কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার গয়টাপাড়া সীমান্তের শূন্যরেখায় খোলা আকাশের নিচে গত ৫২ ঘণ্টা ধরে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন সুমি আক্তার-বেলাল হোসেন দম্পতি। দুই শিশু সন্তানসহ মোট ছয়জনকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করলেও বিজিবি ও স্থানীয়দের বাধার মুখে তারা এখনো শূন্যরেখায় আটকে আছেন।
এর আগে গত রোববার (১৪ জুন) ভোরে উপজেলার গয়টাপাড়া সীমান্তপথে নারী-শিশুসহ ৬ জন এবং বড়াইবাড়ি ভন্দুরচর সীমান্তে আরও ৩ জনকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পুশইনের চেষ্টা করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ। তাদের কাঁটাতারের এপাড়ে বাংলাদেশ প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হলেও বিজিবি ও স্থানীয় গ্রামবাসীর বাঁধায় তাদেরকে বাংলাদেশ ভূখন্ডে পাঠাতে পারেনি বিএসএফ।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) বেলা ১১টায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত নারী-শিশুসহ ভুক্তভোগীরা সীমান্তের শূন্যরেখার কাছে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছিলেন। ভারত কিংবা বাংলাদেশ কোনো দেশেই ঠাঁই মেলেনি তাদের।
গয়টাপাড়া সীমান্তে গিয়ে দেখা গেছে, সীমান্তের শূন্যরেখার একদিকে বিএসএফ, আরেক দিকে বিজিবি। মাঝখানে দুই শিশু সন্তান নিয়ে অসহায় বসে আছেন সুমি আক্তার-বেলাল হোসেন দম্পতি। সুমির কোলে ৬ মাসের শিশু সন্তান ফাইমা আর বেলালের কোলে ৪ বছরের ফাতেমা। খোলা আকাশের নিচে রোদ-বৃষ্টি সয়ে ৫২ ঘণ্টা ধরে এভাবে বসে আছেন তারা।
সুমি আক্তার ও বেলালের বাড়ি বাংলাদেশের ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার বিরুনিয়া ইউনিয়নের কংশেরকুল গ্রামের বাসিন্দা বলে জানা গেছে। কয়েক মাস আগে সিলেট সীমান্তপথে তারা ভারতে পাড়ি জমান। পরে বিএসএফ তাদের ধরে নিয়ে গত রোববার ভোরে সীমান্তের কাঁটাতার পার করে দেয়। কিন্তু বিজিবি ও স্থানীয়দের বাধায় তারা বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে পারেননি।
বিজিবি জানায়, বিএসএফ সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করে রৌমারীর দুই সীমান্তপথে ৯ জনকে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। ঠেলে দেওয়া ব্যক্তিরা কাঁটাতারের এপাড়ে শূন্যরেখার কাছে ভারতীয় ভূখণ্ডে অবস্থান করলেও তাদের ফেরত নেয়নি বিএসএফ। এদিকে বিজিবিও তাদেরকে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে দেয়নি।
বিজিবি আরও জানায়, পুশইন চেষ্টার পর রোববার দুপুরে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠক হয়। তবে কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়। বৈঠকে সীমান্তে জড়ো করা ব্যক্তিদের বাংলাদেশের নাগরিক দাবি করেছে বিএসএফ। ভুক্তভোগী নারী-পুরুষরাও নিজেদের বাংলাদেশি নাগরিক দাবি করেছে। তবে অবৈধ অনুপ্রবেশ করায় তাদের গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায় বিজিবি। একই সঙ্গে তাদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছেন তারা।
গয়টাপাড়া বিজিবি ক্যাম্প কমান্ডার সুবেদার শফিকুল ইসলাম বলেন, ঠেলে দেওয়া ব্যক্তিরা মঙ্গলবার বেলা ১১টায় পর্যন্ত অবস্থানেই আছেন। তারা শূন্যরেখার কাছে ভারতের প্রান্তে রয়েছেন। ওই প্রান্তে বিএসএফ এবং আমাদের প্রান্তে বিজিবি রয়েছে। কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে বৈঠক হলেও কোনো সুরাহা হয়নি।
তিনি আরও বলেন, অবস্থানকারীদের বিএসএফ কম্বল ও পলিথিন, খাবার দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আমাদের এখানকার লোকজন খাবার ও ছাতা দিয়েছে।
শৌলমারী ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম বলেন, আমি সীমান্ত এলাকায় গিয়েছিলাম। তাদেরকে খাবার দেওয়াসহ সহযোগিতা করা হচ্ছে।
জামালপুর ৩৫-বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসানুর রহমান বলেন, উদ্ভুত পরিস্থিতিতে বিজিবি সীমান্তে জনবল ও নজরদারি বৃদ্ধি করেছে। স্থানীয়রা বিজিবিকে সহায়তা করছে। সীমান্তে জড়ো করা নারী-শিশুসহ অন্যান্যরা পূর্বের স্থানেই অবস্থান করছে। ইন্ডিয়া পুশ করেছে, আমরা আসতে দেইনি। আপাতত আসতে দেব না যতক্ষণ পর্যন্ত না একটা ভালো সমাধানে আসছে।
মমিনুল ইসলাম/আরকে
