বিজ্ঞাপন

‘অপরিকল্পিত’ সেতু কেড়ে নিচ্ছে ভৈরব নদের প্রাণ!

‘অপরিকল্পিত’ সেতু কেড়ে নিচ্ছে ভৈরব নদের প্রাণ!

যশোরের অভয়নগরবাসীর স্বপ্নের ভৈরব সেতু কেড়ে নিচ্ছে নদের প্রাণ। প্রবাহমান নদে অপরিকল্পিত সেতু নির্মাণ করে চরম হুমকির মধ্যে রয়েছে ভৈরব নদ। সেতুর পিলারে পলি জমে নাব্যতা হারাচ্ছে প্রতিনিয়ত। কোটি কোটি টাকার ড্রেজিং করেও নাব্যতা ফেরানো যাচ্ছে না। ফলে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে নওয়াপাড়া নৌ বন্দর।

জেলা এলজিইডি কার্যালয় সূত্র জানায়, ৭০২ দশমিক ৫৫ মিটার দীর্ঘ এবং ৫ দশমিক ৫০ মিটার প্রস্থের ভৈরব সেতুটি নির্মাণ করা হয় ৮৫ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ব্যয়ে। পরে প্রায় আরো এক কোটি টাকা ব্যয়ে পেইন্টিং ও বৈদ্যুতিক বাতিসহ দৃষ্টিনন্দন করা হয়। সেতুটিতে মোট ৮টি পায়ার ও ১৬টি স্প্যান রয়েছে। সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৪ সালের ৩০ নভেম্বর। নির্মাণ করে ঢাকার যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স-রানকেন গ্রুপ। ২০১৯ সালের জুনে সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হয়।

২০২২ সালের ২২ নভেম্বর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে ভৈরব সেতুর উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের পর ওই দিন সেতুটি আনুষ্ঠানিকভাবে চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। নান্দনিক সাজে সজ্জিত হওয়ায় সেতুটি এলাকাবাসীর বিনোদনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, বর্তমানে সেতুটিতে নান্দনিকতার লেশমাত্র নেই। বৈদ্যুতিক তারসহ সড়ক বাতি চুরি হয়েছে অনেক আগে। স্প্যানের জোড়ার মুখে বসানো কয়েকটি স্টিল পাতও খুলে নেওয়া হয়েছে। মূল নদের মধ্যে তিনটি পিলার রয়েছে। এছাড়া বাকি পিলারগুলো নদের দু’পাশের সংযোগ সড়ক পর্যন্ত বিস্তৃত। সেতুর উজান অংশে ১০-১৫টি জাহাজ জোয়ারের অপেক্ষায় নোঙর করে আছে। আর ভাটি অংশে ড্রেজার দিয়ে পলি অপসারণের কাজ চলছে। নদের দুই পাড়ে পলি জমে নদ শুকিয়ে খালে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেতুর পিলার নির্মাণের সময় নদে যে বাঁধ দেওয়া হয় ঠিক সে সময় থেকে নদীর বাঁক পরিবর্তন হতে থাকে। পূর্ব পাড়ের সামান্য ভাঙন সৃষ্টি হয় আর পশ্চিম পাড়ে বাঁক পরিবর্তিত হয়ে বিশাল চর জাগে। ওই চরে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে ঘাট গোডাউন।

সেতুর নিচে নাব্যতা সংকটে দুর্ঘটনা শিকার হচ্ছে জাহাজ। বাংলাদেশ লঞ্চ লেবার অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি জাহাজের মাস্টার হিমায়েত হোসেন বলেন, স্বাভাবিক জাহাজ চলাচলের জন্য নদীতে পানি থাকার প্রয়োজন ১৫ ফুট। কিন্তু ভাটির সময় ব্রিজের নীচেই মাত্র পাঁচ-ছয় ফুট পানি থাকে। যে কারণে ভাটির সময় ব্রিজের আগে জাহাজ নোঙর করে বসে থাকতে হয় জোয়ারের অপেক্ষায়। এতে করে জাহাজ মালিকদের অনেক ক্ষতি হচ্ছে। ব্রিজের তলে নিয়মিত ড্রেজার দিয়ে পলি অপসারণ করা হচ্ছে। কিন্তু কয়েক দিন পরে তা আবার ভরাট হয়ে যায়। ড্রেজিং করে ৩০ ফুট চওড়া একটি চ্যানেল সচল রাখা হয়। কিন্তু সেখানে বাঁক পড়ে যাওয়ায় জাহাজ ঘুরানোর সময় সেতুর পিলারে ধাক্কা খায়। গত দুই মাস আগে শ্রাবণ-১ জাহাজ ধাক্কা খেয়েছে। এর এক মাস পরে তমাল-১ নামে আরো একটি জাহাজ ধাক্কা খেয়েছে। এতে জাহাজ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্রিজ ও তেমনি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

