বিজ্ঞাপন

সুপারির খোসায় বদলাচ্ছে শত শত নারীর জীবন

সুপারির খোসায় বদলাচ্ছে শত শত নারীর জীবন

নাটোরের বড়াইগ্রামে কয়েকশ আসহায় নারীর ভাগ্য বদলের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে সুপারির খোসা ছাড়ানোর কাজ। এই কাজকে কেন্দ্র করে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ নারী সুযোগ পাচ্ছেন বাড়তি আয়ের। ঘরে বসেই কাজ করার সুযোগ তৈরি হওয়ায় বদলে গেছে তাদের পরিবারের আর্থিক চিত্র। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই কর্মসংস্থান এলাকায় বয়ে এনেছে অর্থনৈতিক পরিবর্তনের এক নতুন অধ্যায়।

উপজেলার জোয়াড়ী ইউনিয়নের আলীপুর, কেল্লা, নাদো-জোয়াড়ী, চাপিলা, রায়পুর ও তিরাইল গ্রামের ঘরে ঘরে এখন সুপারির খোসা ছাড়ানোর ব্যস্ততা। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের উদ্যোগে গ্রামের নারীরা বাড়িতে বসেই বস্তাভর্তি কাঁচা সুপারি সংগ্রহ করে খোসা ছাড়ানোর কাজ করছেন। এই কাজে প্রতি কেজি সুপারির খোসা ছাড়ানোর জন্য ১০ থেকে ১২ টাকা মজুরি দেওয়া হয়। একজন নারী প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১৫ কেজি সুপারি প্রক্রিয়াজাত করতে পারেন। ফলে দৈনিক আয় হয় প্রায় ১২০ থেকে ১৮০ টাকা। মাস শেষে এই আয় অনেক নিম্ন ও মধ্যআয়ের পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সহায়তা হিসেবে কাজ করছে। সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটানো, সন্তানের পড়াশোনা এবং পারিবারিক প্রয়োজন পূরণে এই অতিরিক্ত আয় নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার পথও সুগম করছে।

এই কাজের মাধ্যমে নতুন জীবন পাওয়াদের একজন আলীপুর গ্রামের ফাতেমা বেগম (৬৫)। তিন বছর আগে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে তার স্বামী মারা যান। শারীরিক প্রতিবন্ধী মেয়েকে নিয়ে তিনি পড়েন চরম আর্থিক সংকটে। কোনো কাজের সুযোগ না পেয়ে একসময় ভিক্ষাবৃত্তির পথ বেছে নিতে বাধ্য হন। পরে সুপারির খোসা ছাড়ানোর কাজে যুক্ত হয়ে জীবনের মোড় ঘুরে যায় তার। ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে এখন সুপারির খোসা ছাড়ানোর কাজ করছেন।

ফাতেমা বেগম বলেন, স্বামী মারা যাওয়ার পর প্রতিবন্ধী মেয়েটাকে নিয়ে অসহায় হয়ে পড়ি। মানুষ দুই-চার টাকা দিলে চলতো, না দিলে চলতে পারতাম না। এখন সুপারির খোসা ছাড়ানোর কাজ করি, আর কারো কাছে হাত পাততে হয় না। দিনে ১০-১২ কেজি খোসা ছাড়িয়ে যা পাই, তা দিয়াই আল্লাহর রহমতে বেশ ভালো আছি। এখন নিজের উপার্জনে চলি, এটাই শান্তি।

একই গ্রামের রফেল বেগম (৬০) জানান, আগে অভাব-অনটনের কারণে সংসারে সবসময় অশান্তি লেগেই থাকত। বর্তমানে তিনি ও তার মেয়ে একসঙ্গে সুপারির খোসা ছাড়ানোর কাজ করেন। দুজনের আয় মিলিয়ে সংসার ভালোভাবে চলছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য কিছু অর্থ সঞ্চয়ও করছেন তারা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, একসময় এসব এলাকায় বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে ধানসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ হতো। কিন্তু গত কয়েক বছরে অপরিকল্পিতভাবে পুকুর খননের কারণে দুই ফসলি ও তিন ফসলি জমির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ফলে কৃষিশ্রমিকদের কাজের সুযোগ সংকুচিত হয়। বহু পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে। বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাবে গ্রামীণ অর্থনীতি হুমকির মুখে পড়ে। ঠিক তখনই আশার আলো হয়ে আসে সুপারির খোসা ছাড়ানোর এই উদ্যোগ। 

