রংপুর নগরীর হোটেল নর্থ ভিউয়ের ছাদ থেকে পড়ে নুজশাত জাহান (১৮) নামে এক কলেজছাত্রীর মৃত্যু ঘিরে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। তার আত্মহত্যায় প্ররোচণার অভিযোগে শাহরিয়ার আহম্মেদ সাকিন (২৫) নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) বিকেলে রংপুর মহানগর পুলিশের কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম নাজমুল কাদের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
গ্রেপ্তারকৃত শাহরিয়ার আহম্মেদ সাকিননগরীর ধাপ চিকলি ভাটা এলাকার ফোরকান আলীর ছেলে। তিনি রংপুর মেডিকেল কলেজের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী বলে জানিয়েছে পুলিশ। নিহত কলেজছাত্রী নুজশাত জাহানকে প্রাইভেট পড়াতেন সাকিন। তার সঙ্গে নুজশাতের সম্পর্ক ছিল বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত করেছে পুলিশ।
এদিকে আত্মহত্যায় প্ররোচণার অভিযোগ এনে প্রাইভেট শিক্ষক শাহরিয়ার আহম্মেদ সাকিনসহ অজ্ঞাত আরও ৪ থেকে ৫ জনকে আসামি করে মামলা করেছেন নিহতের বাবা নজরুল ইসলাম। ওই মামলায় নুজশাতের প্রাইভেট শিক্ষক সাকিনকে মঙ্গলবার গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
জানা গেছে, রংপুর নগরীর ব্যস্ততম এলাকা সেন্ট্রাল রোডে অবস্থিত হোটেল নর্থ ভিউয়ের ছাদ থেকে পড়ে নুজশাত জাহান নামে ওই ছাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল সোমবার (২২ জুন) বিকেল ৫টা ৪২ মিনিটের দিকে এ ঘটনা ঘটে। নিহত নুজশাত জাহান রংপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন। ঘটনার পর পুলিশ শাহরিয়ার আহম্মেদ সাকিনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয়। মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে ঘটনার বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে পুলিশ
এইচএসসি পরীক্ষার্থী নুজশাত জাহানের মৃত্যুর ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে পুলিশ। ওই ছাত্রী ছাদ থেকে পড়ে মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত প্রাইভেট শিক্ষক শাহরিয়ার আহম্মেদ সাকিনের সাথে কথা বলেছিল। এছাড়া গত ৯ মাস ধরে নুজশাতের সাথে সাকিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল এবং তাদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ হতো। যদিও সাকিন গণমাধ্যমকর্মীদের দেওয়া বক্তব্যে নিজেকে নির্দোষ দাবি করার চেষ্টা করেছেন।
শিক্ষককে পছন্দ করতেন নুজশাত
এদিকে পুলিশের কাছে আটকের পর শাহরিয়ার আহম্মেদ সাকিন গণমাধ্যমকর্মীদের জানান, নিহত কলেজছাত্রী নুজশাত জাহান তার শিক্ষার্থী ছিলেন। চারজনের ব্যাচে তাকে প্রাইভেট পড়াতেন। ওই শিক্ষার্থী তাকে পছন্দ করতেন বুঝতে পেরে তিনি আলাদা করে দেন। কিন্তু নুজশাতের মায়ের অনুরোধে পরে তাকে আরেকটি ব্যাচে পড়ানো শুরু করেন।
সাকিন আরও জানান, নুজশাত তাকে পছন্দ করার কারণে বিভিন্ন সমস্যার কথা বলে হোয়াটসঅ্যাপে কল ও ম্যাসেজ করতেন। এরপর নুজশাতের নম্বর ব্লক করে রাখেন তিনি। মৃত্যুর এ ঘটনার জন্য তিনি দায়ী নয় বলে দাবি করেন।
নিহত কলেজছাত্রীর পরিবারের অভিযোগ
নিহত শিক্ষার্থীর মা আফসানা পারভীন জানান, তার মেয়ে প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন। কখন, কীভাবে, কেন হোটেলের ছাদে গেলেন সে বিষয়ে তারা কিছুই জানেন না। তিনি মেয়ের মৃত্যুর ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করে জড়িতদের শাস্তির দাবি জানান ।
বাবা আনোয়ার হোসেন বলেন, আমার মেয়ে প্রতিদিনের ন্যায় সোমবার বিকেলে প্রাইভেট পড়ার জন্য বাসা থেকে বের হয়ে যায়। সে বাসা হতে প্রাইভেটের উদ্দেশ্যে বের হয়ে যাওয়ার সময় ৪-৫ জন অজ্ঞাত ছেলে বাসার আশপাশে মোটরসাইকেল নিয়ে ঘুরাঘুরি করে। পরে পুলিশের মাধ্যমে জানতে পারি হোটেল নর্থ ভিউয়ের সামনে মেয়ের লাশ পড়ে আছে। ঘটনাস্থলে গিয়ে মেয়ের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটির মেসেজসহ বিভিন্ন তথ্য ডিলেট অবস্থায় দেখতে পাই।
তিনি আরও বলেন, সিসিটিভির ক্যামেরা ফুটেজে দেখেছি আমার মেয়ে মোবাইল ফোনে কথা বলার পর ফোন রেখে ছাদের সামনে থাকা রেলিংয়ের ওপরে গিয়ে বসে। পরে বসা অবস্থায় হাত ছেড়ে দিলে নিচে পড়ে যায়। পরবর্তীতে বিভিন্ন মাধ্যমে শুনেছি আমার মেয়ের মোবাইলে প্রাইভেট শিক্ষক সাকিনের সাথে তোলা ছবি এবং বিভিন্ন কথোপকথোনের মেসেজ ছিল। ওই শিক্ষকের মানসিক নির্যাতনের কারণে আমার মেয়ে মৃত্যুর পথ বেচে নিয়েছে।
দায় নেবে কে, গাফিলতির কার?
