বিজ্ঞাপন

তিস্তায় পানির সঙ্গে বাড়ছে বিপদ, রংপুর অঞ্চলে বন্যার আভাস

তিস্তায় পানির সঙ্গে বাড়ছে বিপদ, রংপুর অঞ্চলে বন্যার আভাস

উজানে ভারতের অরুণাচল প্রদেশে ভারি বৃষ্টি ও দেশের অভ্যন্তরে অতি ভারি বৃষ্টির কারণে রংপুর অঞ্চলের বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বেড়েছে। তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি দিয়ে বয়ে যাচ্ছে।

শনিবার (২০ জুন) রাত থেকে রোববার দুপুর ১২টা পর্যন্ত ১৭ দশমিক শুন্য এক মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। তবে উজান থেকে ধেয়ে আসা ঢলে তিস্তাসহ উত্তরাঞ্চলের অঞ্চলের অন্যান্য নদ-নদীতে পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে বিপদও। নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল তলিয়ে যাওয়ার সঙ্গে নতুন করে ভাঙনও দেখা দিয়েছে।

পানি প্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার মহিপুরে দ্বিতীয় তিস্তা সেতু রক্ষা বাঁধে এলজিইডির ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ে বসানো বাঁশের পাইলিং ভেঙে গেছে। এতে হুমকির মুখে রয়েছে সেতুসহ রংপুর-লালমনিরহাট আঞ্চলিক সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। প্রতিদিন এই সড়ক সেতু হয়ে অন্তত ৩০-৩৫ হাজার মানুষ যাতায়াত করে থাকে।

সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, সেতুটির উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে নির্মিত ৯০০ মিটার সেতু রক্ষা বাঁধের ১৫০ মিটারের বেশি অংশ ভেঙে গভীর গর্ত তৈরি হয়েছে। এতে চরম ঝুঁকিতে রয়েছে রংপুর-লালমনিরহাট জেলার মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা। দ্রুত স্থায়ী সমাধানে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে গুরুত্বপূর্ণ এই আঞ্চলিক সড়ক ধ্বসে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। যদিও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে প্রশাসন।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ডালিয়া ডিভিশনের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, রোববার সকাল ৯টায় তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ২৩ সেন্টিমিটার এবং কাউনিয়া তিস্তা সেতু পয়েন্টে ২৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। তবে দুপুরে পানি প্রবাহ কিছুটা বেড়ে বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। এ পয়েন্টে তিস্তা নদীর বিপৎসীমা নির্ধারিত হয়েছে ৫২ দশমিক ১৫ মিটার। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাটই খোলা রাখা হয়েছে।

এদিকে, তিস্তা নদীতে পানিপ্রবাহ বেড়ে যাওয়াতে রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। পানি আরও বাড়লে রংপুরের গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া ও পীরগাছা উপজেলার তিস্তা-সংলগ্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি ফসলি জমি পানিতে ডুবতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। একইসঙ্গে গঙ্গাচড়ার লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নে সেতু রক্ষা বাঁধে ধ্বসের কারণে তিন গ্রামের ১ হাজারের বেশি পরিবার হুমকির মুখে রয়েছে।

মহিপুর তিস্তার চর এলাকার কৃষক মকবুল হোসেন বলেন, উজানের পানির প্রবাহ দেখে মনে হচ্ছে এবার বড় ধরনের বন্যা হতে পারে। খেতে তেমন ফসল না থাকলেও আমন ধানের চারা তৈরির জন্য প্রস্তুত করা বীজতলা পানিতে তলিয়ে গেছে।

চর ইচলি এলাকার কৃষক আমজাদ আলী জানান, তার দেড় বিঘা জমিতে আবাদ করা বাদামের খেত পানিতে ডুবে গেছে। পানি দীর্ঘস্থায়ী হলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। একইসঙ্গে সেতু রক্ষা বাঁধে ভাঙন নিয়েও শঙ্কার কথা জানান তিনি।

লক্ষ্মীটারী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল হাদী বলেন, গত বছর যখন সেতু রক্ষা বাঁধটিতে ভাঙন ধরে তখন আমরা এলজিইডিকে বলেছিলাম ব্লক দিয়ে ভাঙন ঠেকাতে। কিন্তু তখন তারা সেটা শোনেননি। ১৪ লাখ টাকা দিয়ে সামনে বাঁশের পাইলিং করেছিল। এবার সেই পাইলিংও শেষ, আবারও ভাঙন দেখা দিয়েছে। এ পরিস্থিতি ঠেকানো না গেলে সেতুর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যেতে পারে। তারা শুধু সরকারি অর্থ নয়-ছয়ের কারণেই এই পরিণতি।

অন্যদিকে, রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও কুড়িগ্রাম জেলায় বন্যার শঙ্কার কথা জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। এতে নদীর দুই তীর উপচে চরাঞ্চলের আবাদি জমি তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় দিশাহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সহকারী প্রকৌশলী নুসরাত জাহান জেরিন জানিয়েছেন, ভারি বৃষ্টিপাতে উত্তরের চার জেলা নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও রংপুর জেলায় নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। টানা বৃষ্টির কারণে বন্যা পরিস্থিতি থাকতে পারে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লালমনিরহাটের বিভিন্ন উপজেলার নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের কিছু ফসলের খেত পানিতে ডুবে গেছে। একই অবস্থা কুড়িগ্রামেও। তিস্তা নদীর পাশাপাশি দুধকুমর, ধরলা ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানিও বাড়তে শুরু করেছে। ফলে নদনদী তীরবর্তী এ জেলার চরাঞ্চলের মানুষজন পড়েছেন দুশ্চিন্তায়।

লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী এলাকার কৃষক শামসুল হক জানান, শনিবার ভোরেই তাদের এলাকায় তিস্তার পানি ঢুকে পড়েছে। পানি আর কিছুটা বাড়লে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। নদীর পানি যেভাবে বাড়ছে, তাতে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ভোগ দেখা দিতে পারে।

কালীগঞ্জ উপজেলার চর শৌলমারী এলাকার কৃষক নজরুল ইসলাম জানান, তাদের পুরো চর ইতোমধ্যে পানিতে তলিয়ে গেছে। আপাতত তারা বাড়িতে অবস্থান করলেও পানি আরও বাড়লে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হবে। তিনি বলেন, কয়েক দিন ধরে রাতে বৃষ্টির পাশাপাশি উজান থেকে প্রচুর পাহাড়ি ঢল নেমে আসছে।

ডালিয়া পয়েন্টের পানি পরিমাপক নুরুল ইসলাম বলেন, সকাল থেকে তিস্তার পানি বাড়ছে। দুপুর ১২টায় তা বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি নিয়ন্ত্রণে ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে।

ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তিস্তার পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভারত গজলডোবা ব্যারেজের গেট খুলে দিয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যারাজের সবগুলো জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে। নদী তীরবর্তী মানুষকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

দেশের অভ্যন্তরে ভারি থেকে অতি ভারি ও উজানে ভারতের অরুণাচল প্রদেশে ভারি বৃষ্টিপাতের দরুণ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বেড়েছে। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে যেকোনো সময় তিস্তার পানি বিপৎসীমা উপচে যেতে পারে।

রংপুর বিভাগীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবিব বলেন, নদ-নদীর পানির উচ্চতা বৃদ্ধি ও নদীতীরবর্তী ভাঙন পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, দুধকুমার, গঙ্গাধর, জিঞ্জিরাম ও ঘাঘট নদীতে আপাতত বন্যা পরিস্থিতি না থাকলেও তিস্তাপাড়ে বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।

ফরহাদুজ্জামান ফারুক/এএমকে