আকাশজুড়ে মেঘের আনাগোনা, কখনো ঝুম বৃষ্টি। গ্রামীণ খালের ঘোলা জলে বাঁশের তৈরি বিশাল কাঠামোর ওপর সাবধানে পা ফেলে এগিয়ে যাচ্ছেন ৬৫ বছর বয়সী জেলে রহমান মিয়া। পায়ের নিচে ভেজা বাঁশ, সামনে পাতা বিশাল খরা জাল। সামান্য অসাবধানতাই ডেকে আনতে পারে দুর্ঘটনা। কিন্তু জীবনের দীর্ঘ সংগ্রামে অভ্যস্ত রহমান মিয়ার কাছে এসব ঝুঁকি যেন নিত্যদিনের সঙ্গী।
স্থানীয় ভাষায়, খরা জাল নামে পরিচিত এই বিশেষ মাছ ধরার পদ্ধতি দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য বহন করছে। বাঁশ দিয়ে তৈরি কাঠামোর সঙ্গে বড় জাল স্থাপন করে পানির গতিপথ বুঝে তা খালের গভীরে নামিয়ে রাখা হয়। নির্দিষ্ট সময় পর জাল টেনে তোলা হলে মাছ উঠে আসে জালের ভেতর।
নরসিংদীর পলাশ উপজেলার ডাংগা ইউনিয়নের পাকুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা রহমান মিয়া। বাবা জাহাদ আলি। বয়স ৬৫ হলেও তাকে দেখে সহজে বয়সের ছাপ বোঝার উপায় নেই। কর্মচঞ্চল এই মানুষটির কাছে কাজই জীবনের শক্তি। কাজ ছাড়া তার ভালোই লাগে না। মাছ ধরা তার নেশা, শখ এবং জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পাকুরিয়া ব্রিজসংলগ্ন খালেই প্রতিদিন বসে মাছ ধরেন তিনি।

নয় সন্তানের বাবা রহমান মিয়া। পাঁচ ছেলে ও চার মেয়ের মধ্যে মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। ছেলেরা কেউ ফলের ব্যবসা করেন, কেউ মাছের ব্যবসা, আবার কেউ মিশুক চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু বয়সের ভারকে উপেক্ষা করে এখনও নিজ হাতে জাল ফেলেন রহমান মিয়া।
ভোর থেকেই শুরু হয় তার মাছ ধরার প্রস্তুতি। চলে দিনভর, কখনো কখনো রাতেও। বিশেষ করে বৃষ্টির দিনে মাছ পাওয়ার আশায় আরও বেশি সময় জালের দিকে নজর রাখেন তিনি। জালে ধরা মাছের একটি অংশ পরিবারের খাবারের জন্য রেখে বাকিটা বিক্রি করেন পাকুরিয়া ও কেন্দাবাজারে।
রহমান মিয়া বলেন, মাছ বিক্রি করে দিনে গড়ে ৫০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত আয় হয়। মৌসুমভেদে মাসে ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকার মতো আয় হয়। তবে সব দিন এক রকম যায় না।
তিনি বলেন, কপাল ভালো থাকলে দুই হাজার টাকার মাছও পাওয়া যায়, আবার কোনো কোনো দিন ২০০ টাকার মাছও ওঠে না। সবই আল্লাহর ইচ্ছা আর ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে। তার জালে প্রায়ই উঠে আসে টেংরা, পুঁটি, কই, বাইম, নলা ও বিভিন্ন প্রজাতির দেশি মাছ। এসব মাছই এখনও সচল রেখেছে তার জীবিকার চাকা।
রহমান মিয়া জানান, প্রায় ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে তিনি এই পদ্ধতিতে মাছ ধরছেন। বর্তমান সময়ে একটি খরা জাল ও এর বাঁশের কাঠামো তৈরি করতে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়। এছাড়া নিয়মিত মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণেও অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়।
তিনি বলেন, খরা জাল বেশি সময় পানিতে রাখা যায় না। পাঁচ থেকে ১০ মিনিটের মধ্যেই তুলে ফেলতে হয়। না হলে জালে আবর্জনা পেঁচিয়ে জাল ছিঁড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
জালের পাশেই বাঁশের খুঁটির ওপর পলিথিন ও চট দিয়ে তৈরি ছোট্ট একটি মাচা ঘর। রোদ, বৃষ্টি কিংবা রাতের অন্ধকারে এটাই তার একমাত্র আশ্রয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেখানে বসেই জালের পাহারা দেন তিনি।

স্থানীয় বাসিন্দা করিম শেখ বলেন, ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি রহমান চাচা এই খরা জাল দিয়ে মাছ ধরেন। ব্রিজের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় প্রায়ই তাকে মাছ ধরতে দেখি। তিনি মনের আনন্দে একাই মাছ ধরেন। এই বিলে এখনও ভালো ভালো দেশি মাছ পাওয়া যায়। মাঝে মধ্যে আমিও তার কাছ থেকে মাছ কিনি।
তবে এই পেশা এখন আর আগের মতো লাভজনক নয়। স্থানীয় মৎস্যজীবীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, নদী-খালের নাব্যতা সংকট, জলাশয় ভরাট এবং অবাধে নিষিদ্ধ জালের ব্যবহারের কারণে দিন দিন কমে যাচ্ছে দেশি মাছের প্রাপ্যতা।
রহমান মিয়া জানান, আগে একবার জাল ফেললেই অনেক মাছ পাওয়া যেত। এখন অনেক সময় কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করেও মাছ মেলে না। নদী-খাল ভরাট, পানি দূষণ এবং দেশি মাছের আবাসস্থল কমে যাওয়াকে তিনি এর অন্যতম কারণ বলে মনে করেন।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনিকা দাস বলেন, নরসিংদী একটি শিল্পনগরী হওয়ায় এখানে অসংখ্য কল-কারখানা রয়েছে। এসব কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য অনেক ক্ষেত্রে নদীতে নিঃসৃত হয়ে পানি দূষণের কারণ হচ্ছে। এ দূষণের প্রভাব শুধু নদীতেই সীমাবদ্ধ নয়, আশপাশের খাল-বিল ও জলাশয়েও ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছের সংখ্যা ক্রমেই কমে যাচ্ছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং দেশীয় মাছের প্রজাতি সংরক্ষণে মৎস্য বিভাগ নিয়মিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
বয়সের ভার, মাছের সংকট কিংবা অনিশ্চিত আয় কোনো কিছুই তাকে থামাতে পারেনি। খালের জলে প্রতিদিন নতুন আশায় জাল ফেলেন রহমান মিয়া। কখনো জাল ভরে ওঠে দেশি মাছে, কখনো ফিরতে হয় খালি হাতে। তবু নদী-খাল আর খরা জালকে ঘিরেই বেঁচে থাকার স্বপ্ন বুনে চলেছেন তিনি।।
আমিনুর রহমান সাদী/আরকে
