রাঙামাটির স্থানীয় বিজ্ঞান মেলায় সাফল্যের ধারাবাহিকতায় এবার জাতীয় পর্যায়ে সেরা হওয়ার স্বীকৃতি পেয়েছে পাহাড়ের ক্ষুদে বিজ্ঞানী সুজন চাকমার নেতৃত্বে তৈরি উদ্ভাবনী প্রজেক্ট ‘অ্যারিক্স অ্যান্ড অপটিমাস আলটিমেট’। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ৪৭তম জাতীয় বিজ্ঞান মেলা ২০২৬-এ জুনিয়র গ্রুপে প্রথম স্থান অর্জন করেছে প্রজেক্টটি।
‘উদ্ভাবন নির্ভর বাংলাদেশ গঠনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এ প্রতিযোগিতায় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে অসংখ্য শিক্ষার্থী তাদের তৈরি প্রজেক্ট নিয়ে অংশ নেয়। সুজন চাকমা ও তার সহপাঠী পূর্ণতা চাকমার উপস্থাপিত প্রজেক্ট বিচারকদের বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং প্রথম স্থান অর্জন করে।
সুজন চাকমা ও পূর্ণতা চাকমা রাঙামাটি লেকার্স পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
এর আগে গত ১৫ মে রাঙামাটিতে অনুষ্ঠিত বিজ্ঞান মেলায় সুজন চাকমা তার ব্যতিক্রমধর্মী উদ্ভাবনী চিন্তা ও গবেষণাভিত্তিক উপস্থাপনার মাধ্যমে সবার নজর কাড়ে। সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় জাতীয় পর্যায়েও নিজের মেধা ও সক্ষমতার স্বাক্ষর রেখেছে সে।
সুজন ও পূর্ণতার তৈরি ‘অ্যারিক্স অ্যান্ড অপটিমাস আলটিমেট’ একটি সামরিক প্রতিরক্ষাভিত্তিক রোবটিক প্রজেক্ট। এটি স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিতে সামরিক কাজে সহায়তা করবে। তাদের লক্ষ্য বিদেশনির্ভরতা কমিয়ে দেশেই এ ধরনের সরঞ্জাম তৈরি করে রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখা।
প্রজেক্টের টিম লিডার সুজন চাকমা জানায়, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় সে প্রজেক্টটি নিয়ে কাজ শুরু করে। প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের পরামর্শে প্রতিরক্ষা বিষয়ক প্রজেক্ট করার সিদ্ধান্ত নেয়। ধীরে ধীরে গবেষণা ও নিজস্ব উদ্ভাবনী চিন্তা থেকে প্রজেক্টটি তৈরি করে।
সুজন বলে, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় আমি ব্যাপক দুর্বলতা লক্ষ্য করেছি। অন্য দেশে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হলেও বাংলাদেশ এখনো পুরোনো অস্ত্র-সরঞ্জামের ওপর নির্ভরশীল। এই প্রেক্ষাপটেই আমার প্রোটোটাইপ প্রজেক্টগুলো তৈরি করেছি।
রাঙামাটি লেকার্স পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী শিক্ষক ও সুজন-পূর্ণতার মেন্টর মো. এজাজুল হক জানান, প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষক তাদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন। বিশেষ করে অধ্যক্ষ তাদের সর্বোচ্চ উৎসাহ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়েছেন।
তিনি বলেন, এই প্রজেক্টের সাফল্যের পেছনে সুজন ও পূর্ণতার কঠোর পরিশ্রমই মুখ্য। প্রজেক্টটি বাস্তবায়িত হলে সামরিক সরঞ্জামে বিদেশনির্ভরতা কমবে এবং রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব হবে।
জাতীয় বিজ্ঞান মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম প্রজেক্টটির প্রশংসা করেন। সমাপনী অনুষ্ঠানে সুজন চাকমা তার গবেষণা কার্যক্রম, অর্জিত অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুজন চাকমার এ সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, এটি পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষার্থীদের মেধা, সৃজনশীলতা ও সম্ভাবনারও উজ্জ্বল প্রতিফলন। প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চল থেকেও জাতীয় পর্যায়ে সাফল্য অর্জন সম্ভব— সুজনের এ কৃতিত্ব সেই বার্তাই বহন করছে। তাদের এ সাফল্য পার্বত্য চট্টগ্রামের নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানচর্চা ও উদ্ভাবনী কর্মকাণ্ডে আরও উৎসাহিত করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মোস্তফা কামাল রাজু/আরএআর
