জীবনের এক শতাব্দী পার করেও স্বস্তি মেলেনি আছিয়া বেগমের। বয়সের ভারে ন্যুব্জ এই শতবর্ষী নারী আজও লড়ছেন দারিদ্র্য, অনাহার ও অনিশ্চয়তার সঙ্গে। সাতক্ষীরার ধুলিহর ইউনিয়নের নাথপাড়ায় জরাজীর্ণ একটি টিনের ঘরে মানবেতর জীবন কাটছে তার। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তার একমাত্র চাওয়া- দুবেলা খাবার আর মাথা গোঁজার মতো একটি নিরাপদ আশ্রয়।
প্রায় ২০ বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকেই শুরু হয় তার সংগ্রামী জীবন। দুই ছেলে ও দুই মেয়ে থাকলেও সবার আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে কেউই নিয়মিতভাবে তার দায়িত্ব নিতে পারছেন না। ফলে একটি জরাজীর্ণ টিনের ঘরই এখন তার একমাত্র আশ্রয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, মরিচাধরা টিনের চালা ও নড়বড়ে কাঠামোর ঘরটি যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে। সামান্য বৃষ্টি হলেই ঘরের ভেতরে পানি ঢুকে পড়ে। বিছানা, কাপড়সহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ভিজে যায়। ঝড়-বৃষ্টির রাতে আতঙ্কে ঘুমাতে পারেন না আছিয়া বেগম। ভাঙা দরজা-জানালার কারণে সাপ-পোকামাকড়ের ভয়ও সবসময় তাড়া করে বেড়ায় তাকে।
জীবনযাপনের একমাত্র অবলম্বন সরকারের বয়স্ক ভাতা। প্রতি তিন মাসে তিনি পান ১ হাজার ৮০০ টাকা, অর্থাৎ মাসে মাত্র ৬০০ টাকা। বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে এই অর্থ দিয়ে খাবার, ওষুধ কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ চালানো প্রায় অসম্ভব। ফলে অনেক সময় না খেয়েই দিন কাটাতে হয় তাকে।
বার্ধক্যজনিত নানা রোগেও ভুগছেন আছিয়া বেগম। উচ্চ রক্তচাপ, বাতের ব্যথাসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় কষ্ট পেলেও অর্থাভাবে নিয়মিত চিকিৎসা নিতে পারেন না। ওষুধ কেনাও তার জন্য হয়ে উঠেছে বিলাসিতা।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে আছিয়া বেগম বলেন, আমি আর কিছু চাই না বাবা। শুধু দুইবেলা পেট ভরে ভাত খেতে চাই। একটা ভালো ঘর চাই, যাতে বৃষ্টির সময় ভিজতে না হয়। এইটুকুই আমার শেষ আশা।
এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আছিয়া বেগমের দুই মেয়ে বিবাহিত এবং তাদের আর্থিক অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। অভাবের সংসারের কারণে তারা মায়ের খোঁজ নিতে পারেন না। বড় ছেলে আলী হোসেন (৬৫) সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের একটি ঘরে স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করেন। বড় ছেলে আলী হোসেনের দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে, তবে তারাও আলাদা আলাদা স্থানে বসবাস করেন।
আছিয়া বেগমের ছোট ছেলে ইয়াকুব হোসেন (৫৩) দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন। তিনি একটি চায়ের দোকানে কাজ করেন এবং তার স্ত্রী বাসাবাড়িতে কাজ করেন। জানা গেছে, মায়ের সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ নেই।
বড় ছেলে আলী হোসেন বলেন, আমার আব্বা তেমন কিছু রেখে যেতে পারেননি। তাই আমাদের পরিবারের অবস্থাও ভালো না। মা তার বাবার বাড়ি থেকে দুই শতক জমি পেয়েছিলেন, সেখানেই এখন থাকেন। মাকে দেখার ইচ্ছা তো থাকে, কিন্তু নিজেরাই তো চলতে পারি না, তাই নিয়মিত খেয়াল রাখা হয় না। দুইটা বোন আছে, তাদেরও সংসারে অভাব। ছোট ভাই ঢাকায় চলে গেছে, আর ফিরে আসেনি।
একই এলাকার বাসিন্দা আমিনুর রহমান বলেন, আছিয়া বেগমের অবস্থা খুব করুণ। দীর্ঘদিন ধরে তিনি মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বৃষ্টি হলে ঘরের ভেতরে পানি ঢুকে যায়, অনেক সময় ঠিকমতো খাবারও জোটে না। আমরা প্রতিবেশীরা সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করার চেষ্টা করি, কিন্তু একজন শতবর্ষী বৃদ্ধার জন্য তা যথেষ্ট নয়। সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের দ্রুত এগিয়ে আসা উচিত।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অর্ণব দত্ত বলেন, সামনের অর্থবছরের বরাদ্দ এলে তাকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।
তবে স্থানীয়দের দাবি, শুধু আশ্বাস নয়, এখনই দরকার কার্যকর উদ্যোগ। একটি নিরাপদ বাসস্থান, নিয়মিত খাদ্য সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে আছিয়া বেগমের জীবনের শেষ সময়টুকু অন্তত স্বস্তিতে কাটতে পারে।
ইব্রাহিম খলিল/আরকে
