কোনো রাজনৈতিক ইস্যু নয়, ছিলো না কোনো পূর্বশত্রুতাও। শিবিরকর্মী বন্ধুর ডাকে সাড়া দিতে গিয়েই সেদিন খুন হন গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার বোনারপাড়া ইউনিয়ন ছাত্রশিবিরের সভাপতি সাইফুল্লাহ বারী (২৪)। পরিবার ও তদন্ত সংশিষ্ট একাধিক সূত্র এবং সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে এমন তথ্যই পাওয়া গেছে।
গত রোববার (২১ জুন) বিকেলে সাঘাটা উপজেলার বোনারপাড়ার চার মাথায় (উপজেলা চত্বর সংলগ্ন) খুন হন সাইফুল্লাহ বারী। এদিন ঘটনার কিছুটা আগে বাড়িতে দুপুরের খাবার খাচ্ছিলেন তিনি। খাবার খাওয়া অবস্থা থেকে পাশের বাড়ির মোবাশ্বের নামের তার এক বন্ধু সাইফুল্লাহ বারীকে ডেকে নিয়ে যান বোনারপাড়ার সাঘাটা উপজেলা চত্বরে। সেখানে একটি উদ্ভূত পরিস্থিতেই খুনের শিকার হন সাইফুল্লাহ বারী। সেখানে স্কুল সংশ্লিষ্ট বিষয়ে হামলার শিকার হয়ে তাদেরকে ফোন করে ডেকেছিলেন কচুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোবাম্বেশের চাচা হাবীবুল্লাহ তারেক। এ ঘটনায় হওয়া হত্যা মামলায় এখন পর্যন্ত চার আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
নিহত শিবির সভাপতি সাইফুল্লাহ বারী বোনারপাড়া ইউনিয়নের শিমুলতাইর গোরস্থানপাড়া গ্রামের হাবিবার রহমান মাওলানার ছেলে। তিনি রংপুরের সাতগড়া মডেল কামিল মাদরাসার আল কুরআন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। বন্ধু মোবাশ্বের সাবেক বোনারপাড়া ইউনিয়ন শিবিরের সভাপতি। তিনি বর্তমানে ঢাকায় পড়ালেখা করেন এবং শিবিরের কর্মী।
পুলিশ বলছে, স্কুল কমিটি নিয়ে শিক্ষকের সাথে বিদ্যালয়ে প্রথম একটি ঘটনা ঘটে। সেটির রেশ ধরে ২১ তারিখ দুপুরে বোনারপাড়ায় প্রধান শিক্ষক হাবীবুল্লাহ'র সাথে দ্বিতীয় ঘটনা হয়। এদিন সেখানে প্রধান শিক্ষকের পক্ষ নিয়ে আসেন নিহত সাইফুল্লাহ বারী ও আহত সালাউদ্দিনরা। তারা শিক্ষকের প্রতিপক্ষের সাথে মারমূখী তর্কে জড়ান। পরেই খুনের ঘটনা ঘটে। তবে সেখানে কোনো রাজনৈতিক কারণ ছিল না বা পূর্বশত্রুতারও কোনো বিষয় পাওয়া যায়নি।
সরেজমিনে গত মঙ্গলবার বিকেলে শিমুলতাইর গোরস্থানপাড়া গ্রামে নিহতের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীতে ভরপুর বাড়ি। কিন্তু শোকে কাতর তাদের পরিবার-স্বজনরা। দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সবার ছোট ছিলেন সাইফুল্লাহ বারী।
নিহত সাইফুল্লাহ বারীর ভগ্নিপতি (একই বাড়িতে স্থায়ী বসবাস) শাহিনুর আলম ঢাকা পোস্টকে বলেন, ঘটনার দিন দুপুরের খাবার খাচ্ছিল সাইফুল্লাহ বারী। খাওয়া শেষই হয়নি, তাতেই তার স্থানীয় বন্ধু মোবাশ্বের তাকে ডেকে নিয়ে যান। তারপরেই খুন হন সে। খুনিদের সাথে আমাদের কোনো শত্রুতা ছিল না।
সাইফুল্লাহ বারীর বড় ভাই ফারুক আজম ঢাকা পোস্টকে বলেন, বিনা কারণে আমার ভাইয়ের জীবন কেড়ে নেওয়া হয়েছে। খুন করার মতো ঘটনাও সেদিন সেখানে ছিল না। সামান্য তর্কের সূত্র ধরে খুনিরা আমার নিরাপরাধ ভাইকে হত্যা করেছে। আমরা আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই, ফাঁসি চাই।