খোসা ছাড়ানো সুপারির প্রধান ক্রেতা দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ছোট-বড় পানের দোকানিরা। পানের সঙ্গে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ সুপারি বিক্রি হয়। আগে দোকানিরা নিজেরাই পান বিক্রির জন্য সুপারির খোসা ছাড়াতেন। তবে বর্তমানে বাজারে খোসা ছাড়ানো ও বিক্রির জন্য প্রস্তুত সুপারি সহজলভ্য হওয়ায় তারা আর খোসাসহ সুপারি কিনতে আগ্রহী নন। ফলে খোসা ছাড়ানো সুপারির চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

পান বিক্রেতারা জানান, বিক্রির সময় সুপারির খোসা ছাড়াতে অতিরিক্ত সময় ও শ্রমের প্রয়োজন হয়। প্রস্তুত খোসা ছাড়ানো সুপারি ব্যবহার করলে কাজ সহজ হয় এবং ক্রেতাদের দ্রুত সেবা দেওয়া সম্ভব হয়। এ কারণে তারা এখন খোসা ছাড়ানো সুপারি বেশি কিনছেন।

এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের পথিকৃৎ কেল্লা গ্রামের তরুণ ব্যবসায়ী শামীম মোল্লা (৩১)। তিনি জানান, ২০১৯ সালে ব্যবসার কাজে বরিশাল গিয়ে প্রথম এই কাজের সঙ্গে পরিচিত হন। সেখানে নারীদের ঘরে বসে সুপারির খোসা ছাড়িয়ে আয় করতে দেখে অনুপ্রাণিত হন তিনি। পরে নিজ এলাকায় ফিরে কয়েকজন নারীকে নিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে কাজ শুরু করেন। ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার পর ধীরে ধীরে এর পরিধি বাড়তে থাকে।

শামীম মোল্লা ঢাকা পোস্টকে বলেন, প্রথমে কয়েকজনকে দিয়ে শুরু করলেও এখন প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ নারী এই কাজের সঙ্গে যুক্ত। আমার দেখাদেখি আরও প্রায় ১০ জন স্থানীয় ব্যবসায়ী এ কাজে নেমেছেন। ডিসেম্বর থেকে জুন পর্যন্ত স্থানীয় বাগান থেকে সুপারি সংগ্রহ করি। বছরের বাকি সময় সরবরাহ ঠিক রাখতে পঞ্চগড়, ভোলা ও বরিশাল থেকে সুপারি নিয়ে আসা হয়। আমরা নিজেদের খরচে নারীদের বাড়িতে সুপারি পৌঁছে দিই এবং কাজ শেষে সংগ্রহ করে নিয়ে যাই।

তিনি আরও বলেন, আমাদের লক্ষ্য শুধু ব্যবসা নয়, এলাকার অসহায় নারীদের জন্য একটি স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা তৈরি করা। অনেক নারী এখন নিজের আয় দিয়ে সংসার চালাচ্ছেন, সন্তানের পড়াশোনার খরচ দিচ্ছেন। এটি আমাদের জন্যও বড় আনন্দের।

জোয়াড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলী আকবর বলেন, এটি নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কোনো সরকারি বা বেসরকারি সহায়তা ছাড়াই স্থানীয় উদ্যোক্তা ও নারীদের প্রচেষ্টায় একটি বড় কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে আমরা তাদের সব ধরনের সহযোগিতা করব।

আশিকুর রহমান/এসএইচএ