অপরিকল্পিত সেতু

শিল্পবন্দর বাণিজ্য নগরী নওয়াপাড়ার প্রাণকেন্দ্র ভৈরব নদের বাজার খেয়াঘাট সংলগ্ন নুরবাগ। বাজার খেয়াঘাট থেকে সাড়ে তিন কিলোমিটার ভাটিতে ভাঙ্গাগেট নামক স্থানে সেতুটি নির্মিত হয়েছে। নওয়াপাড়া থেকে নড়াইল হয়ে ঢাকা যাওয়া সংযোগ সড়ক শুরু হয়েছে বাজার খেয়াঘাট থেকে। সেতুটি দূরে হওয়ার কারণে সাত কিলোমিটার ঘুরে আসতে হয় জনসাধারণের। যে কারণে মালামাল পরিবহন ছাড়া সেতু পার হয়ে কেউ নওয়াপাড়া বাজারে আসে না। তাই বাজার খেয়াঘাটে রয়ে গেছে প্রায় আগের মতোই। সেখানে খেয়ায় উঠে নদ পার হয় ভ্যান, মোটরসাইকেল, বাইসাইকেলসহ মানুষজন। মোটরসাইকেল পার করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন জনসাধারণ।

মাদরাসা শিক্ষক মিজানুর রহমান বলেন, প্রতিদিন বাজার খেয়াঘাট দিয়ে প্রায় দুইশত শিক্ষক ও আট থেকে দশ হাজার জনসাধারণ পারাপার হয়। সকালে খেয়ার জন্য বসে থাকতে হয় দীর্ঘক্ষণ। এতে অনেক সময় মাদরাসায় পৌঁছাতে দেরি হয়। সেতুটি বাজার খেয়াঘাটের কাছ দিয়ে হলে জনসাধারণ অনেক উপকৃত হতো।

সেতু নির্মাণ করার সময় রেলওয়ের কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি। যে কারণে সেতু হয়ে যশোর খুলনা মহাসড়কে ওঠার স্থানে রেলক্রসিংয়ে দীর্ঘদিন কোনো গেটম্যান ছিল না। পরে সেখানে কয়েকটি বড় বড় দুর্ঘটনার পরে এলাকাবাসীর উদ্যোগে একজন গেটম্যান নিয়োগ হয়েছে।

সেতুটি উদ্বোধনের পর পরই পূর্ব অংশে সেতু থেকে প্রায় ৩৫০ ফুট দূরে সংযোগ সড়কের বাম দিকে ৯০ ফুট এলাকাজুড়ে প্রতিরক্ষা দেয়ালের ব্লক ধসে পড়ে। সেতু থেকে প্রায় ৩০০ ফুট দূরে সংযোগ সড়ক ও প্রতিরক্ষা দেয়ালের মধ্যে প্রায় ১০০ ফুট এলাকাজুড়ে লম্বা ফাঁটল দেখা দেয়। প্রতিরক্ষা দেয়ালের নীচের দিকে পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় তখন প্রায় ২৫টি বাড়ি জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

মূল নদে পিলার ছাড়া সেতু করা সম্ভব

ভৈরব সেতুর নীচে মূল নদের প্রশস্ততা রয়েছে মাত্র ৮০ মিটার। এ ধরনের ছোট নদীতে মাঝখানে কোনো পিলারছাড়া সেতু করা সম্ভব ছিল বলে জানিয়েছেন কয়েকজন প্রকৌশলী। ঢাকার আর কে ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশনের চিফ প্রকৌশলী ইমরুল কায়েস বাচ্চু বলেন, আমরা এ ধরনের ছোট নদীতে পিলার ছাড়া সেতু করার জন্য সরকারকে পরামর্শ দিয়ে থাকি। তার মতে ভৈরব নদে সাসপেনশন ব্রিজ (ঝুলন্ত সেতু) অথবা স্টিল ট্রাস ব্রিজ র্নিমাণ করলে নদীর কোনো ক্ষতি হয় না। এ জাতীয় ব্রিজে খরচ কিছুটা বেশি পড়ে। তবে অধিক দৃষ্টিনন্দন হয়। যা এলাকাবাসীর বিনোদনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।