স্থানীয়পত্রিকা দৈনিক দাবানলের বার্তা ও পরিকল্পনা সম্পাদক জিএম জয় বলেন, মেয়েটির বাসা খলিফাপাড়া। তার বাসার আশপাশে সুইসাইড করার জন্য শপিং কমপ্লেক্সের ছাদ কিংবা আরও অনেক উঁচু ভবন ছিল। কিন্তু সেখান থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে হোটেল নর্থ ভিউয়ে কেন আসতে হলো? কারো সাথে এসেছিল নয়তো কেউ তাকে আসতে বলেছিল এবং কেউ না কেউ তাকে এটা করতে বাধ্য করেছে। এর জন্য হোটেল নর্থ ভিউ কর্তৃপক্ষকেও দায় নিতে হবে। কারণ তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গাফিলতি রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ সময় ফোনে কথা বলছিলো মেয়েটা। সম্ভবত মোবাইল ফোনের ভিডিও কলে ছিলো কারো সাথে। তার মোবাইল ফোনটা ফরমেট দেয়া হয়েছে, কেন বা কারা ফরমেট দিলো? তার ফোন নম্বর ধরে প্রকৃত রহস্য বের করা সম্ভব। এছাড়াও হোটেল নর্থ ভিউয়ে প্রবেশ থেকে শুরু করে ছাদে যাওয়ার সিসিটিভি ফুটেজ তো সরবরাহ করা হয়নি। কেন শুধু ছাদের রেলিং থেকে পড়ে যাওয়ার ভিডিও প্রকাশ করা হলো, এটা তো রহস্যজনক। ধাপে প্রাইভেটে না গিয়ে আমার মেয়ে কেন হোটেল নর্থ ভিউয়ে গেল, সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে এসব প্রশ্নের উত্তর প্রশাসনকে বের করতে হবে।
হোটেলের ছাদে ঘণ্টাখানেক ছিলেন নুজশাত
পুলিশ ও হোটেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মেয়েটির হোটেলে কোনো কক্ষ বুকিং বা রেজিস্ট্রেশন ছিল না। বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটের দিকে বাইরে থেকে এসে সোজা হোটেলটির ৯ তলা ভবনের ছাদে যান নুজশাত। সেখানে প্রায় এক ঘণ্টা অবস্থান করেন। পরে রেলিংয়ের কাছে যান। একপর্যায়ে রেলিংয়ের ওপর বসলে হঠাৎ ভারসাম্য হারিয়ে নিচে পড়ে যান। সিসিটিভি ফুটেজে ওই সময় মেয়েটির আশপাশে অন্য কাউকে দেখা যায়নি।
মৃত্যুর মূল রহস্য উদ্ঘাটন সম্ভব, দাবি পুলিশের
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই দুর্ঘটনার সিসিটিভির ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে এক পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশে অনীহা জানিয়ে বলেন, ওই শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে নাকি কারো প্ররোচণায় এমনটা হয়েছে- তা খতিয়ে দেখতে হবে। তবে ফুটেজ দেখে কিছু বিষয়ে প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া যায় বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ভিকটিম (ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী) ছাদে বসে থেকে উঠার সময় তার মোবাইল ফোন রেখে আসে, যদি এটি অসাবধানতার কারণে এক্সিডেন্টাল হতো তাহলে তার মোবাইল ফোন হাতেই থাকত। রেলিংয়ের ওপর বসার সময় মেয়েটি তার পায়ের স্যান্ডেল রেখে রেলিংয়ে বসে, এতে তার সুইসাইডাল এটেম্প ও ইনটেনশনকে ইঙ্গিত করে। অসাবধানতাবশত হলে তার পায়ে জুতা থাকাটা স্বাভাবিক ছিল।
