ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় পাঁচ বছরের এক শিশুকে কদম ফুল দেওয়ার প্রলোভনে দলবদ্ধ ধর্ষণ ও নদ থেকে মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেপ্তার চার আসামির মধ্যে দুজনকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। মঙ্গলবার (১৬ জুন) বিকেলে আরিফ ও রাকিব নামের ওই দুই আসামিকে আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
বাকি দুই আসামি মারুফ ও সিয়ামকে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় রাখা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ।
এর আগে, ধোবাউড়া উপজেলার গোয়াতোলা টাঙ্গাহাটি গ্রামে নিখোঁজের কয়েক ঘণ্টা পর কংস নদ থেকে শিশু নিশামনির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় সোমবার রাতে নিহত শিশুর বাবা রাজু মিয়া বাদী হয়ে ধোবাউড়া থানায় একটি ধর্ষণ ও হত্যা মামলা দায়ের করেন। পরে উপজেলার টাঙ্গাহাটি গ্রামের রমজান আলীর ছেলে মারুফ মিয়া (১৯), দোলাল মিয়ার ছেলে আরিফ মিয়া (১৯), সাইদুল ইসলামের ছেলে সিয়াম মিয়া (১৮) ও তাহের উদ্দিনের ছেলে রাকিব মিয়া (২১)-কে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত রোববার (১৪ জুন) বিকেল ৫টার দিকে বাড়ির পাশ থেকে ওই শিশুটি নিখোঁজ হয়। পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান পাননি। পরে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে বাড়ি থেকে প্রায় ৬০০ গজ দূরে কংস নদের একটি বাঁকে স্থানীয় লোকজন শিশুর মরদেহ ভাসতে দেখেন। খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা মরদেহটি উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে আসেন।
রাতেই দাফনের জন্য মরদেহ গোসল করানোর সময় শিশুটির শরীরে আঘাতের চিহ্ন ও স্পর্শকাতর স্থানে ক্ষত দেখতে পান স্বজনরা। এতে সন্দেহ হলে দাফন স্থগিত রেখে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। রাত সাড়ে ১২টার দিকে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে এবং তদন্ত শুরু করে। পরে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্ত শেষে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হলে রাতে তার দাফন সম্পন্ন হয়।
প্রাথমিক তদন্তের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, ঘটনার দিন বিকেলে স্থানীয় বাজার থেকে চিপস কিনে বাড়ি ফিরছিল শিশুটি। পথে চার তরুণের সঙ্গে তার দেখা হয়। মাগরিবের আজানের আগে তারা কদম ফুল দেওয়ার কথা বলে শিশুটিকে কৌশলে কংস নদের পাড়ের জঙ্গলঘেরা নির্জন এলাকায় নিয়ে যায়। সেখানে শিশুটির ওপর পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়। একপর্যায়ে শিশুটি নিস্তেজ হয়ে পড়লে তাকে নদীতে ফেলে পালিয়ে যায় অভিযুক্তরা।
নিহত শিশুটির ফুফু ফারহানা ইসলাম ঈষিতা অভিযোগ করে বলেন, চারজন যুবক মিলে আমার ভাতিজির ওপর অমানবিক নির্যাতন চালিয়েছে। পাঁচ বছরের একটা শিশুর সঙ্গে এমন জঘন্য ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তারা পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ঘটনার পর থেকেই এলাকায় বিষয়টি মীমাংসা করার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদর্শন করা হচ্ছে। এমনকি মীমাংসা না করলে পরিবারের অন্য সদস্যদের হত্যা করা হবে বলেও হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তারা প্রশাসনের কাছে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানান।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে নিহত শিশুর বাবা রাজু মিয়া বলেন, আমি আর কিছুই চাই না, শুধু আমার নিষ্পাপ শিশুকে নির্মমভাবে হত্যার বিচার চাই। আমি অভিযুক্তদের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি চাই।
এলাকার বয়োবৃদ্ধ বাসিন্দা রহমত আলী (৭০) ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দীর্ঘ জীবনে এই এলাকায় এমন নৃশংস ঘটনা কখনো দেখিনি। যারা ৫ বছরের শিশুর সাথে এই কাজ করেছে, তারা মানবতার সীমা অতিক্রম করেছে।
গোয়াতলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাকিরুল ইসলাম টুটন বলেন, নিহত শিশুটির বয়স এখনো পাঁচ বছর পূর্ণ হয়নি। এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
ধোবাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম বলেন, শিশুর বাবার দায়ের করা মামলায় পুলিশ দ্রুত অভিযান চালিয়ে চার আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে। এর মধ্যে গ্রেপ্তারকৃত দুই আসামিকে আজ বিকেলে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
ময়মনসিংহের সহকারী পুলিশ সুপার (হালুয়াঘাট সার্কেল) মিজানুর রহমান বলেন, গ্রেপ্তার চারজনের মধ্যে একজনের বক্তব্য অনুযায়ী চারজনই এই ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। বাকি দুজন এখনো বিস্তারিত কিছু বলেনি। পলাতক থাকা শেষ আসামিকে আজ দুপুরে অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর ঘটনা সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানা যাবে। তবে প্রাথমিক তদন্ত ও সুরতহালে সুরতহাল প্রতিবেদনে জোরপূর্বক নির্যাতন ও হত্যার আলামত পাওয়া গেছে। অপরাধের সঙ্গে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। বাকি দুই আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে রিমান্ডের আবেদন করা হতে পারে।
সাখাওয়াত সুমন/এসএইচএ
