বিজ্ঞাপন

শহরের পরিত্যক্ত বর্জ্যই এখন সম্পদ

শহরের পরিত্যক্ত বর্জ্যই এখন সম্পদ

মানুষ সাধারণত বাসাবাড়ির উচ্ছিষ্ট খাবার, পচা-গলা বা দুর্গন্ধযুক্ত বস্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বর্জ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে সেই পরিত্যক্ত বর্জ্যই এখন সম্পদে পরিণত হচ্ছে মেহেরপুরের গাংনী পৌরসভার ডাম্পিং স্টেশনে। পরিবেশবান্ধব ইন্টিগ্রেটেড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট (আইডব্লিউএম) পদ্ধতিতে বর্জ্য থেকে উৎপাদন করা হচ্ছে জৈব সার, যা কৃষকদের কাছেও জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।

পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, গাংনী পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় স্থাপিত ডাস্টবিন থেকে প্রতিদিন বর্জ্য সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট ডাম্পিং স্টেশনে নেওয়া হয়। সেখানে পচনশীল ও অপচনশীল বর্জ্য আলাদা করা হয়। এ কাজে নিয়োজিত রয়েছেন দুইজন শ্রমিক। পরে পচনশীল বর্জ্য গ্রাইন্ডার মেশিনের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করে আইডব্লিউএম পদ্ধতিতে জৈব সার উৎপাদন করা হয়।

বর্তমানে প্রতি দুই মাসে প্রায় ৪৫০ কেজি জৈব সার উৎপাদিত হচ্ছে। যা প্রতি কেজি ২০ টাকা দরে কৃষকদের কাছে বিক্রি করা হয়। পৌরসভা কর্তৃপক্ষ ভবিষ্যতে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং প্লাস্টিক বর্জ্যের পুনর্ব্যবহারের উদ্যোগ গ্রহণের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, গাংনী পৌরসভার এ উদ্যোগ সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয়। শহরের বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জৈব সার উৎপাদন করা হচ্ছে, যা একদিকে পরিবেশ দূষণ কমাচ্ছে, অন্যদিকে কৃষকদের জন্য কম খরচে কার্যকর সার সরবরাহ করছে।

তারা জানান, এই সার ব্যবহারের ফলে রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমছে। পাশাপাশি মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে জমির গুণগত মান উন্নয়নেও এ সার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ইউসুফ হোসেন বলেন, গাংনী পৌরসভার বর্জ্য থেকে জৈব সার উৎপাদনের উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। এতে যেমন পরিবেশ রক্ষা হচ্ছে, তেমনি নিরাপদ কৃষি উৎপাদনেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

ডাম্পিং স্টেশনের কর্মী লিপি রিবেরু বলেন, শহর থেকে আনা বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে আমরা জৈব সার তৈরি করি। তবে যে বেতন পাই, তা দিয়ে কষ্টে সংসার চালাতে হয়।

আরেক কর্মী জরিকস্তা বলেন, এখানে আমরা অনেক পরিশ্রম করে সার উৎপাদন করি। কৃষকরা সেই সার কিনে নেন। কিন্তু বর্তমান পারিশ্রমিকে সংসার চালানো কঠিন। বেতন কিছুটা বৃদ্ধি করা হলে আমাদের জন্য ভালো হতো।

কৃষক আশরাফ হোসেন বলেন, আমি পৌরসভার উৎপাদিত জৈব সার জমিতে ব্যবহার করেছি। এতে ফসলের ফলন ভালো হয়েছে। সারটি মাটির উর্বরতা ও উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধিতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।

গাংনী পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী শামীম রেজা বলেন, পৌরসভার উৎপাদিত জৈব সার কৃষিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বর্তমানে প্রতি দুই মাসে প্রায় ৪৫০ কেজি সার উৎপাদন করা হচ্ছে। উৎপাদন বাড়ানো গেলে কৃষকরা আরও বেশি উপকৃত হবেন এবং রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমে আসবে। বর্জ্য সংগ্রহের পর তা প্রায় এক মাস শুকিয়ে বিভিন্ন ধাপ শেষে জৈব সারে রূপান্তর করা হয়।

তিনি আরও বলেন, কৃষি ও পরিবেশবান্ধব আরও কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা সফল হলে স্থানীয় কৃষিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

গাংনী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মতিয়ার রহমান বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং টেকসই কৃষিকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে গাংনী পৌরসভার এই উদ্যোগ একটি সম্ভাবনাময় মডেল। তবে জৈব সার উৎপাদনের ক্ষেত্রে ক্ষতিকর কোনো উপাদান যাতে মিশ্রিত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। পর্যাপ্ত পরিমাণে জৈব সার উৎপাদন করা গেলে কৃষকরা স্বল্পমূল্যে উন্নতমানের সার পাবেন এবং ব্যাপকভাবে উপকৃত হবেন।

পরিবেশ রক্ষা, পরিচ্ছন্ন নগর ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপদ কৃষি উৎপাদনের সমন্বয়ে গাংনী পৌরসভার এ উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায়ে ইতোমধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।

মাহাবুল ইসলাম/এএমকে