তিনি আরও বলেন, মেয়েটি প্রথমে তার বসার জায়গা থেকে উঠে এসে স্থান পরিবর্তন করে, যা তার মানসিক অস্থিরতার বহিঃপ্রকাশ বা ইঙ্গিত করে। মেয়েটি রেলিংয়ে বসা অবস্থা থেকে পড়ে যাওয়ার আগ মুহূর্তে ভয় কাটিয়ে উঠার জন্য নিজেকে পেছন দিক দিয়ে ফেলতে চেষ্টা করলেও অবচেতনভাবে শরীরের ওপরের অংশ দিয়ে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করে। পরে আবারো পা দিয়ে শরীরের ওপরের ভাগকে নিচে ফেলে দিয়ে নিজেকে শেষ করে দেন মেয়েটি। এই ঘটনাগুলো কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ঘটে।
এমন বিভিন্ন ঘটনার তদন্তের অভিজ্ঞতা থেকে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, মেয়েটির শরীরের ঘটনার সময়ে নিউরোনিক ইলেকট্রো-ম্যাগনেটিক এক রহস্যময় খেলা চলে। এছাড়াও মেয়েটির আত্মহত্যার মানসিক প্রবণতা ছিল কিনা? মানসিক স্বাস্থ্যর অবস্থাসহ আরও অনেক পারিপার্শ্বিক বিষয় ও অবস্থা (প্রেমঘটিত/ব্রেকআপ/পারিবারিক সুরক্ষা) এই মৃত্যুর কারণ হিসেবে নির্ভর করে। তবে ময়নাতদন্ত রিপোর্ট এবং তদন্তে পারিপার্শ্বিক অবস্থায় মূল রহস্য উদ্ঘাটিত হবে। এক্ষেত্রে মেয়েটির ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে নেপথ্যে থাকা অনেক প্রশ্নের উত্তর ও কারণ উদ্ঘাটন করা সম্ভব বলেও মনে করছেন তিনি।
যা বলছেন ডিবি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা
ঘটনার দিন বিকেলে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরপিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী সাংবাদিকদের বলেন, আমরা সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্য থেকে জানতে পেরেছি ঘটনার দিন বিকেল ৫টার কিছু আগে মেয়েটি হোটেল নর্থ ভিউয়ের ছাদে যান। দীর্ঘ সময় তাকে সেখানে বসে থাকতে দেখা যায়। কিছুক্ষণ হাঁটাচলা করেন, মোবাইল ফোনে কথা বলেন। অবশেষে বিকেল ৫টা ৪২ মিনিটের দিকে রেলিংয়ের ওপর বসেন। বসার পর হঠাৎ করে নিচে পড়ে যান। পরে সেখানে তার মৃত্যু হয়।
একদিন পর মঙ্গলবার (২৩ জুন) বিকেলে গোয়েন্দা বিভাগের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ঘটনার পর থেকে বিভিন্ন সূত্র ও তথ্য ধরে তদন্ত করা হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে মেয়েটির প্রাইভেট শিক্ষক শাহরিয়ার আহম্মেদ সাকিনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মেয়েটির সাথে ওই শিক্ষকের প্রেমঘটিত সম্পর্কের তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের এই সম্পর্কের জেরে এ ঘটনা হতে পারে বলে মেয়ের পরিবার থেকেও অভিযোগ করে একটি এজাহার করা হয়েছে। ওই এজাহারের প্রেক্ষিতে আটক সাকিনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, মেয়েটির কল লিস্ট বিশ্লেষণ করে জানতে পারি যে সাকিনের সাথে সম্পর্ক ছিল। এছাড়া তাদের বন্ধুরাও একই কথা বলেছে। আমাদের কাছে আরও তথ্য রয়েছে, যেগুলো ভেরিফাই করা হচ্ছে। তাদের প্রেমের সম্পর্ক প্রায় ৯-১০ মাসের। তাদের মাঝে কথা হতো, দেখা হতো এমন তথ্য আমাদের কাছে রয়েছে এবং সাকিন সেটি স্বীকারও করেছে। তাদের ফোনের ডিটেল চেক করে দেখা গেছে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সাকিনের সাথে কথা বলেছে নুজশাত। তবে ঘটনার সময় সাকিন সেখানে উপস্থিত ছিল না। আমরা সাকিনকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বিজ্ঞ আদালতে পাঠিয়েছি। এ ঘটনায় আরও তদন্ত চলছে।
আরএআর
