কাপ্তাই হ্রদের পানির স্তর অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় রাঙামাটি জেলা শহরের সঙ্গে চার উপজেলার লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এতে যাতায়াতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে জেলার চার উপজেলার লাখো মানুষ। একই কারণে পণ্য পরিবহনেও দুর্ভোগ বেড়েছে ব্যবসায়ীদের। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়া এবং চলমান তাপপ্রবাহের কারণে কাপ্তাই হ্রদের পানির স্তর কমে গিয়ে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
কাপ্তাই লেক ভরাট হওয়ার কারণে প্রতিবছর চার-পাঁচ মাস রাঙামাটির সঙ্গে ছয় উপজেলার নৌপথে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। লঞ্চ চলাচল বন্ধ হলেও যাত্রীরা ইঞ্জিনচালিত বোট ও স্পিডবোটে যাতায়াত করছেন। তবে এতে তাদের বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে এবং ছোট নৌযানে ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে পণ্য পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে কয়েকগুণ। স্থানীয়রা কাপ্তাই হ্রদে নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে জরুরি ভিত্তিতে ড্রেজিং কার্যক্রম শুরু করার দাবি জানিয়েছেন।
লঞ্চ ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ মাসের শুরুতে বাঘাইছড়ি-রাঙামাটি নৌপথে লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে এপ্রিলের শেষের দিকে জুরাছড়ি রুটেও লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এরপর পর্যায়ক্রমে বরকল ও নারিয়ারচর নৌপথেও লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। বর্তমানে এখনো এই ৪টি উপজেলায় লঞ্চ চলাচল বন্ধ রয়েছে।
১৯৬০ সালে কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ প্রকল্পের মধ্যমে কাপ্তাই হ্রদের সৃষ্টি হয়। তবে ৬৬ বছর পেরিয়ে গেলেও একবারও কাপ্তাই হ্রদে ড্রেজিং হয়নি। ফলে পলি জমে বিভিন্ন এলাকায় নাব্যতা কমে গেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রতিবছর শুষ্ক মৌসুমে একই সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় এবং ৪ থেকে ৫ মাস লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকে।
গত বছরের ডিসেম্বরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদিত প্রকল্পের আওতায় রাঙামাটি পার্বত্য জেলার কাচালং, রাইক্ষ্যং ও শলক নদী খননের অনুমোদন দেওয়া হলেও এখনো কার্যক্রম শুরু হয়নি।
মিজান অ্যান্ড তোফাজ্জেল লঞ্চের মালিক মো. আব্দুল হান্নান বলেন, প্রতিবছর শুষ্ক মৌসুমে কাপ্তাই হ্রদের পানি কমে যাওয়ায় আমরা লঞ্চ চালাতে পারি না। লঞ্চের মালিক হয়েও বাধ্য হয়ে বোট চালাতে হচ্ছে। তাছাড়া অনেক যাত্রী নিরাপত্তার কারণে বোটে যাতায়াত করতে চান না। বর্তমানে একদিন বোট চালালে তিন দিন বন্ধ রাখতে হয়। অতিদ্রুত কাপ্তাই হ্রদ খনন করা হলে যাত্রী ও লঞ্চ মালিক উভয়েই উপকৃত হবেন।
যাত্রী মো. রমজান আলী বলেন, পানি কম থাকায় বিভিন্ন জায়গায় লঞ্চ আটকে যাচ্ছে। অনেক সময় পানিতে নেমে যাত্রীদের লঞ্চ ঠেলতে হয়। লঞ্চে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে খুবই বিরক্ত লাগে। আগে যেখানে আড়াই ঘণ্টায় গন্তব্যে পৌঁছানো যেত, এখন সেখানে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা সময় লাগছে।
তিনি আরও বলেন, হ্রদে পানি কমে যাওয়ায় পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত খরচ গুনতে হচ্ছে। আগে নৌপথে মালামাল সরাসরি বাজারে পৌঁছে দেওয়া গেলেও বর্তমানে তা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে পরিবহন ব্যয় আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেছে।
লংগদুগামী যাত্রী মো. ইয়াকুব বলেন, হ্রদে পর্যাপ্ত পানি থাকলে আমাদের যাতায়াত অনেক সহজ হয়। কিন্তু বর্তমানে পানির স্বল্পতার কারণে যাতায়াত খুবই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন জায়গায় লঞ্চ আটকে যাওয়ায় যাত্রীদের পাশাপাশি লঞ্চ চালকদেরও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
রাঙামাটি রিজার্ভ বাজার লঞ্চ ঘাটের লাইনম্যান বিশ্বজিৎ দে বলেন, রিজার্ভ বাজার লঞ্চ ঘাট থেকে ছয়টি উপজেলার সঙ্গে নিয়মিত লঞ্চ চলাচল ছিল। বর্তমানে চারটি উপজেলায় লঞ্চ চলাচল বন্ধ রয়েছে। বৃষ্টিপাত না হলে কিছুদিনের মধ্যে বাকি দুইটি উপজেলায়ও লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে। কাপ্তাই হ্রদ ড্রেজিং করা হলে সারা বছর ছয়টি উপজেলাতেই লঞ্চ চলাচল স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে।
মোস্তফা কামাল রাজু/আরএআর
