সবুজ পাহাড়ের ঢাল বেয়ে বয়ে যায় বাতাস, ধানক্ষেতের ঢেউ খেলানো নীরবতা আর গ্রামের কাঁচা-পাকা পথের শেষ মাথায় হঠাৎ চোখে পড়ে বিলাসবহুল বাড়ি। উঁচু প্রাচীর, ঝকঝকে গেট ও বিদেশি নকশার স্থাপত্য আর আধুনিক সব সুবিধা— দূর থেকে মনে হয় যেন বিদেশের অভিজাত আবাসন। কিন্তু কাছে গেলে বদলে যায় দৃশ্য। বন্ধ গেট, অন্ধকার জানালা আর ঝোপঝাড়ে ঘেরা উঠান মিলিয়ে এক অদ্ভুত স্থবিরতা। প্রবাসীদের পরিত্যক্ত সৌখিন বাড়িগুলো যেন নীরবে দাঁড়িয়ে আছে।
সিলেটের বিয়ানীবাজার, ওসমানীনগর, গোলাপগঞ্জ ও বিশ্বনাথ উপজেলার গ্রামীণ জনপদে এমন দৃশ্য এখন আর বিরল নয়। স্থানীয়ভাবে এসব বাড়ি পরিচিত ‘লন্ডনি বাড়ি’ বা ‘বিদেশির বাড়ি’ নামে। প্রবাসে থাকা মানুষের অর্থে গড়ে ওঠা এসব স্থাপনা একসময় ছিল স্বপ্নের প্রতীক; গ্রামে ফিরে আসার ঠিকানা, পরিবারের নিরাপদ আশ্রয়, আর সামাজিক মর্যাদার এক উঁচু পরিচয়। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে পরোক্ষভাবে এসব স্বপ্নের বাড়ির প্রয়োজন ফুরিয়েছে। বাড়িগুলো বড় অংশ এখন পরিণত হয়েছে ব্যবহারহীন প্রাসাদে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বিশ্বনাথ উপজেলার চান্দশীর কাপন, ওসমানীনগরের করনশী, গোলাপগঞ্জের দত্তরাইল, লক্ষনাবন্দের সালাম বাগ এবং বিয়ানীবাজারের চারখাই এলাকায় এমন অসংখ্য বাড়ি রয়েছে, যেগুলো বছরের লম্বা সময় তালাবদ্ধ পড়ে থাকে।

এসব বাড়ি শুধু আবাসনের জন্য নয়, বরং হিসেবেও নির্মিত হয়েছে। ফলে ব্যবহারিক প্রয়োজনের চেয়ে বড় বাড়ি আছে এই পরিচয় অনেক ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্ব পায়।
তবে প্রবাসীদের মতে, এসব বাড়িকে শুধু অব্যবহৃত স্থাপনা বা অলস সম্পদ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাদের কাছে এগুলো কেবল ইট-পাথরের দালান নয়। বরং জন্মভূমির প্রতি আবেগ, শিকড়ের টান এবং আগামী প্রজন্মের সঙ্গে দেশের সম্পর্ক ধরে রাখার এক ধরনের মানসিক বিনিয়োগ।
প্রবাসী অধ্যুষিত বিয়ানীবাজার উপজেলার বাসিন্দা ও যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী কে এইচ সুমন বলেন, জীবনের শেষ ঠিকানা হিসেবে আমরা গ্রামের মাটিতে বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করি। প্রবাসে থাকলেও মন পড়ে থাকে নিজের জন্মভূমিতে। এমনকি বিদেশের মাটিতে মৃত্যুবরণ করলেও যেন আমাদের লাশটা দেশে এনে নিজের বাড়ির উঠানে একবার তোলা হয়, স্বজন-প্রতিবেশীরা শেষবারের মতো দেখতে পারেন। এই আবেগ ও নাড়ির টান থেকেই আমরা কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে এসব বাড়ি গড়ে তুলি। তাই এগুলো শুধু দালান নয়, আমাদের অস্তিত্ব ও শিকড়ের প্রতীক।

সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার বাসিন্দা ও লন্ডনপ্রবাসী জামাল মিয়া বলেন, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের অনেকেই বিদেশে জন্ম নিয়েছে, সেখানেই বড় হচ্ছে। তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের, বিশেষ করে গ্রামের, সম্পর্কটা ধরে রাখার জন্যই আমরা আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন বাড়ি নির্মাণ করি। দেশে এসে যদি তারা প্রয়োজনীয় সুবিধা ও স্বাচ্ছন্দ্য না পায়, তাহলে ধীরে ধীরে তাদের দেশে আসার আগ্রহ কমে যাবে। এক সময় তারা নিজেদের শিকড়, গ্রামের মানুষ এবং নাড়ির সম্পর্কটাও ভুলে যেতে পারে। তাই এসব বাড়ি শুধু থাকার জায়গা নয়, নতুন প্রজন্মকে দেশের সঙ্গে সংযুক্ত রাখারও একটি প্রচেষ্টা।
