তিন বছর ধরে ঠিকমতো না খেয়ে, ভিক্ষা করে জমিয়েছিলেন এক লাখ ১৮ হাজার টাকা। স্বপ্ন ছিল সেই টাকা নিয়ে গ্রামের বাড়িতে ফিরে কিছু একটা করবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন ভেঙে যায় মুহূর্তেই। সাভারে এক যুবক তার সব সঞ্চয় লুট করে নিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বৃদ্ধ ভিক্ষুক নূর আলম। সর্বস্ব হারিয়ে এখন কান্নায় ভেঙে পড়েছেন তিনি।
‘আমি না খেয়ে প্রতিদিন ভিক্ষা করে এক দোকানে টাকা জমাইছি। প্রতিদিন ভিক্ষা করে যে টাকা পাইছি তা এক দোকান মালিকের কাছে জমাতাম। এ রকম করে তিন বছরে এক লাখ ১৮ হাজার টাকা জমাইছি। সেই টাকা বাড়িতে আনার পরই পাড়ার নেশাগ্রস্ত এক ছেলে ভাত খাওয়ানোর কথা বলে আমাকে ডেকে সব টাকা লুট করে নিয়েছে’- এভাবেই সর্বস্ব হারিয়ে আহাজারি করছিলেন বৃদ্ধ ভিক্ষুক নূর আলম।
সাভার পৌর এলাকার তালবাগ মহল্লায় মাহবুরে মালিকানাধীন ভাড়া বাড়িতে থাকেন ওই বৃদ্ধ ভিক্ষুক। সর্বস্ব হারিয়ে প্রায় এক মাস আগে থানায় অভিযোগ জানিয়েও কোনো সমাধান পাননি তিনি।
ভিক্ষুক নূর আলম বলেন, ‘আমি আট বছর আগে স্ত্রী ও এক কন্যা এবং এক ছেলেকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি বরিশাল থেকে সাভারে এসেছি। সেসময় সাভারে এসে সবজির ব্যবসা শুরু করি। তখন পরিবার নিয়ে সুখে দিন কাটছিল। কিন্তু তিন বছর আগে হঠাৎ স্ট্রোক করে অসুস্থ হয়ে পড়ি। তখন থেকে আমি আর কাজ পারি না। উপার্জন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমার স্ত্রী ও সন্তানদের কাছে দিন দিন বোঝা হয়ে উঠছিলাম। সেসময় অসুস্থ অবস্থায় ওই বাসা থেকে স্ত্রী আমাকে বের করে দেয়।’
তিরি জানান, সে একা হয়ে পড়লে আর কোনো উপায় না পেয়ে ভিক্ষা শুরু করেন। তখন মুদি দোকান মালিক লিটনের সঙ্গে পরিচয় হয় নূর আলমের। প্রতিদিনের ভিক্ষার টাকা জমা দিয়ে হিসেব রাখতেন তিনি। এভাবে তিন বছর ধরে টাকা জমান। কিন্তু কোরবানির ঈদের পরে জমানো টাকা দিয়ে গ্রামের বাড়িতে ফিরতে চেয়েছিলেন নূর আলম। সে কারণে মুদি দোকানি লিটনের কাছে টাকা ফেরত চান। গত মাসে ৩১ মে দোকান মালিক নূর আলমকে এক লাখ ১৮ হাজার টাকা ফিরিয়ে দেন। পরে সেই টাকা নিয়ে ভাড়া বাড়িতে ফেরেন নূর আলম। তবে একই এলাকার নেশাগ্রস্ত শামীম নূর আলমকে ভাত খাওয়ানের প্রলোভন দেখিয়ে ডেকে নেন। পরে নূর আলমের জমানো সব টাকা লুট করে পালিয়ে যান ওই যুবক। এরপরে ভুক্তভোগী ওই ভিক্ষুক সাভার মডেল থানায় একটি অভিযোগ দিয়েছেন।
দোকান মালিক লিটন ঢাকা পোস্টকে বলেন, নূর আলম প্রতিদিন ভিক্ষা করে যে টাকা পেত সেই টাকা আমার কাছে জমিয়েছিল। কোরবানি ঈদের পরে গ্রামের বাড়ি যাওয়ার জন্য টাকা ফেরত চায়। পরে আমার কাছে জমানো এক লাখ ১৮ হাজার টাকা ফেরত দিয়েছিলাম। এরপরে সে বাসায় চলে যায়। কিন্তু এক যুবক তার টাকা লুট করে নিয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী নাজমা বেগম বলেন, আমাদের পাশের কক্ষেই থাকে ভিক্ষুক নূর আলম। তিনি তিন বছর ভিক্ষা করে টাকা জমিয়ে বাসায় নিয়ে এসেছিল। কিন্তু রাস্তা দিয়ে আসার সময় অনেকেই তার লুঙ্গিতে করে টাকা নিয়ে আসার দৃশ্য দেখে ফেলে। সেসময় শামীম নূর আলমকে ভাত খাওয়ার জন্য ডেকে নেয়। এরপর সব টাকা লুট করে নিয়ে পালিয়ে যায়।
অভিযোগের বিষয়ে সাভার মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ফারুক হোসেন বলেন, ভিক্ষুকের অভিযোগের ভিত্তিতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সত্যতা পাওয়া গেছে। তবে অভিযুক্ত ছেলে পলাতক। কিন্তু অভিযুক্তের বাবা শাহ আলম এক লাখ টাকা দিতে রাজি হয়েছে। তবে সে প্রতি মাসে তিন হাজার টাকা করে দিয়ে পরিশোধ করতে চায়। কিন্তু ওই ভিক্ষুক এভাবে টাকা নিতে রাজি হয়নি। পরে তাকে মামলা করতে বলা হয়েছে।
লোটন আচার্য্য/আরকে