এ সময় এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখানে কোনো রাজনৈতিক কারণ ছিল না। রাজনৈতিক কারণে মৃত্যু হলে তবুও শান্তি পেতাম। স্কুল কমিটি নিয়ে শিক্ষকসহ অন্যদের দ্বন্দ্ব ছিল। সেটি আমাদের কোনো বিষয় ছিল না। স্কুলের কমিটির বিষয়ে জামায়াত-শিবিরের কোনো প্রার্থী বা মনোনীত কোনো প্রার্থীও ছিল না। বিদ্যালয়টি অন্য ইউনিয়নে। অল্প সময়েই পরিকল্পিতভাবে হঠাৎ করেই সেদিন খুন করা হয় আমার ভাইকে।
অভিযুক্তের বাড়িতে আগুন, বহিষ্কার, বিক্ষোভ-প্রতিবাদ
শিবির নেতা সাইফুল্লাহ বারী খুনের ঘটনার দিন রাতেই অভিযুক্ত যুবদল নেতা মোখলেছুর রহমান মুকুলকে বহিষ্কার করে জেলা যুবদল। ২১ জুন জেলা যুবদলের সভাপতি রাগিব হাসান চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক ভুট্টো স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দলীয় নীতি ও আদর্শ পরিপন্থি কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে তাৎক্ষণিক ওই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার কথাও জানানো হয়। সেখানে যদিও ঘটনার পর পরই জেলা যুবদলের সভাপতি রাগীব হাসান চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, অভিযুক্ত মুকুলের যুবদলের সাথে কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তারপরেই তারা মুকুলকে প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক বহিষ্কার করেন।
এদিকে শিবির নেতা সাইফুল্লাহ বারী খুনের ঘটনায় সেদিনই (২১ জুন) জেলা শহরসহ বেশ কয়েকটি উপজেলায় এবং ঢাকাতেও জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিতে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ মিছিল করে ছাত্রশিবির। সেখানে অংশ নেয় জামায়াতে ইসলামী। ঘটনার দিন সন্ধ্যার দিকে বোনারপাড়ায় লাঠি-শোডা হাতে বিক্ষোভ করেন জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা। মিছিলে নিহতের স্বজন ও এলাকার বিক্ষুব্ধ জনতাও অংশ নেয়। পরে বিক্ষুব্ধরা অভিযুক্তদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙ্গচূর ও অগ্নিসংযোগ করে। নিমিষেই পুরো বাড়ি পুড়ে ভষ্মীভূত হয়। পরে স্থানীয়দের খবরে সাঘাটা ফায়ার সার্ভিসের ২২ সদস্যের একটি টিম প্রায় আড়াই ঘণ্টার চেষ্টায় পৌনে ১০ টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে নেয়।
সাঘাটা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের স্টেশন অফিসার তোফাজ্জাল হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, ২২ সদস্যের একটি টিম আড়াই ঘণ্টার চেষ্টায় আমরা আগুন নেভাতে সক্ষম হই। দমকলবাহিনীর সদস্যরা জানান- সেদিন আগুন নেভানোর কাজে ঘটনাস্থলে পৌছাতে তাদের বেশ বেগ পেতে হয়। ব্রিজের কাছ থেকে ঘটনাস্থল পর্যন্ত ওই সড়কে আন্দোলনকারী মানুষে ভরপুর ছিলো।
পুড়েছে নিরাপরাধ তিনটি পরিবারের বাড়িঘর
সেদিনের দেওয়া আগুনে পুড়ে ভস্মীভূত হয়েছে অভিযুক্তদের প্রতিবেশী তিনটি পরিবারের বাড়িঘর। পুড়ে ছাই হয়েছে নিরীহ তিনটি পরিবারের কষ্টার্জিত অর্থে গড়া ঘরবাড়ি। ক্ষতিগ্রস্ত এই তিন পরিবারের কেউই কোনো রাজনীতিতে জড়িত নন, কিংবা অভিযুক্তদের স্বজনও নন তারা।
সরেজমিনে দেখা যায়, প্রধান অভিযুক্ত মুকুল-পলাশদের বাড়ির উত্তর পাশের বাড়ি প্রবাসী সবুজ, পান ব্যবসায়ী এনামুল ও কাঁচা তরকারী ব্যবসায়ী মোজাম্মেলের। তারা তিনটি পরিবার ওয়ারিশ ও স্বজন।
