বিজ্ঞাপন

কৃষি প্রণোদনায় ফিরেছে স্বচ্ছতা, বাড়ছে কৃষকের আস্থা

কৃষি প্রণোদনায় ফিরেছে স্বচ্ছতা, বাড়ছে কৃষকের আস্থা

একই অফিস, একই চত্বর, একই সরকারি প্রণোদনা। বদলেছে শুধু বণ্টনের পদ্ধতি। এক সময় যে কর্মসূচিকে ঘিরে ছিল অনিয়মের অভিযোগ, এখন সেই প্রণোদনা পৌঁছাতে কৃষকের পরিচয় যাচাই করছেন কর্মকর্তারা। রংপুরের পীরগাছা উপজেলা কৃষি বিভাগের এই পরিবর্তন আলোচনায় এনেছে নতুন এক বাস্তবতা। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামের উদ্যোগে অনিয়ম ও অভিযোগের সেই অধ্যায় পেছনে ফেলে প্রণোদনা বিতরণে স্বচ্ছতা ফেরানোর চেষ্টা করছে উপজেলা কৃষি অফিস।

তিস্তা ও ঘাঘট নদীবেষ্টিত পীরগাছা উপজেলার ৯টি ইউনিয়নে কৃষিই প্রধান জীবিকা। রবি, খরিফ-১ ও খরিফ-২ মৌসুমে সরিষা, গম, ভুট্টা, মসুর, মুগ, খেসারি, পেঁয়াজ, সূর্যমুখী, পাট, আউশ ও আমনসহ বিভিন্ন ফসলের চাষ হয় এ উপজেলায়। এসব ফসলের উৎপাদন বাড়াতে প্রতিবছর হাজারো কৃষকের মাঝে সরকারি প্রণোদনা হিসেবে বীজ ও সার বিতরণ করা হয়। তবে অতীতে এ কর্মসূচির বাস্তবায়ন নিয়ে ছিল নানা অভিযোগ।

স্থানীয় কৃষকদের দাবি, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে প্রকৃত কৃষকের তালিকা তৈরির কথা থাকলেও অনেক সময় জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সুপারিশে তালিকা করা হতো। এতে প্রকৃত কৃষকদের একটি অংশ বঞ্চিত হতেন। কৃষকের উপস্থিতি ছাড়াই প্রণোদনা বিতরণ এবং কৃষক নয়- এমন ব্যক্তিদের তালিকাভুক্ত করার অভিযোগও ছিল।

অনিয়ম থেকে স্বচ্ছতায় উত্তরণ

কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবছর বিভিন্ন মৌসুমে প্রায় ১৩ হাজার ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক সরকারি কৃষি প্রণোদনার আওতায় আসেন। বর্তমানে চলতি খরিফ-২ মৌসুমে রোপা আমন ধানের জন্য প্রায় ৪ হাজার কৃষককে প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে, যা বার্ষিক মোট উপকারভোগীর একটি অংশ।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই প্রণোদনা বিতরণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেন। প্রকৃত কৃষকদের অগ্রাধিকার দিয়ে তালিকা প্রণয়ন, তথ্য যাচাই এবং সরাসরি কৃষকের হাতে প্রণোদনা পৌঁছে দেওয়ার বিষয়ে তিনি কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নতুন পদ্ধতি বাস্তবায়নের শুরুতে বিভিন্ন ধরনের চাপ ও আপত্তির মুখে পড়তে হয়েছিল কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের। তবে কৃষকের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সেই উদ্যোগ অব্যাহত রাখা হয়।

রফিকুল ইসলাম বলেন, সরকারি কৃষি প্রণোদনা প্রকৃত কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা তালিকা প্রস্তুত করার পর আমরা তা যাচাই করি। বিতরণের সময়ও কৃষকের পরিচয় নিশ্চিত করে প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। কোথাও কোনো ত্রুটি পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে সংশোধন করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছি। শুরুতে কিছু বাধা ছিল। তবে সহকর্মী কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও কৃষকদের সহযোগিতায় এখন অনেকটাই সফল হয়েছি।

মাঠে নেতৃত্বে কৃষি অফিসের কর্মকর্তারা

প্রণোদনা বিতরণ কার্যক্রমে মাঠপর্যায়ে চক্রাকারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা সঞ্জয় সরকার ও মুকিত বিন লিয়াকত। কৃষক নির্বাচন, তালিকা যাচাই, স্লিপ বিতরণ এবং পুরো কার্যক্রম তদারকিতে তাদের সক্রিয়ভাবে কাজ করতে দেখা যায়।

বুধবার (২৪ জুন) দুপুরে সরেজমিনে কৃষি অফিসে গিয়ে দেখা যায়, প্রণোদনা নিতে আসা কৃষকদের স্লিপ, পরিচয় এবং তালিকার তথ্য মিলিয়ে দেখছেন তিনি। কোনো অসঙ্গতি পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে তা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

