ঢাকা-ময়মনসিংহ-জামালপুর রেলপথে একের পর এক ইঞ্জিন বিকল, লাইনচ্যুতি ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ট্রেন চলাচল নিয়মিতভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। এতে সময়সূচি ভেঙে পড়ছে এবং দীর্ঘ সময় যাত্রীরা ট্রেনের ভেতরে বা স্টেশনে আটকে থেকে দুর্ভোগে পড়ছেন।
রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি (জুন) মাসে দুটি ট্রেন লাইনচ্যুত হয়েছে এবং তিনটি ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হয়েছে। মে মাসে আটটি এবং এপ্রিল মাসে ছয়টি ইঞ্জিন বিকলের ঘটনা ঘটে।
সর্বশেষ ১৫ জুন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে গফরগাঁও এলাকায় আন্তনগর জামালপুর এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন ও বগির সংযোগস্থলের হুক ভেঙে ইঞ্জিনটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এতে প্রায় দুই ঘণ্টা ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে।
একই দিন সন্ধ্যার আগে চট্টগ্রাম থেকে জামালপুরগামী বিজয় এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন ঈশ্বরগঞ্জের আঠারবাড়ি স্টেশন এলাকায় আগুন ধরে বিকল হয়ে পড়ে। এতে প্রায় তিন ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। পরে বিকল্প ইঞ্জিন দিয়ে ট্রেনটি চালু করা হলেও কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরের সরারচর এলাকায় সেটিও বিকল হয়ে যায়। ইঞ্জিন সংকটের কারণে সেদিন চট্টগ্রামগামী ময়মনসিংহ এক্সপ্রেস মেইল ট্রেনের যাত্রা বাতিল করতে হয়।
এর আগের ঘটনাগুলোর মধ্যে ১৩ জুন ময়মনসিংহ স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা তিস্তা এক্সপ্রেসের এসি চেয়ার কোচে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। ১০ জুন আনন্দ মোহন কলেজ রেলক্রসিং এলাকায় জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ থেকে ঢাকাগামী ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেসের একটি পাওয়ার কার লাইনচ্যুত হয়। উদ্ধার কার্যক্রম চলাকালে কৃষ্টপুর এলাকায় উদ্ধারকারী ট্রেনটিও লাইনচ্যুত হয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়।
রেলওয়ের স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক এসব ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তালিকা কেন্দ্রীয়ভাবে ঢাকায় সংরক্ষিত থাকে, তাই স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া কঠিন।
ময়মনসিংহ লোকোশেডের পরিদর্শক শফিউল হাসানের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসে তিনটি, গত মাসে আটটি এবং তার আগের মাসে পাঁচটি ইঞ্জিন বিকল হয়েছে। তার মতে, পুরোনো ইঞ্জিন এবং দুর্বল রেলপথের কারণে নির্ধারিত গতিতে ট্রেন চালালে এসব সমস্যা বেশি হচ্ছে। অনেক সময় পূর্ণাঙ্গ মেরামত শেষ হওয়ার আগেই ইঞ্জিন পুনরায় চলাচলে নামানো হয়। এ কারণে রেলপথ সংস্কারের জন্য একাধিকবার সংশ্লিষ্ট বিভাগে চিঠিও দেওয়া হয়েছে।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, ময়মনসিংহ অঞ্চলে ঢাকা, জামালপুর, নেত্রকোনা ও চট্টগ্রাম রুটে মোট ১৮ জোড়া ট্রেন চলাচল করে। এর মধ্যে আটটি আন্তনগর, চারটি কমিউটার, একটি মেইল এবং পাঁচটি লোকাল ট্রেন রয়েছে। তবে ইঞ্জিন ও কোচ সংকটের কারণে ভাওয়াল ও ধলেশ্বরী নামে দুটি মেইল ট্রেন, মোহনগঞ্জগামী দুটি লোকাল ট্রেন এবং জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জগামী একটি লোকাল ট্রেন বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই অঞ্চলের বেশিরভাগ ইঞ্জিনই পুরোনো ও মেয়াদোত্তীর্ণ। চলাচলের সময় অতিরিক্ত গরম হয়ে অনেক ইঞ্জিন বিকল হয়ে যাচ্ছে। একইসঙ্গে রেললাইনে পাথর, স্লিপার ও নাট-বল্টুর ঘাটতি থাকায় লাইনের অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে, ফলে ধীরগতিতে ট্রেন চালাতে হচ্ছে। তাদের মতে, নতুন ইঞ্জিন সংযোজন এবং রেলপথ সংস্কার ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়।
রেলওয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল হাসান বলেন, লাইনচ্যুতির ঘটনা তুলনামূলকভাবে কম হলেও ইঞ্জিন বিকলের সমস্যা নিয়মিত হচ্ছে। তার মতে, অধিকাংশ ইঞ্জিন মেয়াদোত্তীর্ণ, তাই নতুন ইঞ্জিন সংগ্রহ জরুরি। পাশাপাশি শ্রীপুর থেকে ময়মনসিংহ হয়ে বিদ্যাগঞ্জ, গৌরীপুর, আঠারবাড়ি, মোহনগঞ্জ ও জারিয়া পর্যন্ত রেলপথ সংস্কার প্রয়োজন। পাথর কমে যাওয়ায় লাইনে চাপ পড়ে এবং লাইন ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। সংস্কার হলে লাইনচ্যুতি কমবে এবং ট্রেনের গতি বাড়বে বলেও তিনি জানান। এ বিষয়ে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে একটি প্রকল্প প্রণয়নের কাজ করছে।
ময়মনসিংহ রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আকতার হোসেন বলেন, পুরোনো ইঞ্জিনের মোটর দুর্বল হয়ে অতিরিক্ত গরম হয়ে পড়ে, ফলে ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। দীর্ঘক্ষণ চললে তাপ ও চাপ বেড়ে ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায় এবং ট্রেন থেমে যায়। তার মতে, পুরোনো রেললাইনের পুরুত্বও বর্তমান চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, তাই লাইন পরিবর্তন করা জরুরি।
সাখাওয়াত সুমন/এএমকে