তাদের মধ্যে অভিযুক্তদের ঘরের সাথে লাগোয়া ঘর প্রবাসী সবুজের। সবুজ ওই গ্রামের পান ব্যবসায়ী মৃত হামিদুলের খন্দকারের ছেলে। তিনি দুবাই প্রবাসী। সেখানে রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। তারপরেই এনামুল ও তারপর মোজাম্মেলের ঘর। আগুনে তিনটি পরিবারেরই ঘরের যাবতীয় আসবাবপত্র, নগদ টাকা, শিক্ষার্থীদের বই-পুস্তক, ভাতের চাল, কাপড়সহ সব কিছুই পুড়ে ছাই হয়েছে। পুড়ে গেছে খোয়ারের মুরগিও।
স্থানীয় সূত্র ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো জানায়, সেদিন সন্ধ্যার দিকে খুনের প্রতিবাদে বোনারপাড়ায় বিক্ষোভ মিছিল করে জামায়াত-শিবির। তারা বাজার এলাকায় বিক্ষোভ সমাপ্তও করে। কিন্তু তারপরেই তারা অভিযুক্তসহ তাদের পাশের বাড়িতে আগুন দেয়।
তাদের দাবি, কমপক্ষে চার থেকে পাঁচ শতাধিক মানুষ ভাঙচুর ও এই অগ্নিসংযোগের তাণ্ডবে অংশ নেয়। তারা অভিযুক্ত মুকুলদের বাড়ি ছাড়াও পাশের তিন বাড়িতে প্রবেশ করে মহিলাদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও ভাঙচুর করে ঘরের ভেতরে ঢুকে আগুন দেয়।
সেদিনের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে আঁতকে ওঠেন দুবাই প্রবাসী সবুজের মা শেফালি বেওয়া (৫২)। তিনি বলেন, আমার ছেলের বউ ও সাড়ে ৪ বছর ও আড়াই বছর বয়সের দুই নাতিকে নিয়ে আমি বাড়ির পেছনে লুকাই। চোখের সামনে কষ্টে গড়া ঘরবাড়ি দাউদাউ করা আগুনে পুড়ছিল। আমরা ঘরের ভেতরের কিছুই নিতে পারিনি। আজ অন্যের কাপড় পড়ে আছি।
সবুজের স্ত্রী স্বপ্না খাতুন বলেন, আগের দিনই ঋণ পরিশোধ করতে পাঠানো ৫ লাখ টাকাসহ মোট ৫ লাখ ৭০০ টাকা পুড়ে ছাই হয়েছে। টাকা পাঠানোর বিষয়টি সবাই জানে। ঘরের চালা, দামি খাট, শোকেস, ড্রেসিন টেবিলসহ যা কিছু ছিলো সবকিছুই পুড়ে গেছে। অন্তত ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে আমার।
ক্ষতিগ্রস্ত মোজাম্মেল হকের স্ত্রী সালমা (৬৫) বেগম বলেন, ওই সময় অনেক মানুষ বাড়িতে ঢুকে আমাদেরকে মুখ খারাপ করে গালি দিয়ে বের করে দেয়। এ সময় পেট্রোল বোমা জাতীয় কিছু একটা ঘরের ভেতরে ছোড়ার সাথে সাথে আগুন জ্বলে ওঠে। আমি ভয়ে দৌঁড়ে পালাই। ঘরের জিনিসপত্র, গরু বিক্রির ৬৫ হাজার টাকা, ছয়টি মুরগি পুড়ে গেছে তার।
পান ব্যবসায়ী এনামুল হক বলেন, আমাদের কী অপরাধ? অন্যায়ভাবে আমাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হলো। আমরা কেউই কোনো রাজনীতির সাথে জড়িত নই। অভিযুক্তদের সাথে আমাদের কোনো সম্পর্কও নাই।
তিনি জানান, বোনারপাড়ায় মিছিল শেষ করে ৪০০ থেকে ৫০০ মানুষ এসে এখানে আগুন দেয়। মানুষের ভিড়ে বাকির ব্রীজে এসে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি আটকে যায়। পরে ধীরে ধীরে আসে।
এনামুল বলেন, আমরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছি। আমরা যেন দাঁড়াতে পারি এজন্য সরকারের কাছে সহযোগিতা চাই। পরবর্তীতে ঝামেলার কারণে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেব না। এখন যদি মামলা করি তাহলে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীর নামে আর নিহতের পরিবার স্বজনদের নামে করতে হবে। কিন্তু সেসব ঝামেলায় জড়াতে চাই না আমরা। আমাদের সাথে অন্যায় করা হয়েছে।
এনামুল হকের মেয়ে ইশরাত জাহান রিনি (১৪) বলে, কিছুদিন পর আমার এসএসপি পরীক্ষা। আমার সকল বই, নোট, গাইড পুড়ে ছাই হয়েছে, পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে। বোনারপাড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণিতে পড়ে রিনি।