তদারকির অভাব

সেতুটি বর্তমানে তদারকি করার কেই নেই এমনটি মন্তব্য করেছেন অনেকে। উদ্বোধনের কয়েক মাস পর থেকে সেতুর দুই পাশ দিয়ে বসানো সড়ক বাতি চুরি হতে থাকে। বর্তমানে সেখানে কোন সড়ক বাতি নেই। সংঘবদ্ধ চোরেরা বৈদ্যুতিক তার চুরি করে নিয়ে গেছে। স্প্যানের স্টিলের কয়েকটি পাত খুলে নিয়ে গেছে চোরেরা। সড়কের পূর্বপাশে পানি জমে বড় বড় খাদের সৃষ্টি হয়েছে।

বিআইডব্লিউটিএর ড্রেজিং বাণিজ্য

ভৈরব সেতুর পিলারে পলি জমে নদের নাব্যতা হারাচ্ছে। সেখান দিয়ে ভাটার সময় খালি জাহাজ ও চলাচল করতে পারে না। তাই পিলালের আশপাশের পলি অপসারণের জন্য একটানা ড্রেজার চলমান থাকে। জানা গেছে, গত ২০২১ সালের ২৪ জুলাই থেকে বিআইডব্লিউটিএর প্রকৌশল (সংস্কার) বিভাগের আওতায় ভৈরব নদ সংস্কার তথা ড্রেজিং শুরু হয়। প্রকল্পটিতে প্রায় সাড়ে চারশত কোটি টাকার বরাদ্দ রয়েছে। এর আগে নওয়াপাড়া নৌ বন্দরকে সচল রাখতে ড্রেজিং বাবদ ৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু নৌযান শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, এই ড্রেজিংয়ে বন্দরের তেমন কোনো উপকার হয়নি। লাখ লাখ টাকা বন্দর কর্মকর্তার পকেটে যাচ্ছে।

নওয়াপাড়া নৌ বন্দরের সহকারী পরিচালক মাসুদ পারভেজ বলেন, নদী ড্রেজিংয়ের ব্যপারে আমার কোনো হাত নেই। এটা ড্রেজিং বিভাগ করে। এ বিষয়ে খুলনা বিভাগীয় পরিচালক শেখ রবিউল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনিও একই কথা বলেন। পরে ড্রেজিং বিভাগের কর্মকর্তা সিহাবুল ইসলামের মোবাইল ফোনে একাধিক বার কল করা হয় কিন্তু তিনি রিসিভ করেননি।

অভয়নগর উপজেলা প্রকৌশলী নাজমুল হুদা বলেন, ভৈরব সেতুর কোনো তথ্য আমার কাছে নেই। সেতুর তথ্য জানতে জেলা অফিসে যোগাগোগ করেন। সেতুর সড়কের বৈদ্যুতিক তার, লাইট চুরি বিষয়ে বলেন, শুনেছি অনেক আগেই তার-লাইট চুরি হয়েছে। এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নিয়েছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি থানা পুলিশকে মৌখিকভাবে বলেছি। বিভাগীয় নিয়মে লিখিত অভিযোগ করিনি।

যশোর জেলার র্নিবাহী  প্রকৌশলী আহমেদ মাহবুবুর রহমান বলেন, আপনার প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে আমার ফাইল খুলে দেখতে হবে। আমার হাতে এখন সময় নেই। তবে আমি সেতুর দুরাবস্থার কথা জানতে পেরে কয়েকদিন আগে সেতু দেখতে গিয়েছিলাম। সেখানকার সড়কের বাতি, তার চুরি হয়েছে। কিন্তু বিদ্যুৎ বিল বকেয়া রয়েছে ৮০-৯০ লাখ টাকা। এ টাকা আমি পরিশোধ করব কোথা থেকে। সেতুর পূর্বপাড়ের সংযোগ সড়কে আশি হাজার টাকার একটি বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। তা দিয়ে ইটের সলিং করা হবে।

রেজওয়ান বাপ্পী/আরকে