সঞ্জয় সরকার বলেন, প্রকৃত কৃষক নির্বাচন নিশ্চিত করতে আমরা অগ্রাধিকার তালিকা তৈরির পর একাধিকবার মাঠপর্যায়ে যাচাই করছি। কৃষকের উপস্থিতি নিশ্চিত করেই প্রণোদনা বিতরণ করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, প্রতিটি স্লিপের পেছনে কৃষকদের নাম, ক্রমিক নম্বর এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার স্বাক্ষর রাখা হচ্ছে। কোনো কৃষক অসুস্থ থাকলে তার পরিচয় ও মোবাইল নম্বর নিশ্চিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অনিয়মের সুযোগ বন্ধ করতেই এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

যেভাবে নিশ্চিত হচ্ছে প্রকৃত কৃষক

কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে প্রণোদনা বিতরণে একাধিক ধাপ অনুসরণ করা হচ্ছে। প্রথমে ইউনিয়ন পর্যায়ের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে কৃষকের তথ্য সংগ্রহ ও প্রাথমিক তালিকা প্রস্তুত করেন। এরপর মাঠপর্যায়ে সরেজমিন যাচাইয়ের মাধ্যমে তালিকা চূড়ান্ত করা হয়।

প্রণোদনা বিতরণের সময় কৃষকের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হচ্ছে। নাম, বাবার নাম, ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর যাচাইয়ের পরই বীজ ও সার দেওয়া হচ্ছে। অসুস্থতা বা বিশেষ পরিস্থিতিতেও কৃষকের পরিচয় নিশ্চিত করার পর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পাশাপাশি নিয়মিত তদারকি টিম মাঠপর্যায়ে পর্যবেক্ষণ করছে।

সহযোদ্ধা মাঠকর্মীরা

কৃষি বিভাগের এই পরিবর্তনের পেছনে কাজ করছে একটি সমন্বিত টিম। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা সঞ্জয় সরকার, কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মুকিত বিন লিয়াকত এবং ইউনিয়ন পর্যায়ের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা।

কৃষক নির্বাচন, তথ্য সংগ্রহ, মাঠ যাচাই, স্লিপ বিতরণ এবং প্রণোদনা পৌঁছে দেওয়ার প্রতিটি ধাপে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে। অনেক কর্মকর্তা কৃষকের বাড়িতে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ ও জমির অবস্থা যাচাইয়ের কাজও করছেন।

উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা জামিউল ইসলাম বলেন, আগে প্রস্তুত করা কিছু তালিকা বাস্তবায়নের সময় নানা জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। তবে বর্তমানে মাঠপর্যায়ে তথ্য যাচাই করে প্রকৃত কৃষকদেরই তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে।

কৃষকের মুখে সন্তুষ্টির কথা

কান্দি ইউনিয়নের পাঠক শিকড় গ্রামের কৃষক অহির উদ্দিন বলেন, এক সময় প্রণোদনার নাম শুনতাম, তবে কখনো পাইনি। এবার পেয়েছি। কৃষি অফিসের লোকজন যাচাই করে আমাদের হাতে বীজ তুলে দিয়েছেন।

কৈকুড়ি ইউনিয়নের রামচন্দ্রপাড়া গ্রামের কৃষক তাজুল ইসলাম বলেন, প্রণোদনা বিতরণে স্বচ্ছতা আসায় কৃষকদের মাঝে কৃষি অফিস সম্পর্কে আস্থা ফিরে এসেছে। এখন প্রকৃত কৃষকরা সুযোগ পাচ্ছেন। এ উদ্যোগকে সবাই প্রশংসা করছে।

কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, আগে অনেক সময় প্রকৃত কৃষক প্রণোদনা পেত না। এখন তথ্য মিলিয়ে কৃষকদের হাতে বীজ দেওয়া হচ্ছে। এতে অনিয়ম কমেছে।

কৃষক আজিজার রহমান বলেন, এবার কর্মকর্তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে তালিকা করেছেন। ফলে প্রকৃত কৃষকরাই সুযোগ পেয়েছেন।

প্রশাসনের নজরেও ইতিবাচক পরিবর্তন

পীরগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জায়িদ ইমরুল মোজাক্কিন বলেন, সরকারি কৃষি প্রণোদনা প্রকৃত কৃষকের হাতে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে কৃষি বিভাগ যে উদ্যোগ নিয়েছে তা ইতিবাচক। মাঠপর্যায়ে প্রকৃত উপকারভোগীদের নির্বাচন করা হচ্ছে, যা প্রশংসনীয়।

তিনি আরও বলেন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি সহায়তা সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছালে কৃষক যেমন উপকৃত হবেন, তেমনি কৃষি উৎপাদনও বাড়বে।

ফরহাদুজ্জামান ফারুক/আরএআর