বিএনপি-জামায়াতের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
সাইফুল্লাহ বারী খুন হওয়ার পরদিন ২২ জুন সন্ধ্যায় সাঘাটা উপজেলার অস্থায়ী কার্যালয়ে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপি। সেখানে নেতৃবৃন্দ জানান, কচুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডকে সম্পূর্ণ ‘ব্যক্তিগত ব্যাপার’। এই বিচ্ছিন্ন ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার দায় কোনোভাবেই বিএনপি গ্রহণ করবে না।
এ সময় তারা অভিযোগ তোলেন, অনাকাঙ্ক্ষিত হত্যাকাণ্ডের পর জামায়াতে ইসলামী সাঘাটা উপজেলা শাখার আমির মো. ইব্রাহিম হোসেন ও যুব বিভাগের প্রধান এনামুল হকের নেতৃত্বে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা বোনারপাড়ায় অবস্থিত সাঘাটা উপজেলা বিএনপির দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। এছাড়া পরে নিরীহ মানুষের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটে। বিএনপির পক্ষ থেকে এই দুটি ঘটনারই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে সঠিক বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত ঘটনাকে ভিন্নখাতে নিয়ে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা না করারও আহ্বান জানানো হয়।
অপরদিকে, বিএনপির সংবাদ সম্মেলনের প্রতিবাদে পরদিন ২৩ জুন বিকেলে বোনারপাড়ার অফিসে এক সংবাদ সম্মেলন করে জামায়াতে ইসলামী। তাদের লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, সাঘাটা উপজেলা আমীর মাওলানা ইব্রাহিম হোসেন ও যুব বিভাগের সভাপতি এনামুলসহ জামায়াতকে জড়িয়ে বিএনপির করা ২২ জুনের সংবাদ সম্মেলন সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।
সেখানে আরও উল্লেখ করা হয়, ছাত্রশিবিরের সভাপতি সাইফুল্লাহ বারীকে পরিকল্পিতভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে। সাঘাটা উপজেলা বিএনপির যুবদল নেতা মোকলেছুর রহমানসহ অন্যরা এবং জামায়াতকর্মী সালাউদ্দিনকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুরুতর আঘাত করা হয়েছে, সে ঢাকায় চিকিৎসাধীন।
ঘটনার সূত্রপাত যেখান থেকে
ঘটনার সূত্রপাত উপজেলার বোনারপাড়া ইউনিয়নের পার্শ্ববর্তী কচুয়া ইউনিয়নের কচুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে। স্থানীয় সূত্র জানায়, এই বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে আধিপত্য বজায় রেখে চলেছেন কচুয়া গ্রামের মৃত এলাহী বকসের ছেলে জয়নাল আবেদীন (৫৫)। জয়নাল আবেদীন বোনারপাড়া ইউনিয়ন যুবদলের সদ্য বহিষ্কৃত সভাপতি ও এ ঘটনায় হওয়া হত্যা মামলার প্রধান আসামি মোকলেসুর রহমান মুকুলের আপন চাচা। তিনি সরাসরি রাজনৈতিক কোনো দলের সরাসরি সদস্য না হলেও সব দলের নেতাকর্মীদের সাথে সখ্যতা রয়েছে তার।
