গাজীপুরের কালিয়াকৈর পৌরসভায় চার দিন পর কেটেছে জলাবদ্ধতা। দৃশ্যমান হয়েছে ক্ষয়ক্ষতি। টানা চার দিনের জলাবদ্ধতায় ছোট বড় ব্যবসায়ী, বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, স্কুল, আবাসিক কলোনিগুলোতে কোটি কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। মুখ থুবড়ে পড়েছে জনবহুল এই এলাকার অর্থনৈতিক চাকা।
মঙ্গলবার (২৩ জুন)সকালে সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায় কালিয়াকৈর পৌরসভার ৭নং ওয়ার্ড বিশ্বাসপাড়া, হরিণহাটি, পল্লীবিদ্যুৎ, ৫নং ওয়ার্ডের ডাইনকিনি, হরতকিতলা এলাকা ঘুরে দেখা গেছে এমন চিত্র। গত ১৭ জুন থেকে ২০ জুন পর্যন্ত জলাবদ্ধতায় ভোগান্তিতে ছিলেন এসব এলাকার বাসিন্দারা। পানি সরে গেলেও এখন তাদের সামনে দাঁড়িয়েছে ক্ষয়ক্ষতির ভার সামলানোর কঠিন বাস্তবতা।
পৌরসভার হরিণহাটি এলাকায় আমার দোকান নামে একটি সুপার শপ ঘুরে দেখা যায়, জলাবদ্ধতা কাটলেও পুরো সুপার শপে সাজিয়ে রাখা মালামাল ও স্টোরে রাখা প্রায় ১৫ লাখ টাকার পণ্য চার দিনের জলাবদ্ধতায় ডুবে নষ্ট হয়ে গেছে।
একই এলাকার এক মুদি দোকান ব্যবসায়ী কবির মিয়া গত ১৫ তারিখ রাতে ২ লাখ টাকার চাল বিক্রির উদ্দেশ্যে দোকানে তুলেছিলেন। পরদিন ভোরে ২ ঘণ্টার বৃষ্টিতে পুরো দোকান ডুবে যায়। এতে সব চাল ভিজে নষ্ট হয়ে যায়।
পৌরসভার বিশ্বাসপাড়া এলাকায় আব্দুস সামাদ মিয়ার মুদি দোকানেও ছিল প্রায় ৪ লাখ টাকার মালামাল। এক মুহূর্তের মধ্যেই দোকানটি ডুবে যায়। খবর পেয়ে তিনি দোকানে এলেও ভেতরে প্রবেশের কোনো উপায় ছিল না। চার দিন পর পানি কমে গেলে দেখা যায় ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন।
একই এলাকার বাসিন্দা আফসানা খাতুন, তার মালিকানাধীন একটি টিনশেড আবাসিক কলোনির প্রায় ১৯টি কক্ষ ডুবে যায়। পানিবন্দি হয়ে কলোনির ভাড়াটিয়ারা চলে যায়। চার দিন পর তিনি কলোনিতে ফিরলেও ফিরে পাননি আগের অবস্থা। ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছেন তিনি।
ওই এলাকার বাসিন্দা চাকরিজীবী মো. মিজানুর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, রাতে অফিস থেকে ফিরে ঘুমিয়েছিলাম। সকালের দিকে অনুভব করি আমার বিছানা ভেজা ভেজা লাগছে। উঠে দেখতে পাই ঘরের ভেতর থৈ থৈ পানি। কোনরকম স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে নিরাপদ স্থানে গেছি। ঘর থেকে কিছুই বের করতে পারিনি। চার দিন পর পানি চলে গেলে ঘরে গিয়ে দেখি সব নষ্ট হয়ে গেছে। ফ্রিজ, টিভি, আসবাবপত্র সব নষ্ট।
মুদি দোকান ব্যবসায়ী কবির মিয়া ঢাকা পোস্টকে বলেন, কথা বলার মতো শক্তি শরীরে নাই। এনজিও থেকে টাকা নিছিলাম সব টাকা দিয়ে দোকানে মালামাল তোলা। এক বন্যায় আমার সব শেষ। এখন নতুন করে এই দোকান আর করার উপায় দেখি না।
আমার দোকান নামে সুপার শপের ম্যানেজার মাসুদুর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, রাতে সাজানো গুছানো সুপার শপটি রেখে গেলাম। সকালে এসে দেখি ভেতরে পানি, স্টোরে সব মালামাল সব ডুবে আছে। এমন অবস্থা আমি কখনোই দেখিনি। বর্ষাকালেও এতো পানি এই এলাকায় হয়নি কখনো। পানি চলে গেছে কিন্তু আমাদের সব ক্ষয়ক্ষতি চোখের সামনে ভেসে আছে।
পৌরসভার ৫নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা জসিম উদ্দিন বেপারি বলেন, ছোট থেকে বড় হলাম, দেশের কতো বড় বড় বন্য হইছে। আমাদের এলাকায় এমন পানি দেখিনাই। এইবার যে দুর্ভোগ আমরা দেখছি, তাতে বন্যাদুর্গত মানুষের কষ্ট টের পেলাম। ক্ষয়ক্ষতির বিষয় নাই বা বলি। ঘর থেকে যে পরিবার নিয়ে বের হইতে পারছি, সুস্থ আছি এটাই বড় বিষয়।
কালিয়াকৈর পৌরসভার পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা জাহিদুল আলম তালুকদার ঢাকা পোস্টকে বলেন, হাঠাৎ এমন পানিতে আমরাও হতবাক হয়ে গেছি। বিভিন্ন স্থানে নালা, খালগুলো ময়লা আবর্জনায় আটকে ছিল। আমরা সেসব পরিষ্কার করে ফেলেছি। পানি চলে গেছে, আমরা এখন পানি নিষ্কাশনের পথগুলো মনিটরিং করে স্থায়ী পরিকল্পনা করছি।
কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এইচ এম ফখরুল হোসাইন বলেন, জলাবদ্ধতা হয়ে এসব এলাকায় বহু মানুষের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। যেখানে মানুষ একটু স্বস্তির বাসস্থান আশা করে সেখানে এমন দুর্ভোগ আসলেই মেনে নেওয়ার মতো না। আমরা আমাদের জায়গা থেকে যথাসম্ভব চেষ্টা করেছি। ভবিষ্যতে যাতে এমন পরিস্থিতিতে না পড়তে হয় তার জন্য আমরা কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছি।
আশিকুর রহমান/আরকে
