সোনালী ব্যাংকের যশোরের ঝিকরগাছা শাখা থেকে বছরের পর বছর মৃত এক মুক্তিযোদ্ধাকে জীবিত দেখিয়ে তার অ্যাকাউন্ট থেকে লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে ব্যাংকটির কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া আরেক মৃত মুক্তিযোদ্ধার মৃত স্ত্রীকেও জীবিত দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে সেই মুক্তিযোদ্ধার পরিবারকেও ভাতা দেওয়া হয়েছে। জাহাঙ্গীরের এসব কাণ্ডে অস্বস্তিতে পড়েছে সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
অভিযোগ রয়েছে, একের পর এক ঘটনার তদন্ত হলেও অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে ব্যাংকের ২২ কর্মকর্তার ভাগ্য ঝুলে আছে। তাদের মধ্যে কাউকে শোকজ, কাউকে সাময়িক বরখাস্ত অথবা কাউকে পদোন্নতিবঞ্চিত করে রাখা হয়েছে প্রায় ১০ বছর ধরে। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় ব্যাংকটির নীতিনির্ধারকদের বিরুদ্ধে অন্যায়ের পক্ষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনার শুরু ২০১৩ সালে। সাবেক প্রতিমন্ত্রী ঝিকরগাছার রফিকুল ইসলামের স্বাক্ষর জাল করে তার অ্যাকাউন্ট থেকে এক লাখ ১০ হাজার টাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে অপকর্ম শুরু করেন জাহাঙ্গীর আলম। জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে একই বছরের ডিসেম্বরে উপজেলার হাজিরবাগের বীর মুক্তিযোদ্ধা ওয়ালিউর রহমান ও গঙ্গানন্দপুরের মৃত মুক্তিযোদ্ধা ইদ্রিস আলীর স্ত্রী মৃত আমেনা খাতুনকে জীবিত দেখিয়ে ভাতা উত্তোলন শুরু করেন তিনি। পাঁচ বছর ধরে এভাবে অর্থ আত্মসাতের পর ২০১৮ সালের জুন মাসে ধরা পড়েন জাহাঙ্গীর। তদন্তে বেরিয়ে আসে, দুই মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও স্বজনদের স্বাক্ষর জাল করে প্রায় ১০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন তিনি। এ কাজে তার সহযোগী হিসেবে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা দীনেশ চন্দ্র ও আব্দুর রাজ্জাকের নামও উঠে আসে।
বিষয়টি নজরে এলে উপজেলা প্রশাসন ও ব্যাংকটির অডিট কমিটি দীর্ঘ তদন্ত শেষে জাহাঙ্গীর আলমকে দায়ী করে প্রতিবেদন দেয়। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। প্রায় চার বছর ধরে সাময়িক বরখাস্ত অবস্থায় আছেন ওই কর্মকর্তা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করলেও জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। ২০২০ ও ২০২১ সালের সব তদন্ত প্রতিবেদন তাঁর বিপক্ষে গেলেও ২০২২ সালে আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমু স্বাক্ষরিত একটি ডিও লেটারের মাধ্যমে পুনর্তদন্ত করান অভিযুক্ত জাহাঙ্গীর। সেই প্রতিবেদনও তাঁর বিপক্ষে যাওয়ার পর আমির হোসেন আমুর ভাগ্নিজামাই সোনালী ব্যাংকের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী আফজাল করিমের নির্দেশে প্রায় ২০ জন ব্যাংক কর্মকর্তাকে জড়িয়ে প্রতিবেদন দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই কর্মকর্তাদের কাউকে শোকজ, কাউকে সাময়িক বরখাস্ত এবং কাউকে পদোন্নতিবঞ্চিত করা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অভিযুক্ত এক কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় পদোন্নতি আমাদের অধিকার। কিন্তু অন্যের দায়ে আমাদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। আমরা এর সমাধান চাই। কারণ এর মধ্যে কেউ অবসরে গেলে তিনি বিনা দোষে শাস্তি পাবেন।
তিনি আরও বলেন, এখনো প্রভাব খাটিয়ে যাচ্ছেন অভিযুক্ত জাহাঙ্গীর আলম। আগের সরকারের আমলেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি, এখনও নেওয়া যাচ্ছে না।