সূত্র জানায়, জয়নাল আবেদীন ও তার ভাই জাহিদুল ইসলামের (যুবদল সাবেক সভাপতির বাবা) মনোনীত প্রার্থী ছিলেন ওই বিদ্যালয়েরই সহকারী শিক্ষক রুমা আক্তারের স্বামী মাসুম কামাল (৪৩)। মাসুম কামাল উপজেলার ৮নং জুমারবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা। সরকারি চাকরি করলেও তিনি আওয়ামী ঘরানার একজন ব্যক্তি। তাকে কমিটির সদস্য করতে প্রধান শিক্ষকের ওপর চাপ ছিলো জয়নাল-জাহিদুলের। সেটি নিয়ে গত ১৬ জুন মনোনয়ন জমাদানের শেষ দিনে বিদ্যালয়ে অন্যান্যা আগ্রহী সদস্যরা ফরম জমা দিতে আসলে তাদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করা হয় এবং প্রধান শিক্ষক হাবীবুল্লাহকে একপর্যায়ে হেনস্তা করেন জয়নাল-জাহিদুল। মোকলেসুর রহমান মুকুল পরে সেখানে গিয়ে মহড়া দেন । এ ঘটনায় সাঘাটা থানায় একটি লিখিত এজাহারও দিয়েছিলেন ভুক্তভোগী প্রধান শিক্ষক হাবীবুল্লাহ।
প্রধান শিক্ষকের ১৮ তারিখের করা এজাহারে বিবাদী করা হয়েছে প্রার্থী মাসুম কামাল ও জয়নাল আবেদীনসহ অজ্ঞাতনামা ২/৩ জনকে। এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে তফসিল ঘোষণা অনুযায়ী মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন ১৬ জুন বিকেল ৩টার দিকে বিবাদীরা বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষে মনোনয়নপত্র জমা দিতে আসেন। এ সময় প্রার্থী মাসুম কামাল একজন ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (সরকারি) হওয়ায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতির প্রত্যয়নপত্র চান প্রধান শিক্ষক। এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে জয়নাল ও মাসুম কামালসহ অজ্ঞাতরা প্রধান শিক্ষককে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ এবং অন্যান্য মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মনোনয়নপত্র ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে ধস্তাধস্তি করেন। চেয়ার তুলে মারার চেষ্টাও করা হয়।
এ ঘটনায় বিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষককে সাক্ষী করা না হলেও তিনজন সাক্ষীর মধ্যে বিদ্যালয়ের সদস্য পদপ্রার্থী আমিনুল ইসলাম সাবু নামের একজনকে সাক্ষী করা হয়েছে। এই প্রার্থীর প্রতি প্রধান শিক্ষকের মৃদু সমর্থন রয়েছে বলে জানা গেছে।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) বিদ্যালয়ে গিয়ে পাওয়া যায়নি প্রধান শিক্ষক হাবীবুল্লাহকে। তিনি তিন দিনের ছুটিতে ছিলেন। পরে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঢাকা পোস্টের কাছে স্কুলের সেদিনের ঘটনা ও এজাহার দায়ের প্রশ্নে কোনো তথ্য সরবরাহ এবং মন্তব্য করতে রাজি হননি।
স্কুলে পাওয়া যায়নি অভিযুক্ত প্রার্থী মাসুম কামালের স্ত্রী সহকারী শিক্ষক রুমা খাতুনকেও। ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরটিও বন্ধ পাওয়া যায়। অন্যদিকে অভিযুক্ত মাসুম কামালের ফোন নম্বরটিও বন্ধ পাওয়া যায়। পরে তাকে ক্ষুদে বার্তা দিয়েও পাওয়া যায়নি।
সাঘাটা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আব্দুল্লাহিশ শাফী ঢাকা পোস্টকে বলেন, গত ১৬ তারিখ আটজন প্রার্থী মনোনয় ফরম জমা দিয়েছিলেন। পরে মনোনয়ন ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাসহ প্রধান শিক্ষকের ওপর আক্রমণের ঘটনাও ঘটেছে। এ ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগও দিয়েছে প্রধান শিক্ষক। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় গত ২২ জুন ওই বিদ্যালয়ের কমিটি সংক্রান্ত সকল কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ সময় জানতে চাইলে তিনি বলেন, নিয়ম অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান প্রধান আইনগত কোনো ব্যবস্থা নিতে চাইলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করতে হয়। হাবীবুল্লাহর অভিযোগের বিষয়টি পরে (২৩ জুন) জেনেছি।
