নদীই যাদের জন্মভূমি, নদীতেই যাদের মৃত্যু, নদীই যাদের জীবন-জীবিকার একমাত্র অবলম্বন পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার চরমোন্তাজ লঞ্চঘাট এলাকার সেই মান্তা সম্প্রদায়ের মানুষের জীবনে নেমে এসেছে নতুন সংকট। সরকারি আবাসন প্রকল্পে আশ্রয় মিললেও এখনো নিরাপদ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের নিশ্চয়তা পাননি তারা। এরই মধ্যে প্রভাবশালী একটি মহল ক্ষমতা ও অর্থের প্রভাব খাটিয়ে মান্তাদের সরকারি আবাসনের একেবারে পাশেই একটি বরফকল নির্মাণ করায় ক্ষোভ, উদ্বেগ ও আতঙ্কে দিন কাটছে পুরো সম্প্রদায়ের।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপকূলীয় চরমোন্তাজ এলাকায় নদীর কোল ঘেঁষে প্রায় ১০০টি মান্তা পরিবার বসবাস করে। এর মধ্যে প্রায় ৩০টি পরিবার এখনো নদীতে নৌকায় বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে। বাকি ৭০টি পরিবার সরকারি আবাসনে রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে নদীকেন্দ্রিক জীবনযাপন করা এই জনগোষ্ঠীর বসতি ও নৌকা রাখার স্থান ঘিরেই নির্মাণ করা হচ্ছে বিতর্কিত বরফকলটি।
অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় কবির, পার্শ্ববর্তী ভোলা জেলার প্রফেসর আবুল কাসেম, স্থানীয় আলমগীর এবং হোটেল সাথীর পরিচালক মো. ঈসার উদ্যোগে বরফকলটি নির্মাণ করা হচ্ছে। নির্মাণকাজের সার্বিক তদারকির দায়িত্বে রয়েছেন মো. ঈসা। প্রয়োজনীয় পরিবেশগত ছাড়পত্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই দ্রুতগতিতে নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, বরফকল চালু হলে দিনরাতের বিকট শব্দে পুরো এলাকা বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে কারখানায় ব্যবহৃত অ্যামোনিয়া গ্যাসের সম্ভাব্য নিঃসরণ শিশু, নারী ও বয়স্কদের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
শুধু তাই নয়, বরফকলকে কেন্দ্র করে বড় ট্রলার ও ইঞ্জিনচালিত নৌযানের চলাচল বৃদ্ধি পেলে মান্তা সম্প্রদায়ের নৌকা রাখার স্থান সংকুচিত হবে। এতে তাদের ঐতিহ্যগত জীবনধারা ও জীবিকা সরাসরি হুমকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বাসিন্দারা।
চোঁখে-মুখে আতঙ্ক ও ক্ষোভ নিয়ে মান্তা আবাসনের প্রবীন বাসিন্দা আসমা বেগম বলেন, কারে কী বইলা শত্রু হমু? ভয়ে তাদেরকে (বরফকল কর্তৃপক্ষকে) কিছু কইতে সাহস পাই না। আমরা কি হ্যাগো লগে কুলামু? হ্যারা বাবা টাকা ছাইড়ড়া দেবে, আমাগো যাইবে জীবনের উপর দিয়া। যহন দেখমু এহানে এই কলের জন্য আর থাকতে পারিনা তহন লাগলে আবার নৌকায় নৌকায় ভাসমু। হ্যাগো লগে আমরা জীবনেও পারমু কয়ন? তারা জীবনেও আমাগো কতা গুরুত্ব দেবে না।
মান্তা সম্প্রদায়ের আবাসনের সরদার মো. শাহজাহান বলেন, এই বরফকলের জন্য যখন মাটি কাটে তখনই আমরা তাদের নিষেধ করছি যে বরফকল হইলে আমাদের ক্ষতি হইতে পারে। এর গ্যাসে সমস্যা, এরপর এখানে ট্রলার ভিড়বে। অনেককেই জানাইছি কিন্তু কোনো কাজ হয় নাই। এখন আমরা নিরূপায়। প্রথম দিকেই আটকাইয়া রাখতে পারি নাই, এখন আর আটকাইয়া কী হইবে? যদি এইয়ার (বরফকলের) উছিলায় মরি, মইরা যামু। গরীবের আর কী আছে?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক মান্তা সম্প্রদায়ের বাসিন্দা দ্রুত বরফকলটি তাদের আবাসনের পাশ থেকে অপসারণের দাবি জানান।
সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, মান্তাদের আবাসনের পাশের নদীতীরবর্তী সরকারি জমির একটি বড় অংশ দখল করে ‘আসিফ আইচ ফ্যাক্টরি’ নামে বরফকলটির নির্মাণকাজ চলছে। ইতোমধ্যে বাইরের অবকাঠামো নির্মাণ এবং বিদ্যুৎ সংযোগের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে কারখানার অভ্যন্তরে যন্ত্রপাতি স্থাপনের কাজ চলছে।
এ সময় অসহায় মান্তা সম্প্রদায়ের আশ্রয়ণ প্রকল্প সংলগ্ন এলাকায় বরফকল নির্মাণের বৈধতা ও পরিবেশগত ছাড়পত্রের বিষয়ে জানতে চাইলে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি মো. ঈসা সরাসরি সাক্ষাৎ করতে রাজি হননি। তবে মুঠোফোনে তিনি দাবি করেন, জায়গাটিতে বরফকল নির্মাণের জন্য তাদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, পরিবেশগত ছাড়পত্র ও অনুমোদন রয়েছে।
তবে এ বিষয়ে ভিন্ন তথ্য দিয়েছে পটুয়াখালী জেলা পরিবেশ অধিদপ্তর। গত ৭ জুন আসিফ আইচ ফ্যাক্টরির পরিবেশগত ছাড়পত্রের আবেদন নাকচ করে এবং প্রতিষ্ঠানটি বন্ধপূর্বক অন্যত্র স্থানান্তরের জন্য একটি নোটিশ জারি করে জেলা পরিবেশ অধিদপ্তর। নোটিশে উল্লেখ করা হয়, পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা অনুযায়ী আবাসিক এলাকায় কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন বা পরিচালনা করা যায় না। ফলে প্রতিষ্ঠানটিকে পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়ারও সুযোগ নেই।
পরিবেশ অধিদপ্তরের পটুয়াখালী জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক লোভানা জামিল বলেন, আমরা ইতিমধ্যে তথ্য পেয়েছি যে চরমোন্তাজে একটি আবাসন প্রকল্পের পাশে একটি আইচ ফ্যাক্টরি স্থাপন করা হচ্ছে। তাদেরকে আমরা ইতোমধ্যে নোটিশ করেছি যে ওখানে স্থাপন করার কোনো সুযোগ নাই। তারপরও যদি তারা সেখানে সেটি স্থাপন করে থাকে তাহলে আমাদের আইন অনুযায়ী যে ব্যবস্থা রয়েছে তা গ্রহণ করব।
এদিকে বরফকলটি যে জমিতে নির্মাণ করা হচ্ছে সেটিও সরকারি খাস সম্পত্তি বলে জানা গেছে। মান্তা সম্প্রদায়ের জন্য নির্মিত আবাসন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে রাঙ্গাবালী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়।
রাঙ্গাবালী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা অজিত চন্দ্র দেবনাথ বলেন, জমির বিষয়টি আমরা দেখি না। তবে আমরা জানি, আবাসনের পাশের জমিটি সরকারী খাঁস সম্পত্তি।
রাঙ্গাবালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিরুপম মজুমদার বলেন, বরফকলের ব্যপারটি আমরা জানার পরে আমরা কাজ বন্ধ করে রেখেছি। এটা আমরা উচ্ছেদ করে দেব। এটি নিয়ে একটি তদন্ত হয়েছে যার প্রতিবেদন আমরা জেলা প্রশাসক মহোদয়ের কাছে দিয়েছি।
সোহাইব মাকসুদ নুরনবী/আরকে
