দ্বীপজেলা ভোলার প্রায় ২২ লাখ মানুষের উন্নত চিকিৎসার শেষ ভরসাস্থল ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের ছয় বেডের আইসিইউ ইউনিট। এটি গত গত ৫ বছর ধরে অচল অবস্থায় মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। ফলে বছরের পর বছর ধরে ব্যবহার না হওয়ায় অকেজো হয়ে পড়ার শঙ্কায় প্রায় কোটি টাকার সরকারি যন্ত্রপাতি।
এ অবস্থায় আইসিইউ সেবা না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ হৃদরোগে আক্রান্ত মুমূর্ষু রোগী ও তাদের স্বজনরা। গুরুত্বপূর্ণ এ ইউনিটটি চালুর ব্যাপারে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তোড়জোড় নেই বলে অভিযোগ সচেতন মহলের। তবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও দক্ষ জনবল পেলেই সব সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। এ ছাড়া, অভিযোগ রয়েছে হৃদরোগে আক্রান্ত মুমূর্ষু রোগীদের যথাযথ চিকিৎসা দিতে না পেরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রোগী মৃত্যুর দায় এড়াতে রেফার্ড করেন বরিশাল ও ঢাকায়, এরপর পথেই প্রাণ হারান রোগীরা।
সরেজমিনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, ভোলা শহরের জেনারেল হাসপাতালের নতুন বহুতল ভবনের ৩য় তলায় ২০২১ সালে করোনাকালীন হাসপাতালটিতে ছয়টি আইসিইউ বেড স্থাপন করা হয়। এ ছাড়া, পাঁচটি ভেন্টিলেটর, সাতটি অক্সিজেন কনসেনটেটর ও ছয়টি হাইফ্লু ন্যাজাল ক্যানুলা সরকারিভাবে সরবরাহ করা হয়। রয়েছে সেন্ট্রাল অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থাও। তবে জনবলের অভাবে গত ৫ বছরেও আইসিইউ ইউনিটটি চালু হয়নি, ফলে তালাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে এ আইসিইউ ইউনিটটি।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হাসপাতালটি প্রধান সমস্যা হচ্ছে তীব্র চিকিৎসক ও নার্স সংকট। ৮৭ জন চিকিৎসকের পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ২৩ জন এবং ৯২টি নার্সের পদের বিপরীতে কর্মরত ৭৬ জন। হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালটিতে মাত্র একজন কার্ডিওলজি চিকিৎসক কর্মরত রয়েছেন। এ ছাড়া, হাসপাতালে প্রতিদিনই চিকিৎসা নেন ধারণক্ষমতার প্রায় তিন গুনের বেশি রোগী।

গত ৫ দিন ধরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পুরুষ মেডিসিন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন আশির্ধ্বো সদর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা দরিদ্র মো. আবু কালাম হাওলাদার। তিনি অভিযোগ করে ঢাকা পোস্টকে বলেন, 'হাসপাতালে সঠিক চিকিৎসা পাইতেছি না, কইয়া লাভ নাই, টাকা-পয়সা নাই দেইখাই পোলাপানে আমারে এখানে ভর্তি কইররা রাখছে।’
তার পাশের বেডেই গত ১৪ দিন ধরে চিকিৎসাধীন উত্তর দিঘলদী ইউনিয়নের মো.ফরমুজুল হক হাওলাদার (৮৪)। ভাঙা ভাঙা স্বরে তিনিও অভিযোগ করে বলেন, ভোলা সদর হাসপাতালের বেডে শুধু শুয়েই আছি, যে অবস্থায় ছেলে-মেয়েরা এনে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছে সে অবস্থাতেই আছি, আমার স্বাস্থ্যের কোনো উন্নতি হয়নি, কী করবো?