দ্বিতীয় ঘটনায় খুন, কী ঘটেছিল সেদিন
কচুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মনোনয়ন দাখিলের শেষ দিনের (১৬ জুন) ঘটনায় ১৮ জুন থানায় লিখিত অভিযোগ করেছিলেন প্রধান শিক্ষক হাবীবুল্লাহ। সেই ঘটনার জের ধরে ২১ জুন উপজেলার বোনারপাড়ায় শিক্ষক হাবিবুল্লাহকে পেয়ে তার ওপর চড়াও হন যুবদল নেতা মুকুলসহ তার সঙ্গী আরও বেশ কয়েকজন। এদিন উপজেলা চত্বরের একটি চায়ের দোকানে বসে ছিলেন ওই শিক্ষক। যুবদল নেতার চাচাকে আসামি করে থানায় অভিযোগ এবং কমিটি নিয়ে ইস্যু তুলে প্রধান শিক্ষককে আক্রমণাত্মকভাবে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকেন মুকুলসহ তার সঙ্গীরা। একপর্যায়ে শিক্ষক হাবীবুল্লাহ তার ভাতিজা বোনারপাড়া ইউনিয়ন জামায়াতের আমির জাহিদুল ইসলাম ইকবালের ছেলে মোবাশ্বেরকে ঘটনা জানিয়ে ফোন করে ডাকেন।
পরে মোবাশ্বের তার পাশের বাড়ির বন্ধু শিবির সভাপতি সাইফুল্লাহকে সরাসরি ও জামায়াতকর্মী সালাউদ্দিনকে ফোন করে ডেকে নিয়ে ঘটনাস্থলে যান। তারা প্রধান শিক্ষকের সাথে হওয়া ঘটনার প্রতিবাদ করেন এবং এতে তাদের উভয়পক্ষের মধ্যে মধ্যে তর্ক-বিতর্কের সৃষ্টি হয়। পরে উপস্থিত লোকজন উভয়পক্ষকে নিবৃত করে তাৎক্ষণিকভাবে দুই দিকে সরিয়ে দেন। এর ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যেই মুকুল ও তার ভাই পলাশসহ বেশ কয়েকজন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সালাউদ্দিন ও সাইফুল্লাহদের ওপর হামলা চালায়। মুকুলের ছোট ভাই পলাশ শিবির সভাপতি সাইফুল্লাহ বারীর গলায় সজোরে আঘাত করলে শাবল গলার এফোঁর-ওফোঁর হয়ে প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ হতে থাকে। একই সময় সাইফুল্লাহ বারীর বন্ধু সালাউদ্দিনকেও ছুরিকাঘাত করেন প্রতিপক্ষরা। পরে স্বজনরা সাইফুল্লাহ বারীকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তার মৃত্যু হয়।
অপরদিকে একই সময়ে গুরুতর আহত জামায়াত কর্মী সালাউদ্দিনকে প্রথমে স্থানীয় এবং পরে শজিমেকে, সর্বশেষ তাকে ঢাকায় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তিনি একই ইউনিয়নের ফুটানি বাজার এলাকার দুদু মিয়ার ছেলে।
কচুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হাবীবুল্লাহ ঢাকা পোস্টকে বলেন, প্রতিপক্ষরা আমার ওপর হিংস্রভাবে চড়াও হন। তাদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ, আক্রমণাত্মক ভাষার কারণে আমি ভয় পেয়ে যাই, শঙ্কিত হই। তাই আমি আমার ভাতিজা মোবাশ্বেরকে সেখানে ফোন করে ডাকি। কিন্তু কে জানতো তার সাথে এসে ছেলেটি এভাবে খুন হবে।
সালাউদ্দিনের বন্ধু ও সাবেক বোনারপাড়া ইউনিয়ন শিবিরের সভাপতি মোবাশ্বের বলেন, চাচা হাবীবুল্লাহকে মুকুলরা আটকে রেখেছেন এবং খারাপ ব্যবহার করছেন- এমন কথা বলে আমাকে ফোন করে ডাকেন চাচা। আমি সাইফুল্লাহকে সাথে নিয়ে এবং সালাউদ্দিনকে ফোন করি। তখন সালাউদ্দিন বোনারপাড়াতেই ছিলেন। আমরা সেখানে গিয়ে প্রতিবাদ করলে আমাদের সাথে তর্ক-বিতর্ক হয় কিন্তু সেদিন খুন হওয়ার মতো কোনো ঘটনাই ছিল না। আমি আমার বন্ধুর খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