মৃত মুক্তিযোদ্ধা ইদ্রিস আলীর স্ত্রী মৃত আমেনা খাতুনের ছেলে আবু সামা জানান, তার মা মারা যাওয়ার পর ব্যাংক কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর বলেন, পুরোনো চেকবইয়ে আর টাকা তোলা যাবে না, নতুন বই করতে হবে। সে অনুযায়ী পুরোনো চেক জমা দিলে নতুন চেকবই দেওয়া হয়। কিন্তু পুরোনো অ্যাকাউন্ট বন্ধ করা হয়নি। পরে জাহাঙ্গীর সেই অ্যাকাউন্ট থেকে পাঁচ বছর ধরে টাকা তুলেছেন।
আবু সামা বলেন, আমরা নতুন বই থেকে টাকা তুলেছি। তিনি তুলেছেন পুরোনো বই থেকে। দুটো অ্যাকাউন্টে টাকা গেছে— এ দায় তো আমাদের নয়, দায় ব্যাংকের। অথচ আমাদের ভাতা বন্ধ রাখা হয়েছে।
মৃত আমেনা খাতুনের পুত্রবধূ সালেহা বেগম বলেন, শাশুড়ির মৃত্যুর পর কিছুদিন ভাতা বন্ধ ছিল। পরে বড় সন্তানের নামে অ্যাকাউন্ট খুলে টাকা দেওয়া হয়। তখন মৃত্যুসনদও জমা দিয়েছিলাম।
তিনি জানান, আমেনা খাতুন নিরক্ষর ছিলেন। জীবিত থাকতে মুক্তিযোদ্ধা দীনেশ চন্দ্রের সহযোগিতায় টিপসই দিয়ে টাকা তুলতেন।
বীর মুক্তিযোদ্ধা দীনেশ চন্দ্র মিস্ত্রী অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন,তদন্ত দল আমাকে অনেকবার জিজ্ঞাসাবাদ করেছে, কিন্তু আমার সংশ্লিষ্টতা পায়নি। প্রমাণ পেলে শাস্তি মাথা পেতে নেব।
গঙ্গানন্দপুরের বীর মুক্তিযোদ্ধা ওয়ালিউর রহমান খানের ভাগ্নে আব্দুল্লাহ পারভেজ খান বলেন, মামার মৃত্যুর দুই-তিন দিন পর স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা খন্দকার আব্দুর রাজ্জাক তাকে বলেন, মামার কোনো উত্তরসূরি নেই, তাই ভাতা আর তোলা যাবে না এবং চেকবই সমাজসেবা অফিসে জমা দিতে চান। সাত-আট বছর পর ব্যাংকের কর্মীরা তার বাড়িতে এসে জানান, তিনি নাকি মামার টাকা তুলেছেন।
তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। ব্যাংক কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম আমাকে যশোরে ডেকে বলেন, টাকাটা যেভাবেই হোক অপব্যবহার হয়েছে। আমি দিচ্ছি, আপনি অ্যাকাউন্টে জমা করে দিন। কিন্তু আমি রাজি হইনি।
অভিযোগ অস্বীকার করে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, আব্দুল্লাহ পারভেজ খানের কাছ থেকে আমি কোনো চেক নিইনি। এ বিষয়ে কিছুই জানি না।
মৃত আমেনার নামে নতুন চেকবই ইস্যু করা তৎকালীন ব্যাংক কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম জানান, ২০১৩ সালে জাহাঙ্গীর নামের এক ব্যক্তি ব্যাংক কর্মকর্তা পরিচয়ে মৃত আমেনা খাতুনের চেক ইস্যুর যাচাইকৃত একটি রসিদ জমা দেন এবং জানান, আমেনা খাতুন তার আত্মীয় ও অসুস্থ হওয়ায় তিনি চেকবই নিতে এসেছেন।
ঝিকরগাছা উপজেলা সমাজসেবা অফিসের তৎকালীন কর্মকর্তা আবিদ হাসান বলেন, এখানে আমাদের কোনো কর্তৃত্ব ছিল না। আমি বা তৎকালীন ইউএনও— কেউই দায়ী নই। দায়ী সংশ্লিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও ব্যাংক কর্মকর্তারা। মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যুর তথ্য আসত মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকেই। আমাদের দায়িত্ব ছিল টাকা এলে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বৈঠক করে রেজুলেশনের মাধ্যমে টাকা ছাড় করা।
অভিযোগ অস্বীকার করে অভিযুক্ত ব্যাংক কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এসব ঘটনার সঙ্গে আমার বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই। ঝিকরগাছা শাখায় যখন এই জালিয়াতি হয়, তখন আমি সেখানে কর্মরত ছিলাম না। একটি পক্ষ আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। স্বাক্ষর জাল করে টাকা তোলার ঘটনায় মুক্তিযোদ্ধারাই জড়িত।
তিনি আরও বলেন, ব্যাংক কর্তৃপক্ষ হয় আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিক, না হয় আমাকে দায়মুক্তি দিক। আমিও চাই এ ঘটনার দ্রুত সমাধান হোক।
সোনালী ব্যাংক যশোরাঞ্চলের জেনারেল ম্যানেজার ইকবাল কবীর বলেন, এ বিষয়ে একাধিক তদন্ত হয়েছে, তাই মন্তব্য করা সমীচীন নয়। তবে ব্যাংকের সুনাম অক্ষুণ্ণ রাখতে আমরা চাই— অপরাধী যেই হোক শাস্তি পাক এবং নির্দোষ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন।
আরএআর
