন্ত্রী ও লক্ষ্মীপুর-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্যকালে তিনি বলেন, মুছার খাল এখন জিয়ার খাল নামে পরিচিত। স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়তে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এ খাল খনন কার্যক্রম শুরু করেন। তখন আমি ষষ্ঠ শ্রেণিতে ছিলাম। মজুচৌধুরীর হাট এলাকায় গিয়ে আমি তখন খাল খনন কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছি। মজুচৌধুরীর হাট থেকে শুরু করে ভবানীগঞ্জে এসে খালটি শেষ হয়েছে। খাল পুনঃখনন জলাবদ্ধতা রোধ, কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি হবে।
হাসান মাহমুদ শাকিল/আরকে