ক্ষুদ্ধ ভোলা সদর হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের স্বজনরা। লাইজু বেগম, মনোয়ারা বেগম ও আলী আকবর বলেন, আমরা গরিব মানুষ। হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর বাবাদেরকে চিকিৎসার জন্য ভোলা সদর হাসপাতালে এনে ভর্তি করিয়েছি। দিনের পর দিন পেরিয়ে গেলেও তাদের স্বাস্থ্যের কোনো উন্নতি দেখছি না। হাসপাতালের লোকজন বলে ঢাকা-বরিশাল নিয়ে যেতে, আমাদের টাকা-পয়সা থাকলে তো আর ভোলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য রাখতাম না।
তারা আরও বলেন, প্রতিদিন সকালে একজন ডাক্তার কয়েক মিনিটের জন্য ওয়ার্ডে রাউন্ড দিয়ে চলে যান, এরপর ২৪ ঘণ্টা পর ছাড়া হৃদরোগের আর কোনো ডাক্তার হাসপাতালে পাওয়া যায় না, এভাবেই চলছে হৃদরোগের রোগীদের চিকিৎসা। চিকিৎসার অভাবে কেউ মারা গেলে দায়ভার কে নেবে। ভোলা সদর হাসপাতালে আইসিইউ ইউনিট আছে, সেটি যদি চালু থাকতো তাহলে সঠিক চিকিৎসা পাওয়া যেত।
বোরহানউদ্দিনের পক্ষিয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. ওমর ফারুক হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পড়লে তাকে বোরহানউদ্দিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে রেফার্ড করা হয় শহরের ভোলা জেনারেল হাসপাতালে। কিন্তু সেখানে আনার পর যথাযথ চিকিৎসা না পাওয়ার অভিযোগ স্বজনদের।
তার ভাগিনা মো. রাসেল বলেন, আমার মামাকে চিকিৎসার জন্য ভোলা সদর হাসপাতালে আনার পর হৃদরোগের যথাযথ চিকিৎসা পাইনি, ফলে অন্য হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি।
ভোলাবাসীর চিকিৎসায় যেহেতু কাজেই আসছে না সেক্ষেত্রে ভোলা সদর হাসপাতালে ৬টি আইসিইউ বেড কেনো এবং কাদের জন্য স্থাপন করা হয়েছে প্রশ্ন রেখে সচেতন মহলের মো. রাকিব ও হাসনাইন বলেন, হৃদরোগে আক্রান্ত মুমূর্ষু রোগীরা ভোলা সদর হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিটের চিকিৎসা আজও পর্যন্ত পাচ্ছে না। আমরা ভোলাবাসী এ দেশের নাগরিক হওয়া স্বত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় বহু সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। ভোলা সদর হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীদের নামেমাত্র চিকিৎসা দিয়ে ঢাকা বরিশালে রেফার্ড করে দেওয়া হয়, এতে অনেকে পথেই প্রাণ হারান, যে খবর কেউ রাখে না। ভোলাতে আইসিইউয়ের চিকিৎসার অভাবে আর কতপ্রাণ ঝড়বে?'
ভোলা সদর হাসপাতালে আইসিইউ ইউনিট চালানোর মতো দক্ষ জনবল নেই বলে জানান ভোলার ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. তৈয়বুর রহমান। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, আইসিইউ চালানোর জন্য চিকিৎসক-অ্যানেসথেটিস্ট, নার্সসহ অন্যান্য জনবল প্রয়োজন। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। যদি জনবল থেকে শুরু করে অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো পাওয়া যায় তাহলে আইসিইউ ইউনিট চালু করবো এবং রোগীদেরকে আইসিইউ সেবা অবশ্যই আমরা দেবো।
ডা. তৈয়বুর রহমান বলেন, হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা ভোলা জেনারেল হাসপাতালে আমরা দিয়ে থাকি, শুধু যেসব রোগীদের স্পেশালাইজড চিকিৎসার প্রয়োজন তাদেরকে রেফার্ড করা হয়।
এদিকে চিকিৎসা খাতের গুরুত্বপূর্ণ ভোলার ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিটটি চালুর ব্যাপারে অতিদ্রুত কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করবে সরকার, এতে নিশ্চিত হবে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা মুমূর্ষু রোগীদের যথাযথ চিকিৎসা-এমনটাই প্রত্যাশা ভোলাবাসীর।
মো. খাইরুল ইসলাম/এএমকে