স্থানীয় পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও মাঠ পর্যায়ের পর্যবেক্ষণ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ, বিশ্বনাথসহ বিভিন্ন উপজেলায় ছড়িয়ে থাকা এসব বড় বাড়ির সংখ্যা আনুমানিক কয়েক হাজারের মতো হতে পারে। প্রতিটি বাড়ির নির্মাণব্যয় কোটি টাকার ঘরে। বলা যেতে পারে, এসব প্রবাসীদের অলস টাকায় গড়া বিলাসবহুল বাড়ি।
এই বিষয়ে গোলাপগঞ্জ উপজেলার ঢাকা দক্ষিণ ইউনিয়নের ডিজিটাল সেন্টারের পরিচালক সাকিব মামুন বলেন, প্রবাসীদের অর্থে গ্রামীণ এলাকায় বড় বড় বাড়ি তৈরি হয়েছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই সেগুলো দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় একটি স্থবির সম্পদে পরিণত হচ্ছে। পরিকল্পিত ব্যবহার না থাকায় এই সম্পদগুলো অর্থনৈতিকভাবে পুরোপুরি কাজে আসে না।
দীর্ঘদিন ব্যবহার না থাকায় এসব স্থাপনায় এখন অবক্ষয়ের চিহ্ন স্পষ্ট। কোনো বাড়ির দেয়ালে ফাটল, কোথাও রং উঠে গেছে, আবার কোথাও লোহার গেটে মরিচা ধরেছে। অনেক বাড়ির উঠান জুড়ে জঙ্গলের মতো ঝোপঝাড়। স্থানীয়রা বলছেন, কোটি কোটি টাকার এসব সম্পদ ব্যবহার না হওয়ায় ধীরে ধীরে নষ্ট হওয়ার পথে।
বিশ্বনাথ উপজেলার পশ্চিম চান্দশীর কাপন এলাকার বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী আবু ওমর খান বলেন, অনেক বড় বড় বাড়ি আছে, কিন্তু বছরের বেশিরভাগ সময়ই ফাঁকা থাকে। শুধু ঈদ বা বিশেষ সময়েই মালিকরা আসেন। বাকি সময়গুলোতে বাড়িগুলো একেবারেই নির্জন পড়ে থাকে।
এদিকে এসব ফাঁকা বাড়িকে ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। রাতের বেলায় কিছু এলাকায় অনধিকার প্রবেশ বা সন্দেহজনক চলাচলের অভিযোগ পাওয়া যায়। তবে স্থানীয় প্রশাসন বলছে, বড় ধরনের কোনো অপরাধমূলক ঘটনার তথ্য নেই।
এ বিষয়ে বিয়ানীবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওমর ফারুক বলেন, প্রবাসীদের অনেক বাড়ি বছরের বড় একটি সময় ফাঁকা থাকে। কিছু ক্ষেত্রে অনধিকার প্রবেশ বা চুরির চেষ্টা শোনা গেলেও বড় ধরনের কোনো অপরাধপ্রবণতার ঘটনা খুবই কম। পুলিশ নিয়মিত টহল ও স্থানীয়দের সহযোগিতায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সবসময়ই তৎপর রয়েছে।
তবে প্রবাসীদের এই ধরনের বিনিয়োগ একদিকে গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে, বিশেষ করে নির্মাণ খাতে কর্মসংস্থান ও অর্থপ্রবাহ বাড়িয়েছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এসব সম্পদের বড় একটি অংশ ব্যবহারহীন থেকে যাওয়ায় তা অলস সম্পদে পরিণত হয়েছে। ফলে স্থানীয় অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদনশীলতা তৈরি হচ্ছে না এবং এক ধরনের ভারসাম্যহীনতা দেখা দিচ্ছে।
ট্যুর অপারেটরদের মতে, এসব বাড়ির স্থাপত্যশৈলী সঠিকভাবে কাজে লাগানো গেলে সিলেটের পর্যটনখাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।পরিকল্পিত ব্যবহারের মাধ্যমে এগুলোকে হোমস্টে বা বুটিক রিসোর্টে রূপান্তর করা সম্ভব হলেও নানা সীমাবদ্ধতার কারণে উদ্যোগগুলো কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি পাচ্ছে না, ফলে সম্ভাবনাময় এসব স্থাপনা অনেক ক্ষেত্রেই অব্যবহৃতই থেকে যাচ্ছে।