নিহত সাইফুল্লাহ বারীর বাবা হাবিবুর রহমান বলেন, ঘটনার সময় আমিও সেখানে ছিলাম। খুন করার মতো কেনো ঘটনা সেখানে ঘটেনি। তর্কের ১০ মিনিট পর আমার ছেলে চার মাথা মোড়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ওরা পরিকল্পিতভাবে অস্ত্র নিয়ে এসে হামলা চালায়। সাইফুল্লাহর হাতে যখন প্রথম আঘাত করে তখন সে দৌঁড়ে পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু পড়ে যাওয়ায় পেছন থেকে গলায় ছুরি ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। বিনা কারণে আমার ছেলেটাকে তারা খুন করে।
২১ জনের নামে মামলা, গ্রেপ্তার ৪
সাইফুল্লাহ বারী হত্যার ঘটনায় ২২ জুন রাতে নামীয় ৬ নামীয় ও ১৪ থেকে ১৫ জনকে অজ্ঞানামাসহ ২১ জনকে আসামি করে মামলা করেছে তার বাবা হাবিবুর রহমান। এ মামলায় তিনজন নামীয় ও অজ্ঞাতনামা একজনসহ চার আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
মামলায় গ্রেপ্তার আসামিরা হলেন- বোনারপাড়া ইউনিয়নের পূর্ববাটি গ্রামের আকবর খন্দকারের ছেলে আশরাফ খন্দকার (৩৫), পূর্ব শিমুলতাইড় গ্রামের শাহআলমের ছেলে রবিউল ইসলাম (৪৩), মৃত মকবুল হোসেনের ছেলে শাহ আলম (৪৫) ও চকদাতেয়া গ্রামের মৃত শওকত আলীর ছেলে মোফাজ্জল হোসেন (৫৮)।
গ্রেপ্তারদের মধ্যে আশরাফ খন্দকার ইউনিয়ন যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ও রবিউল ইসলাম উপজেলা যুবদলের সদস্য বলে জানা গেছে।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন, বোনারপাড়া ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সভাপতি মোকলেছুর রহমান মুকুল, তার ছোট ভাই পলাশ ও মোনারুল ইসলাম। তাদের মধ্যে প্রধান আসামি করা হয়েছে মোকলেছুর রহমান মুকুল। তিনি বোনারপাড়া ইউনিয়নের বাটি গ্রামের জাহিদুল ইসলামের ছেলে।
সাঘাটা থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহাবুব আলম ঢাকা পোস্টকে বলেন, মামলায় এ পর্যন্ত নামীয় তিনজন ও তদন্তে পাওয়া একজনসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। এ সময় তিনি শিক্ষক হাবিবুল্লাহর অভিযোগের কোনো আপডেট তথ্য জানাতে পারেননি।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বি-সার্কেল) শেখ মুত্তাজুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, মামলা তদন্তাধীন। স্কুল কমিটি নিয়ে আসামিদের সঙ্গে প্রধান শিক্ষকের দ্বন্দ্বের জেরে এই খুনের ঘটনা ঘটেছে।
এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আইনগত সহায়তা পাওয়ার অধিকার সবারই আছে। নিরাপরাধীদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগের বিষয়ে সহায়তা চাইলে তাদেরকে পুলিশ নিয়মের মধ্যে থেকে অবশ্যই সহায়তা করবে। একই সঙ্গে এই হত্যা মামলায় নিরাপরাধ কোনো ব্যক্তিকে অন্যায়ভাবে পুলিশ হয়রানি করবে না বলেও নিশ্চিত করেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।
সাঘাটার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আশরাফুল কবীর ঢাকা পোস্টাকে বলেন, আগুনে ক্ষতিগ্রস্তদেরকে দুই প্যাকেট করে শুকনো খাবার দেওয়া হয়েছে। পরবর্তীতে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্থরা যেসকল সহায়তা পায় তা দেওয়া হবে।
আরএআর