ই-ট্যুরিজম অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ট্যাব) সিলেট জোনের আঞ্চলিক প্রধান শেখ রাফি ঢাকা পোস্টকে জানান, এসব বাড়ির মালিকদের মতে, এসব স্থাপনা মূলত নিজেদের বসবাসের জন্য নির্মিত হওয়ায় ভাড়া বা বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য তা উন্মুক্ত করার আগ্রহ অনেকের নেই। অনেক ক্ষেত্রেই সামাজিক ও পারিবারিক কিছু বাধ্যবাধকতার কারণেও বাড়িগুলো দীর্ঘদিন ব্যবহারহীন অবস্থায় পড়ে থাকে।
ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের (টোয়াস) সভাপতি হুমায়ুন কবির লিটন ঢাকা পোস্টকে বলেন, এটি নিয়ে আমরা অনেকদিন ধরেই কাজ করছি। তবে বাস্তবতা হলো,পর্যটকদের বড় একটি অংশ এখনো শহরের বাইরে গ্রামীণ এলাকায় থাকতে ততটা আগ্রহী নয়। সিলেটের বিভিন্ন উপজেলায় ছড়িয়ে থাকা এসব বিলাসবহুল বাড়ি অনেক সময় পর্যটকদের কাছে পৌঁছাতে সুবিধাজনক না হওয়ায় সেখানে যেতে অনীহা দেখা যায়। পর্যটন মৌসুমে কিছু নির্দিষ্ট সংখ্যক পর্যটক এসব এলাকায় গেলেও বছরের বাকি সময় কাজে লাগার সুযোগ কম।
নির্মাণ সংশ্লিষ্ট বন্ধন প্রিকাস্ট পাইল কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ফাহিমুল ইসলাম ফাহিম বলেন, সিলেট অঞ্চলে প্রবাসীদের অর্থে যে বিশাল অবকাঠামো গড়ে উঠেছে, তার বড় অংশই নির্মাণখাতের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। এসব বাড়ি নির্মাণের সময় স্থানীয়ভাবে ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরি হয় এবং নির্মাণসামগ্রীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যবসাও চাঙা হয়।
রেজাউল হাসান কয়েস লোদী আরও বলেন, আমি দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র দুই দিন হয়েছে। আমার জায়গা থেকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছি। আগামী দিনে একটি সার্বিক উন্নয়ন পরিকল্পনার মাধ্যমে কীভাবে এসব বিনিয়োগকে আরও কার্যকর, সৃজনশীল ও উৎপাদনশীল খাতে যুক্ত করা যায় সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
বড় ও বিলাসবহুল এ সব অব্যবহৃত বাড়ি বা স্থাপনাকে হোমস্টে, বুটিক রিসোর্ট বা পর্যটন সেবাকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার যায় কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, সিলেট অঞ্চলের যেসব পর্যটন স্পট ও প্রাকৃতিক আকর্ষণ রয়েছে, সেগুলোকে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন করা এবং পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আওতায় একটি সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যানের প্রয়োজন রয়েছে, যাতে পর্যটন শিল্পকে আরও গতিশীল করা যায়।
পর্যটকদের জন্য নিরাপদ, মানসম্মত ও সহজ সেবা নিশ্চিত করা এবং তাদের আগমনে আকৃষ্ট করার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সুবিধা উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে।
প্রবাসীদের এসব বাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ প্রসঙ্গে সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী বলেন, প্রবাসীরা আমাদের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সে গ্রামীণ এলাকায় বিপুল উন্নয়ন হয়েছে, যা প্রশংসনীয়। তবে তাদের নির্মিত বাসা-বাড়িগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। কোনোভাবেই যেন এসব সম্পত্তি দখল, হয়রানি বা ক্ষতির শিকার না হয়, সে বিষয়ে প্রশাসনসহ সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
আরকে/এসএইচএ
